ফুল রপ্তানি: সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত


প্রকাশিত : মে ৩, ২০১৭ ||

আবদুর রহমান
ফুল সৌন্দার্য, ¯িœগ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক। এর পাঁপড়ির বিন্যাস, রঙের বৈচিত্র ও গন্ধের মাধুর্যে আমাদের মন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠে। জন্মদিন পালন, বিবাহ, মৃতের আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, গৃহ সজ্জা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও শহীদ দিবসসহ সকল অনুষ্ঠানেই ফুলের প্রয়োজন হয়। ফুলের সৌরভ একদিকে যেমন মানুষকে বিমোহিত করে তেমনি এর সৌন্দর্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে তোলে আকর্ষণীয়। এছাড়া ফুলের স্বর্গীয় সৌন্দর্য প্রতিদিনের জীবন যুদ্ধে শ্রান্ত ও ক্লান্ত মানুষের মনে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরম তৃপ্তি ও অনাবিল শান্তি দেয়। তাইতো কবি বলেছেন- ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা,/খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/দু’টি যদি জোটে তবে অর্ধেক/ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী/বাজারে বিকায় ফল-তন্ডুল/সে শুধু  মিটায় দেহের ক্ষুধা/হৃদয় প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল/ দুনিয়ার মাঝে সেইতো সুধা’।
আধুনিক যুগে নগরায়ন ও সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে দেশ-বিদেশে ফুলের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুল এখন আর শুধু সৌন্দর্য ও সৌখিনতার সামগ্রীই নয়, বরং ফুল এখন দেশের জাতীয় অর্থনীতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ, বিপণন ও ব্যবহার করছে। থাইল্যান্ড, সিংঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হল্যান্ড প্রভৃতি দেশ অর্কিড রফতানি করে এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ফুল রফতানিকারক দেশ নেদারল্যান্ড টিউলিপ ফুল বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে অর্থকরী ফসল হিসেবে ফুল বিশেষ করে রজনীগন্ধা ও গোলাপ উৎপাদন ও বিদেশে রফতানি শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিকরগাছা, শার্শা, চৌগাছা ও যশোর সদর উপজেলা এবং কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রজনীগন্ধার চাষ হচ্ছে। তাছাড়া সাতক্ষীরা, জয়দেবপুর, কুমিল্লা এবং চট্রগ্রামেও অল্পবিস্তার রজনীগন্ধার চাষ হয়। ইদানিং খুলনা জেলায়ও কিছু কিছু রজনীগন্ধা ও গোলাপ ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। তাছাড়া ঢাকা জেলার সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর এবং যশোরে গোলাপ ফুলের ব্যাপক চাষ হয়। বিশ্ব জুড়ে চলছে এখন ফুলের বাণিজ্যিক উৎপাদন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে টাটা ও বিড়লার মতো বড় মাপের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ করছে। ভারতে ফুল চাষকে উৎসাহিত করার জন্য ভর্তুকী ব্যবস্থা আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এই ভুর্তুকীর পরিমাণ ৫০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদনের লক্ষ্যে ভারতের মতো আমাদের দেশেও ভর্তুকী ব্যবস্থা চালু করার প্রয়োজন।
এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে, এমন কি কোন কোন উপজেলা সদরেও তাজা ফুলের স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান গুলোতে ঋতু বৈচিত্র্যের ফুলের পাশাপাশি বারো মাস রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গাঁদা ফুল পাওয়া যায়। বিভিন্ন জাতীয় উৎসবগুলোতে এসব দোকনগুলোতে ফুল ক্রয়ের জন্য ক্রেতা সাধারণের প্রচুর ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এসব দোকানে ফুলের বিকিকিনি ভালো হয় বলে জানা যায়। এটি নিঃসন্দেহে দেশে ফুলের সমাদরের পরিচয়। বিদেশে বাংলাদেশের ফুলের বিশেষ করে রজনীগন্ধা ও গোলাপ ফুলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অতি সম্প্রতি লন্ডন, সিংঙ্গাপুর, সৌদি আরব, হল্যান্ড এবং আবুধাবীতে বাংলাদেশ থেকে ফুল রফতানি করা হচ্ছে। কাজেই একথা বলা যায় যে, আমাদের দেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে ফুলের চাষ করে তা বিদেশে রফতানির উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগি। গোলাপ, রজনীগন্ধা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা ও গাঁদা এদেশের কয়েকটি জনপ্রিয় ফুল। এদেশে নানা প্রকার মৌসুমী ফুল জন্মে থাকে। শীতকালীন মৌসুমী ফুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্টার, এলিসাম, ক্যালেন্ডুলা, কসমস, কার্ণেশান, কর্ণ ফ্লাওয়ার, চন্দ্র মল্লিকা, ডেইজী, ডায়ান্থাস, ডালিয়া, লার্কস্পার, গাঁদা, হলিহক, ন্যাস্টারসিয়াম, লুপিন, পপি, পর্টুলেকা, ভারবেনা, প্যান্সী, জিনিয়া, এন্টিরিনাম, সুইট পী, ফ্লক্স প্রভৃতি। মোরগজবা, বোতাম ফুল, দোপাটী, ক্লিওম, গাইলারডিয়া, মর্নিং গ্লোরী, পর্টুলেকা, অপরাজিতা, জিনিয়া, সন্ধ্যামনি, গন্ধরাজ, টগর ইত্যাদি গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন উল্লেখযোগ্য মৌসুমী ফুল। দীর্ঘজীবি ফুলের মধ্যে গোলাপ, সর্বজয়া, স্বর্ণচাপা, করবী, শেফালী, রংগন, মাধবী, টগর, মালতি অপরাজিতা, জবা, বাগান বিলাস, পাতাবাহার, চামেলী বেলী, জুঁই, রজনীগন্ধা, মল্লিকা, গন্ধরাজ, দোলনচাঁপা, টগর, কামিনী, হাসনাহেনা, শিউলী, মুসান্ডা, বকুল, নয়নতারা প্রভৃতি অন্যতম।
আন্তর্জাতিক বাজারে ফুলের চাহিদা ব্যাপক এবং প্রতি বছর ফুলের চাহিদা বাড়ছে। সে তুলনায় সরবরাহ কম। এক তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে আড়াই হাজার কোটি ডলার মূল্যের ফুল বেচাকেনা হয়। ফুল রফতানির দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের চেয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরাইল ফুল রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করে থাকে, তা বহু উন্নয়নশীল দেশের রফতানি বাণিজ্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি বছর ফুল রফতানি করে কোটি কোটি রূপী আয় করছে। তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারও বিশাল। আমাদের দেশে উৎপাদিত ফুলের আকার, রঙ, গন্ধ স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য আপেক্ষাকৃত উন্নত। তাই বিদেশে বাংলাদেশের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একটু চেষ্টা করলেই বিশ্ববাজারে এদেশের উৎপাদিত ফুল স্থান করে নিতে পারে। এ জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই প্রয়োজন।
ফুলের বাণিজ্যিক চাষ ও ফুল রপ্তানি বাংলাদেশেল রফতানি আয়কে উজ্জীবিত করতে পারে। কাজেই আমাদের দেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে ফুল উৎপাদন করে তা বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা আরো জোরদার করা আবশ্যক। এতে একদিকে যেমন দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে, অপরদিকে বিপুল সংখ্যক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আয়ের পথ সুগম হবে। যা দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে এক বিরাট অবদান রাখবে। লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা