এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে


প্রকাশিত : মে ৩, ২০১৭ ||

<ক্লান্ত পাঠক>
এ কী কথা বলছেন আওয়ামী লীগের নেতারা! আপনাদের বিরুদ্ধে এ সব কী শুনছি! যা শুনছি তা মিথ্যাই বা বলি কি করে? কেননা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর পর থেকে তো অনেক কথাই শোনা যাচ্ছে। কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি বলি। প্রথমে যে কথা শুনেছিলাম সেটি হচ্ছে সাতক্ষীরা সদর এমপি মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি’র ভাই পরিচয় দানকারী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জসির বিরুদ্ধে। ঘের দখল করতে গিয়ে ছিলেন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে।

চাঁদাবাজির অভিযোগও ছিলো তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশও হয়েছিল সেসময়। মাননীয় এমপি সাহেব পত্রপত্রিকায় নিজ নামে বিবৃতি ছেপে বলেছিলেন কোনো সন্ত্রাস চাঁদাবাজ তার ভাই হতে পারে না। মাননীয় এমপি সাহেব নিজেকে জনগণের চাকর পরিচয় দিয়ে আরো বলেছিলেন তার (এমপি’র) কোনো ভাই আত্মীয় যদি সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজি করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তাকে সোপর্দ করতে। কিন্তু পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও এমপি সাহেব কি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? নেননি। আর নেননি বলেই জসিরা আশপর্দা পেয়েছে বারবার। ডাবলু। টিএনটির টাউট ডাবলু নামে যিনি বেশি পরিচিত। কি করেন নি, আর করছেন না তিনি। কোনো কাজ নিয়ে গেলে ডাবলুর হাত এড়ানো যায় না। টেন্ডারবাজি থেকে চাঁদাবাজি। সব আকামের সাথে ডাবলুর নাম সুপারগ্লু আঠারমত জড়িয়ে আছে। মোকসুমুল হাকিম। এমপি সাহেবের পিএ নাকি পিএস তা জানি না। তবে এমপি’র পিএ বললে তিনি খুব খুশি হন। এই হাকিম সাহেবকে খুশি করে বরাদ্দ পেতে হয়। ধরুন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের জন্য চার মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ হয়েছে। হাকিম সাহেবকে তা থেকে দুই/এক টন না দিলে বরাদ্দ ক্যানসিল। এছাড়া অন্যান্য বরাদ্দের টাকা চাল গম তো আছে। এমপি সাহেবের ছবি সম্বলিত কয়েকটি প্যানাসাইন ব্যানার সদরের বিভিন্ন হাট বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে শোভা পেতে দেখা যায়।

 

যেমন ধরুন; আলিপুরের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট। জামায়াতের অর্থ যোগানদাতা হিসেবে তার নামটি বারবার গণমাধ্যমে এসেছে। ছোটর আপন ভাই আব্দুর রউফ। সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি। ২০০১ সালে রউফ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তনয়া শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে অনেক আপত্তিকর কথা বলেছিলেন। শেখ হাসিনা সাতক্ষীরার এক জনসভায় সেসময় আব্দুর রউফকে গ্রেপ্তার করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছোট চেয়ারম্যানের বড়ভাই সাতক্ষীরার চোরাচালানীর কথিত গডফাদার আব্দুস সবুর। এই আব্দুস সবুর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী জননন্দিত নেতা সাতক্ষীরা উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক ভোমরা বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী। সেই ছোট চেয়ারম্যানের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা এমপি রবি। ছোট’র ছবি আর রবি’র ছবি ঝোলে গাছের ডালে।
ইদানিং জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শেখ হারুন উর রশিদকে দেখা যাচ্ছে এসব জামাত বিএনপির সাথে। হারুন সাহেবের মুখে শুনেছি তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন স ম আলাউদ্দিন। কিন্তু সেই হারুন আজ আলাউদ্দিনের খুনীদের সাথে। বড় অবাক লাগে নেতাদের চরিত্র দেখে। যে নজরুল ইসলামের প্রশংসায় হারুনের মুখে ফেনা উঠে যেতো, সেই মুখে এখন শোনা যায় নজরুল বিরোধী বক্তব্য। যা শুনলে কানের অস্বস্তি হয়। ডা. মনসুর আহমেদ। থানার দালাল বলে যার পরিচিতি। খাটালে চাঁদাবাজির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে সীমাহীন। তার অন্যায় আব্দার প্রশ্রয় দেননি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম। দালালী বাটপারি টাউটিংয়ে প্রশ্রয় না পেয়ে মিশেছেন স্বগোত্রে। এই ডা. মনসুরকে বিভিন্ন মঞ্চে নজরুল ইসলামের প্রশংসায় বক্তব্য দিতে শুনেছি। অন্যায় দাবিপূরণের আশায় নজরুল ইসলামের প্রশংসায় মুখ দিয়ে মলু তুলেছেন মনসুর। অন্যায় দাবি না মানায় এখন নজরুল সাহেব আজ বড্ড খারাপ তার কাছে। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে বলি। ২০০৭ সালের ঘটনা। তখন ফখরুদ্দিন ময়নুদ্দিনের শাসন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে গণহারে ভাংচুর। কি শহর কি গ্রাম। সর্বত্র ভেঙে চুরে তছনছ করছে ফখরুদ্দিন সরকার। সদর উপজেলার ব্যাংদহা বাজারের ভূমি অফিস সংলগ্ন চার রাস্তার মোড়ে একচালা ছোট্ট একটি ঘরে চা বিক্রি করে সংসার চালাতেন গরীব অসহায় নিমাই ঢালী। অবশ্য প্রতি বছর এ জন্য তাকে ভূমি অফিসে নির্দিষ্ট টাকাও দিতে হতো। ফখরুদ্দিন যখন ভাংচুর শুরু করলো তখন নিমাই ঢালীর দোকানটি বাদ যায়। নিমাই  ঢালীর অসহায়ত্ব আর দারিদ্রের কথা বিবেচনা করে সীমানার মধ্যে থাকলেও ফখরুদ্দিন সরকার নিমাই ঢালীর দোকানটি ভাঙেনি। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী মোল্যার ফাঁসির দিন সেই দোকানটিতে অগ্নি সংযোগ করে জামাত শিবির। এতে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতার মত ক্ষতি হয় নিমাই ঢালীর। এরপর আরো একবার ভাংচুর করা হয় নিমাই ঢালীর দোকানটি। তাতেও জামাত শিবিরের ভয়ে এতটুকু টলেনি নিমাই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে ভোট দেয় নিমাই ঢালীরা। গাভা ও জোড়দিয়া কেন্দ্র তার নিরব সাক্ষী।
