বর্ষবরণ বাঙালি জাতির আদিম অকৃত্রিম একান্তই শিকড়ের উৎসব


প্রকাশিত : এপ্রিল ১৪, ২০১৭ ||

অরবিন্দ মৃধা
‘বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন’ এই প্রচলিত বাক্যটি কারো অজানা নয়। প্রাচীন বাংলায় প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগ থেকে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে, একথাও আজ ঐতিহাসিকভাবে সত্য। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে মানব চেতনায় আদিম যুগ থেকে ভয় থেকে ভক্তিভাবের উদ্ভব হয়েছে। শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিসৃষ্ট সকল জীবের মধ্যে অজানা শক্তির ভয় কাজ করে। মানুষ চিন্তাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, কৌশলের মাধ্যমে অজেয়কে জয় এবং অজানাকে জানার চেষ্টা করে, একই সাথে নিজ চিন্তায় একটা বিশ্বাস স্থাপন করে অসীম শক্তিকে শ্রদ্ধাভক্তি, ভালোবাসা দেখিয়ে আত্মতুষ্টি থাকার জন্য নানা অনুষ্ঠান উৎসব বন্দনা-গীতের প্রয়াস গ্রহণ করে। এই জাতিয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ থেকে মানুষের মাঝে ধর্মচিন্তা, উৎসব, গীতবাদ্য, পালা-পার্বন, শিল্পকর্ম সহ সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নানাক্রিয়া কলাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্ষবরণ উৎসব বাঙালি মানসে বিচিত্র জীবনকর্মের একটি অনুসঙ্গ। কবে, কখন, কে বা কারা এই উৎসব পালন শুরু করেছে, সে বিষয়ে পন্ডিত গাবেষকগণের চিন্তা আর লেখনির শেষ নেই। কাল বা সময়ের গন্ডিতে বর্ষবরণকে আঁটকানো একটা দুরূহ ব্যাপার। কারণ সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ দৈনন্দিন কাজের সাথে নানামুখি আনন্দ উৎসব পালন করে আসছে সভ্যতা কেন্দ্রিক গোষ্ঠী চেতনা ধারায়। আর এ বর্ষবরণ কাজটি শুরু হয়েছে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং কৃষিজ ফসল অর্থাৎ ধান উৎপাদনের যুগ থেকে। প্রকৃতির প্রচন্ড দাবদাহকে শীতল করতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে উদভ্রান্তের মতো ঝড়-বৃষ্টি নিয়ে আগমন ঘটে বৈশাখের। বর্ষা ধারায় আদ্রহয় ভুমি, অঙ্কুরিত হয় প্রকৃতিতে নানা জাতের ফলজ-বনজ বৃক্ষ। বর্তমান বাঙালির আদিম কৃষককুল প্রকৃতির এই আচরণকে ধান উৎপাদনের মৌসুম হিসেবে বেছে নেয় এবং তখন থেকে তাদের মতো করে এই গড়ে ওঠা রূপবৈচিত্রকে প্রাণের আকুতি দিয়ে বর্ষার সৃজনী আগমনকে “নতুন বর্ষ” বিবেচনা করে উৎসব আনন্দের মধ্যদিয়ে তাকে আহ্বান করেছে। তাই এ কথা বললে, অত্যুক্তি হবেনা যে, ‘বাঙালির কৃষিনির্ভর জীবনে বর্ষবরণ’ উৎসব বাংলার প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক যুগ থেকে শুরু হওয়া একান্তই শিকড়ের উৎসব। আমরা জেনেছি, ভারতবর্ষের সিন্ধুনদ আববাহিকার হরোপ্পা (হলোপ্প?) ও মোহেনজোদাড়ো সভ্যতা বিলিন হওয়ার পর উর্বরা পলল ভূমি গঙ্গেয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে সে যুগের পুন্ড্রদেশের পুন্ড্রবর্ধন নগরী অর্থাৎ বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ উৎখনে। প্রতœতত্ত্ব, লেখ্য ও ভাষাবিদগণের মতে মহাস্থানগড় কেন্দ্রিক করোতোয়া তীরের কৃষিভিত্তিক নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অর্থ্যাৎ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে। সেখানকার পোড়ামাটির প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, মাটির পাত্র, মাটির পুথি, জালের কাটি, চাকতী, মাটির বল, মাটির জালের পত্র, কালো চকচকে মাটির পাত্র, শুঙ্গ ফলক, মাজায় বিছাপরা নারীমুর্তি সহ প্রাপ্ত অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্য প্রমাণ করে যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বাঙালির পূর্বসুরী এই জাতি সভ্য ছিল। মহাস্থান উৎখননে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা শিলালিপি উদ্ধার করেছে। ভাষাবিদ, লিপিতত্ত্ববিদগণ প্রমাণ করেছেন, বর্তমান বাংলাভাষা এই ব্রাহ্মীলিপির পরিশিলিত রূপ। এই শিলালিপির চতুর্থ ছত্রে উল্লেখ আছে, ‘ধানিয়ং। নিবহিসতি, দংগা, তিয়ায়িকে দেবা’ অর্থ এইরূপ দাঁড়ায়-প্লাবন জনিত দুর্দিনের কারনে ধান দেয়ার জন্য রাখা হলো। ধান সংরক্ষণ এবং বণ্টনকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এখানেই কৃষিভিত্তিক জীবন যাত্রা ও সংস্কৃতির প্রমাণ মেলে।
বৈদিক যুগের ঐতরেয় ব্রাহ্মন গ্রন্থে শুনঃশেপের উপখ্যানে অন্ধ্র, পুন্ড্র, শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি জাতিনাম পাওয়া যায়। জাতিনাম থেকে দেশনামের পরিচয়। পূর্বভারতের এই মহাস্থানগড়ের পুন্ড্রনগর সভ্যতার শিলালিপি নিদর্শনটি বাঙালির ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে আমরা মনে করি। কারন লিখন যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশি-বিদেশী পন্ডিতদের নিকট থেকে আমরা জেনে আসছি অতীতে বাঙালির কোন ভাষা ছিলনা, সংস্কৃতি ছিলনা, জাতিগত অস্তিত্ব ছিলনা। অনুমান নির্ভর এই সব তথ্য অনুযায়ী এঁরা বহিরাগত অষ্ট্রিক-দ্রাবিড়, মোঙ্গলীয় বোড়ো প্রভৃতি অনার্য জাতির উত্তরসুরী। তাহলে মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত প্রাগৈতিহাসিক পুন্ড্রবর্ধন নগরে গড়ে ওঠা গাঙ্গেয় সভ্যতা যারা গড়ে তুললেন তাঁরা কারা? সভ্যতা বিকাশের পর থেকে আদিম অধিবাসী হিসেবে বাংলাদেশের বহু জেলার নগর এবং নগরের বাইরে, সুন্দরবন উপকুল থেকে হিমালয়ের পাদদেশ জুড়ে এবং বর্তমান ভারতের বহুজেলায় পৌন্ড্র ক্ষত্রিয় জাতের মানুষের বসবাস আছে। এঁরা আজও বাংলার আদিম কৃষিজীবি হিসেবে সর্বত্যই চিহ্নিত। আমরা দৃঢ়ভাবে বাস্তবতার নিরিখে বিশ্বাস করি প্রাচীন পুন্ড্র জাতিসহ সে যুগের সুক্ষ্ম, বঙ্গ, রাঢ়, বরেন্দ্র, গৌড়, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি জনপদের আদিম অধিবাসীরা এদেশের ভূমিজপত্র। আদিম অধিবাসী এবং তাদের উত্তরসুরীরা বর্তমান বাঙালি জাতি। এঁরা কোন বহিরাগত জাতি নয়। জাতিভেদের বেড়াজাল ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র ভেদাভেদ আর ধর্মীয় বিজয়ের ঝান্ডার সাথে তকমা মিলিয়ে আদিম বিভিন্ন গোত্র, সম্প্রদায় জাতির মানুষ মিশে আছে বাংলার হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খৃষ্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় জাতির সাথে। পৌন্ড্রদের মধ্যে যারা হিন্দু পরিচয়ে আছেন, তাঁরা অঞ্চল ভিত্তিক বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসের কারণে সামাজিক রাজনৈতিক চাপে পড়ে, অনেকে বিস্মৃত হয়েছে। অনেকে আত্মপরিচয় হিসেবে নিজেদের বলে থাকে পৌন্ড্র ক্ষত্রিয়, রাজক্ষত্রিয়, উগ্রক্ষত্রিয়, রাজপুত ক্ষত্রিয়, রাজবংশী ক্ষত্রিয়, বিকাশ ক্ষত্রিয়, একাশ ক্ষত্রিয় প্রভৃতি। বংশানুক্রমিক ধারায় পৌন্ড্র উদ্ভত এই জাতি ও তাদের শাখার কৃষিজীবীগণ চৈত্র সংক্রান্তিতে উপোস থেকে নানা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ও আগত বছরের মঙ্গল কামনা করে তাঁদের ইষ্টদেবতার কাছে। জীবীকার প্রধান উৎস ধান উৎপাদনকে সামনে রেখে পহেলা বৈশাখে প্রচলিত প্রথানুযায়ী লাঙল-জোয়াল ও হালের বলদের মাথায় সিদুরচন্দন, ধান দুর্বা দিয়ে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন পূর্বক শঙ্কধ্বনি, উলুধ্বনির মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে বসুমাতা বা ধরিত্রীর বুকে হালচাষ উধ্বোধন করে। তাদের ভাষায় এই মাঙ্গলিক চাষকার্য উদ্বোধনকে বলা হয় ‘হালপুটনে’। কৃষকদের এই হালপুটনে থেকে ব্যবসায়ীদের হালখাতা বর্ষবরনে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আদিম অধিবাসী বিভিন্ন জাতির (নৃতাত্ত্বিক গোষ্টি) মানুষ তাঁদের বংশানুক্রমিক ধারায় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে বরণ করে থাকে। তাই বলছি পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ বরণ বাঙালি জাতির আদিম অকৃত্রিম একান্তই নিজ¯œ শিকড়ের উৎসব। বর্তমানে এটি একক কোন ধর্মীয় জনযোষ্ঠির নয়। নববর্ষ বাঙালি জাতির সার্বজনীন উৎসের উৎসব। লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক, বাংলা একাডেমির খন্ডকালিন লোকজ তথ্য সংগ্রাহক।