নিমাইকে দুয়ে ছেন্দে খেল নেতারা: সর্বস্ব বেচে কিনে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় ছেলের চাকুরি না হওয়ায় স্ট্রোক, পঙ্গু হওয়ায় নিজেও চাকুরিও গেল, প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ড দেওয়ার আশ্বাস এমপি রবির


প্রকাশিত : এপ্রিল ৩০, ২০১৭ ||

এম জিললুর রহমান: ঘুষের পরিমাণ সাড়ে চার লাখ টাকা। সঙ্গে বাগদা চিংড়ি, কৈ, ভেটকি মাছ, আঙ্গুর, আপেল, কলা ও মিষ্টি ছিল বোনাস। এরপর বাছাই পরীক্ষায় প্রথম হয়েও চাকরি হয়নি রাজ কুমারের। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ঘুষের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ টাকা। তাই বাছ্ইা পরীক্ষায় ৬ নম্বরে থেকেও চাকুরি হল অসীমের।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৯৬নং ব্যাংদহা প্রাইমারি স্কুলে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে এভাবেই সাতক্ষীরা সদর-২ আসনের সংসদ মীর মোস্তাক আহম্মেদ রবিসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুললেন সদর উপজেলার ব্যাংদহা গ্রামের মৃত রাধাপদ ঢালীর ছেলে নিমাই চন্দ্র ঢালী। তবে এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন আমি টাকা নেই না, দেই।
শনিবার দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের সামনে অঝর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে নিমাই চন্দ্র ঢালী বলেন, তার চায়ের দোকান ছিল। কাদের মোল্লার ফাঁসির রাতে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা তার সেই দোকানটি পুড়িয়ে দেয়। এরপর হন তিনি রাইচ মিলের কর্মচারি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবুল খায়ের সরদার তার ছেলেকে ওই চাকুরিটা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন। নিমাইয়ের ভাষায় খায়ের সাহেব তাকে বলেন যেহেতু তার দোকানটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একারণে অল্প কিছু খরচ করলেই তার চাকুরিটা হবে। তারপরও সারা জীবনের অর্জিত অর্থ ঘুষ দিয়েও তিনি ছেলের চাকরিটা করাতে পারেননি। অন্যের চাকুরি হয়েছে শোনার পর তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর শরীরের একসাইট প্যারালাইজড হয়ে যায়। আর একারণেই রাইস মিলের চাকুরিটাও তার চলে যায়। তিনি এখন পঙ্গু জীবন-যাপন করছেন। সাংবাদিকদের কাছে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আপনারা আমাকে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। আমাদের মত মানুষের জন্য এদেশ যেন হারাম হয়ে গেছে।
নিমাই চন্দ্র ঢালী বলেন, ২০১৪ সালে তার ছেলে রাজকুমার ঢালী সদর উপজেলার ব্যাংদহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী পদে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। চাকরির আশায় তিনি নিয়োগ পরীক্ষার আগে ফিংড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খায়ের সরদারকে ২০ হাজার টাকা দেন। পরে খায়ের সরদারের কথামত ব্যাংদহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি আশরাফুজ্জামান ও সহ-সভাপতি দেবাশীষ বিশ^াসকে ২লাখ টাকা দেন। পরে খায়ের সরদারই তাকে ফোন করে জানান, ৫০ হাজার টাকা সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবিকে দিতে হবে। সে কথা মোতাবেক, গাছ বিক্রি করে তিনি ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে সাতক্ষীরা শহরে আসেন। শহরের অশোক ঘোষের ভিসা অফিসে বসে তিনি সংসদ সদস্যকে দেওয়ার জন্য দৈনিক আজকের সাতক্ষীরা পত্রিকার সম্পাদক মহসীন হোসেন বাবলুর কাছে ৪০ হাজার টাকা প্রদান করেন। টাকাটি গুনে মহসীন হোসেন বাবলু পকেটে রাখেন।


নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পাশাপাশি এতগুলো টাকা দিয়েও ছেলের চাকরি না হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। ছেলের চাকরির আশায় এ দ্বার থেকে ওদ্বারে হাটতে থাকেন নিমাই চন্দ্র ঢালী। পরবর্তীতে তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র আরো টাকা হাতানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ফাঁদ পাততে থাকে। সংসদ সদস্যকে ম্যানেজ করার জন্য সাংবাদিক মহসিন হোসেন বাবলুকে আরো ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। তাতেও চাকরি হয় নি। বাড়তে থাকে ঘুষের অংক। দহকুলার যুবলীগের পাতি নেতা শফিও বাদ যাননি ঘুষের টাকা নিতে। তাকেও দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। এরপর তিনি সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির মুখোমুখি হন। চাকরি দেওয়ার আশ^াসে সাতক্ষীরা রেড ক্রিসেন্ট অফিসে বসে সংসদ সদস্য নিজেই ৫০ হাজার টাকা গুণে নেন।
নিমাই চন্দ্র ঢালী বলেন, রেড ক্রিসেন্ট অফিসে বসে সংসদ সদস্য নিজে টাকা নেওয়ার পরে তিনি চাকরির বিষয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! নিয়োগপত্রের পরিবর্তে তার হাতে জোটে বাছাই কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ফলাফলের কাগজপত্র।
এতে কিছুটা ক্ষুব্ধ হলে সাংসদ তাকে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, চাকরি পেতে তাকে আরো খরচ করতে হবে। পরবর্তীতে ছেলের চাকরি না হওয়ায় তার হতাশা আরো বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে চাকরি নিশ্চিত করার আশ^াস দিয়ে সংসদ সদস্যের পিএস মকছুমুল হাকিম ২০ হাজার টাকা, সংসদ সদস্যের ছোট ভাই ময়নুল ২০ হাজার টাকা এবং খায়ের সরদারের ছেলে লাল্টু ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
নিমাই ঢালী আক্ষেপ করে বলেন, শুধু টাকাই নয়, প্রতারকরা চাকরি দেওয়ার আশ^াসে বিভিন্ন সময়ে বাগদা চিংড়ি, কৈ মাছ, ভেটকি মাছ, আপেল, কলাসহ বিভিন্ন ফল-ফলাদি নিয়ে তাকে সর্বশান্ত করেছে। সাড়ে চার লাখ টাকা ও এতকিছু দেওয়ার পরেও তার ছেলের চাকরি হয়নি। চাকরি পেয়েছে নিয়োগ পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান অধিকারী অসিম কুমার দাশ। দালাল ডাবলু ও সংসদ সদস্যের ছেলে মীর তানজির আহমেদ ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে অসিমকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে।
কাদো কাদো কণ্ঠে নিমাই ঢালি বলেন, ছেলের চাকরি না হওয়ায় তিনি খায়ের সরদারের বাড়িতে যান টাকা ফেরত চাইতে। তবে টাকা ফেরত পাওয়ার পরিবর্তে তিনি চরমভাবে লাঞ্ছিত হন। এই শোকে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। এতে প্যারালাইজড হয়ে বর্তমানে পঙ্গু জীবন-যাপন করছেন। ফলে তার চাল-কলের চাকরিটাও চলে যাওয়ায় অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
টাকা ফেরত পেয়েছেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সংসদ সদস্য তার বাড়ির দ্বি-তলা থেকে ব্যাগে দড়ি বেঁধে এক লাখ টাকা নিচে নামিয়ে ফেরত দিয়েছেন। ব্যাংদহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি দেবাশীষ বিশ^াস তাকে ১লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন। আর উপজেলা শিক্ষা অফিসার লাবন্য সরকার তাকে ফেরত দিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা ফেরত পাওয়ার আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছেন। পরিশেষে তিনি সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবিসহ দালাল ও প্রতারকদের বিচারের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল খায়ের সরদারের সাথে সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, নিমাই এর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিছু টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকী টাকাটা আদায় করার জন্য তিনি চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন নিমাইয়ের ছেলের চাকুরি না হওয়া দুঃখজনক। তবে তিনি নিজে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
সংসদ সদস্যের পিএস মকছুমুল হাকিম নিতাই ঢালীর নিকট থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
সাংবাদিক মহাসীন হোসেন বাবলু সাংবাদিকদের বলেন আমার মধ্যস্ততায় ৫০ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে। খায়ের সরদারের সামনেই সেই টাকা আর একজনকে দেওয়া হয়েছে। আমি কোন টাকা নেইনি। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।
তৌহিদুর রহমান ডাবলু বলেন, টাকা নিয়ে চাকুরি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি সাংবাদিকদের বলেন, আমি মানুষের কাছ থেকে টাকা নেইনা, আমি টাকা দেই। তিনি বলেন, তার রাজনৈতিক শত্রুরা পরিকল্পিতভাবে তার ভাবমুর্তি নষ্ট করতে সাজানো কাহিনী তৈরী করেছে।