যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাতক্ষীরার ৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল


প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৭ ||

পত্রদূত ডেস্ক: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাতক্ষীরার ৪ আসমি সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা জামাতের আমির মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল, আব্দুল্লাহ-হিল বাকী, খান রোকনুজ্জামান এবং জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসাথে এ মামলার পলাতক দুই আসামি খান রোকনুজ্জামান ও জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফ্রেস ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপনের পর ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়। এসময় ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন। এসময় আসামি আব্দুল খালেক মন্ডলের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন এবং আসামি আব্দুল্লাহ হেল আল-বাকীর আইনজীবী এম আবদুর রউফ ও আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন।
চার আসামির মধ্যে খালেক মন্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয় তদন্তকালেই। গত ৮ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর শতবর্ষী আব্দুল্লাহ হেল আল-বাকীকে সাতক্ষীরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর হেফাজতে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয় এ আসামিকে। বয়স বিবেচনায় ১০৩ বছর বয়সী বাকীকে জামিন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে ছিলেন প্রসিকিউটর চমন।
বাকি দুই আসামি খান রোকনুজ্জামান ও জহিরুল ইসলাম ওরফে টিক্কা খান পলাতক। গত ৮ ফেব্রুয়ারি আব্দুল্লাহ-হেল আলী বাকীসহ চারজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, আটক, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ আনা হয়।
এ মামলায় ২০১৫ সালের ৭ অগাস্ট তদন্ত শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর পর এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। তদন্তকালে ৬০ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হলেও মামলার সাক্ষী করা হয়েছে ৩৩ জনকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন টাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক খান বিপিএম।
সাত অভিযোগ
অভিযোগ-১: ১৯৭১ সালের ১৮ অগাস্ট সকাল ৮টার দিকে বুধহাটা খেয়াঘাটে বেতনা নদীর পাড়ে আফতাবউদ্দিন ও সিরাজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে স্থানীয় খলিলুর রহমান, মো. ইমাম বারী, মো. মুজিবর রহমান ও ইমদাদুল হককে রাজাকার বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ডায়মন্ড হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ-২: ১৯৭১ সালেরর পহেলা ভাদ্র ধুলিহর বাজার থেকে কমরউদ্দিন ঢালী নামের একজনকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যায় ১০/১২ জন রাজাকার সদস্য। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সাতক্ষীরা মহকুমার রাজাকার কমান্ডার এম আব্দুল্লাহ-হেল আল বাকী ও খান রোকনুজ্জামান। পরে ঢালীর মৃতদেহ পাওয়া যায় বেতনা নদীর পাড়ে।
অভিযোগ-৩: ১৯৭১ সালের পহেলা ভাদ্র বুধবার বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে রাজাকার কমান্ডার বাকী, রোকনুজ্জামান খানসহ ৪-৫ জন মিলে সবদার আলী সরদারকে চোখ বেঁধে পিকআপ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। পরে আর তার সন্ধান মেলেনি।
অভিযোগ-৪: সোহেল উদ্দিন সানা নামের এক ব্যক্তি তার বড় ছেলে আব্দুল জলিল সানাকে সঙ্গে নিয়ে পহেলা ভাদ্র বুধহাটা বাজার অতিক্রম করার সময় রাজাকার কমান্ডার ইছাহাক (মৃত) ও তার সঙ্গী রাজাকারদের হাতে আটক হন। পরে তাদের ডায়মন্ড হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সোহেল ও সানার সন্ধান আর মেলেনি।
অভিযোগ-৫: ১৯৭১ সালে ৭ আষাঢ় সকাল ৭টার দিকে আবুল হোসেন ও তার ভাই গোলাম হোসন নিজেদের বাড়ির পাশে হালচাষ করছিলেন। সকাল ৯টার দিকে গোলাম হোসেন বাড়িতে নাস্তা খেতে এলে আসামি আব্দুল খালেক মন্ডল ও জহিরুল ইসলাম ওরফে টিক্কা খানসহ ১০/১২ জন রাজাকার সদস্য এসে তাকে পাশের পাটক্ষেতে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
অভিযোগ-৬: ১৯৭১ সালের ২ ভাদ্র সকালে বাশদহ বাজারের ওয়াপদা মোড় থেকে মো. বছির আহমেদকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর তার বুড়ো আঙ্গুলের রগ কেটে দেয় রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা।
অভিযোগ-৭: ১৯৭১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে আসামি আব্দুল খালেক মন্ডল ও রাজাকার কমান্ডার জহিরুল ইসলাম টিক্কা খান একদল পাকিস্তানি সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে কাথন্ডা প্রাইমারি স্কুলে স্থানীয় গ্রামবাসীদের ডেকে মিটিং করে। সেই মিটিংয়ে বলা হয়, যারা আওয়ামী লীগ করে এবং যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছে তারা ‘কাফের’। এরপর তারা কাথন্ডা ও বৈকারি গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি-ঘর লুট করে জ্বালিয়ে দেয়। সে সময় তারা মৃত গোলাম রহমানের স্ত্রীকে তার বাড়ির রান্নাঘরের পেছনে আটকে ধর্ষণ করে। এছাড়া বৈকারি গ্রামের এক নারীকে মৃত শরীয়তউল্লাহর ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করে।