২০১৩ সালে যখন জামাত বিএনপি তান্ডব চালায় তখন কোথায় ছিলেন সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জসিরা। কই সেদিন তো আপনাদের টিকিটিও কেউ দেখেনি। নির্বাচনের পর হঠাৎ আপনাদের উদয়। অসহায় নিমাই ঢালীর ছেলেকে চাকরির দেয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগের তীর আপনাদের দিকে তা নজরুল সাহেবের মত ব্যক্তিকে গালিগালাজ করে কি ফেরৎ দিতে পারবেন? মিডিয়াকে সমালোচনা করে কি সরকারের যে ক্ষতি আপনারা করেছেন তা ফিরিয়ে দিতে পারবেন। আপনারা কি আয়নায় নিজেদের দেখেছেন? কি ছিলেন? আর কি হয়েছেন? পাবলিক কিন্তু সব দেখছে। সদর উপজেলার প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে নিয়োগ হয়েছে সেখানেই দিতে হয়েছে ঘুষ। সদর উপজেলার ফয়জুল্যাপুর প্রাইমারি স্কুলে নাশকতার গুরু শিবির ক্যাডারকে চাকরি দিয়েছে কে? কার সুপারিশে কত টাকায় শিবির ক্যাডার চাকরি পেয়েছে ? বলবেন নেতারা। বড়দল প্রাইমারি স্কুল, মাহমুদপুর, ভাড়ুখালিসহ সকল প্রাইমারি স্কুলে নৈশ প্রহরী নিয়োগে ঘুষ খায়নি এমপির কোন সহচর? কলেজের নিয়োগ বাণিজ্য হয়নি কোথায়? ভালুকা চাঁদপুর কলেজ, সিটি কলেজ, ডেনাইট কলেজ, শহীদ স্মৃতি কলেজ কোন কলেজের কথা বাদ দেব। মাদ্রাসার কথাও একটু না বললেই নয়। আগরদাড়ি মাদ্রাসার নাশকতা মামলার আসামিরা কোথায়? কার ছত্রছায়ায় থাকে তারা? আলিয়া মাদ্রাসার নাশকতা মামলার আসামি শিক্ষকরা ক্লাস করে কার আশপর্দায়? এমনিভাবে জামাত শিবিরকে আশপর্দা দিয়ে মাথায় তুলে রাখবেন, আবার তা নিয়ে খবর ছাপতে গেলে নিউজ কোন পাতায় কোন কলামে হবে তার জ্ঞান দিবেন আপনারা। এ প্রসঙ্গে গ্রামের একটি গল্প মনে পড়েছে। গল্পটি এরকম। শ্বশুর শাশুড়ি সবাই মিলে খেতে বসেছে। খাদ্য পরিবেশন করছে নতুন বৌমা। তো হঠাৎ বৌমা শব্দ করে বায়ু সরিয়েছে (গ্রামের ভাষায় বলে পাদমারা)। এতে বৌমা লজ্জা পেয়ে হাতে থাকা কাসার বাটি বাঁজাতে লাগলেন, যাতে পাদের শব্দটি কেউ বুঝতে না পারে। কিন্তু অভিজ্ঞ শাশুড়ি বিষয়টি বুঝতে পেরে বললেন, শব্দে না হয় শব্দ মেশালে বৌমা, কিন্তু গন্ধে গন্ধ মেশাবে কীভাবে? তাই বলছি বক্তব্য দিয়ে না হয় গায়ের ঝাল মেটালেন। কিন্তু জনগণের মুখ বন্ধ করবেন কিভাবে? নেতাদের বহুরূপী রূপ দেখে একটি কবিতার কথা মনে পড়ে গেলো। কবিতাটি মোনালিসাকে উদ্দেশ্য করে মাইকেল মধুসুদন দত্ত লিখেছিলেন। কবিতাটির নাম’ একী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে’। কবিতাটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি। একই সাথে কবিতায় যে আহ্বান জানানো হয়েছে তার প্রতি সদয় বিবেচনার অনুরোধও জানাচ্ছি।
লিসা চৌধুরী! কৌতুক বাড়িতেছে মনে।
কহ, শুনি, দূর করি সকল সংশয়
অবিশ্বাস উবে যাক, কাটুক বিস্ময়।
অযথার্থ কথা যদি বাহিরায় মুখে
অধমের, মাথা তার কাট তুমি আসি,
অন্যথায়, চুন-কালি মাখি সারা মুখে
ঘুরাও প্রকাশ্যে; হাটে! যথার্থ যদ্যপি
অপবাদ, তবে কহ, কেমনে ভুঞ্জিবে
এ কলঙ্ক? বিবেকের দংশন-যন্ত্রণা
কিমতে সহিবে সখি দেখ ভাবি মনে।
পড়ে কি হে মনে তব পূর্ব-কথা যত?
………………………………
সঁপেছিলে তনু-মন উজাড় করিয়া
……………………………..
ভুলিয়াছ সে কথা কি আজ বিলক্ষণ?
……………………………..
এ মোর দুর্দশা হেরি কতজনে শত
মুখে দিতেছে ধিক্কার, ঠাট্টা- সে না হয়
না-ই বলিলাম; ঘৃণা-সেতো বলিবার
নয়, এত অপরাধ করিয়াছি সখি
কোন কালে? তব কাছে আছে কি উত্তর?
যে বেদনা জাগে আজ অতীত স্মরিতে
সর্বহর কাল তারে না পারে হরিতে।

 

আরো পড়তে:

নিমাইকে দুয়ে ছেন্দে খেল নেতারা: সর্বস্ব বেচে কিনে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় ছেলের চাকুরি না হওয়ায় স্ট্রোক, পঙ্গু হওয়ায় নিজেও চাকুরিও গেল, প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ড দেওয়ার আশ্বাস এমপি রবির

 

সদর এমপি রবি’র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা এটা আট কলামের লীড নিউজ হতে পারে না

 

সদর এমপির বিরুদ্ধে নিমাই চন্দ্র ঢালীর অভিযোগ (অভিযোগের ফটোকপি)

মন্তব্য কলাম: কোনটি সংবাদ? নিমাই ঢালীর কান্না, না কি নেতাদের বকবক