ব্যাটারী চালিত ভ্যান রিকসা চলার বিষয়ে নাগরিক ভাবনা


প্রকাশিত : মে ১৭, ২০১৭ ||

শেখ হারুন-উর-রশিদ
সম্প্রতি দেশব্যাপী কায়িক শ্রম কম থাকায় যত্রতত্র ব্যাটারী চালিত রিকসা ভ্যান চালু হয়েছে। এমনকি রাজধানী শহরের আশে পাশে বিশেষ করে আশুলিয়া, টঙ্গি, সভার, ফতুল্যা, মুন্সিগঞ্জ, নরায়নগঞ্জের পৌরসভার বাইরে বিশেষ ধরণের গদিওয়ালা ভ্যান চলতে দেখা যায়।

 

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সর্বশেষ সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও এখন যত্রতত্র এগুলো দেখা যাচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলা ৭টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা এবং ৭৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ভারী শিল্প বলতে ১৯৮০ সালে তৎকালীন বস্ত্রমন্ত্রী সাতক্ষীরা কালিগঞ্জের কৃতি সন্তান এড. মুনসুর আলীর অবদানে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেটা ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই থেকে বড় অংশটি বন্ধ। ছোট অংশটি সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে চলছে। যেখানে চলছে শ্রম দাসের সে এক করুণ ইতিহাস। দৈনিক ৮ঘন্টার জন্য মজুরী মাত্র ১৬০ টাকা। শ্রমিকদের দাবী ছিল নি¤œতম মজুরী দেওয়া হোক দৈনিক ২৫০ টাকা। যেটা খুবই যুক্তিসঙ্গত ছিল। যেখানে অফিসারগণ মাসিক ৫০ হাজার টাকার বেশি বেতন ভাতা পাচ্ছেন এবং তাদের বেতন ভাতা শেখ হাসিনার সরকার ঢাকা থেকে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে প্রদান করেন। সারা সাতক্ষীরায় কোন মাঝারী কিংবা ক্ষুদ্র শিল্প নেই, চিংড়ী উৎপাদন, কিংবা চিংড়ী মাছ এখনও শিল্পের পর্যায়ে আসেনি, শ্রম ঘন শিল্প ছাড়া এই অভাগা দেশে ৩ কোটি বেকারের মধ্যে নতুন করে আরো কিছু বেকার বৃদ্ধি পাবে, শহরের যারা চোরাঘাট মালিক চোরাকারবারি তারা মনে করে শিল্প স্থাপনের চেয়ে ইনডেন্ট ব্যবসা ভাল, এলসি করবো, মাল আনবো, নগদ টাকা তারপর ২নং ব্যবসায় লাভ আরো বেশি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পর সাতক্ষীরা শিল্প কেন গড়ে উঠলো না? শোনা যায় সাতক্ষীরাতে শতাধিক কোটিপতির বসবাস। আজ প্রাইমারী স্কুলের পিয়ন, ডিসি অফিসের পিয়ন, পুলিশসহ সরকারি যে কোন নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকা ছাড়া চাকরি যেন সোনার হরিণ। একজন পিয়ন নিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে আমরা যত না সোচ্চার হই, পুলিশসহ সরকারি নিয়োগে জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, নাগরিকগণ টু শব্দটি পর্যন্ত করেন না, কারা নিয়োগ পাচ্ছে এই সমস্ত জায়গায় বলতে পারেন? বুকে হাত রেখে বলুন তো? ২০০০ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রবীন রাজনীতিক সৈয়দ কামাল বখত সাকীর মৃত্যুর পর ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান ও আলহাজ্ব মো. নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা জেলার আওয়ামী লীগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে মুনসুর আহমেদ ও নজরুল ইসলাম দায়িত্বে আছেন। জেলায় দলীয় এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, ডা. আ. ফ. ম. রুহুল হক, জগলুল হায়দার, বেগম রিফাত আমিন, উপজেলা চেয়ারম্যানগণ বিগত আট বছরে এই সরকারের আমলে কতজন দলীয় কর্মীকে বিনা পয়সায় চাকরি দিয়েছেন?
আজ জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় যাদের এসি গাড়িতে যাতায়াত করেন, বাড়িতে, টয়লেটে যারা এসি ব্যবহার করেন, তারাই তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাটারী ভ্যান রিকসা চলবে না। ১টি ভ্যানে ৪জন যাত্রীর ওজন, চালক নিজে এবং ভ্যানের ওজন সহ একটি বার চিন্তা করেন তো টাউন বাজারের মুখ থেকে নারিকেলতলার মুলরাস্তা ওই বৃদ্ধ কিংবা যুবক ভ্যান চালক এই প্রচন্ড রোদের গরমে দিনে কিভাবে ভ্যানটি টেনে তুলবে? সাতক্ষীরার পৌরসভার নাগরিকগণ খুবই ভাল, তাইতো জনপ্রতিনিধিদের কিছুই বলে না। রাস্তাঘাটের কি অবস্থা, ডিসি, এসপি সাহেবরা কি মঙ্গলগ্রহে থাকেন? তারা কি রাস্তা ঘাটের অবস্থা দেখেন না? মেয়র মহোদয় যেহেতু বিএনপির ঘরনার লোক, তাই তার কৈফিয়তৎ ভাই কি বলবো বলেন? দলীয় সরকার, বরাদ্দ পাচ্ছি না? ৯টি ওয়ার্ডে পানির জন্য হাহাকার, পুকুরে পানি নেই, মা-বোনেরা গোসল করতে পারে না। বেশ ক’দিন যাবৎ পানির অভাবে টয়লেট করা যাচ্ছে না। ৪নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাড়িতে হয়তো পৌরসভার অন্য ওয়ার্ড গুলিতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। আজকে যদি ব্যাটারী ভ্যান যেগুলি বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে পৌর এলাকায় আসে তাদের শহরের চারিপার্শ্বে ব্যারিকেট দেওয়া যায় তবে শহরে যানজট অবশ্যই কমবে। যেমন ধুলিহর থেকে যে মটর ভ্যানগুলি আসবে তারা পুরাতন সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ি মন্দির পর্যন্ত আসবে। মাছখোলা থেকে আসা ভ্যান সরকারি কলেজ মোড় পর্যন্ত, বিনেপোতা ভ্যান আমতলা পর্যন্ত, বল্লীর ভ্যান নারিকেলতলা পর্যন্ত, আগরদাঁড়ীর ভ্যান সিটি কলেজ পর্যন্ত, শিবপুরের ভ্যান সার্কিট হাউজ পর্যন্ত, খানপুরের ভ্যান বাঙ্গালের মোড় পর্যন্ত, আলিপুরের ভ্যান বাঙ্গালের মোড় পর্যন্ত এবং ফিংড়ীর ভ্যানগুলি চালতেতলা পর্যন্ত এই ভাবেই যদি সারা পৌর এলাকায় গ্রাম থেকে শহরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মটর ভ্যানগুলি ঢোকা বন্ধ করা যায় তবে শহরের যানজট বহুলাংশে কমবে। কিন্তু ঐসব এলাকার লোকজন শহর দিয়ে যখন অন্য এলাকায় যাবে তখন কি হবে? ধরা যাক, বকচরা থেকে একটি পরিবার মাছখোলায় যাবে। ঐ পরিবার প্রথমে বকচরা থেকে ইঞ্জিন ভ্যানে করে সার্কিট হাউস মোড়ে আসবেন। তারপর ঐ ইঞ্জিন ভ্যান থেকে নেমে প্যাডেল ভ্যানে অথবা এক দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পর তুফান কোম্পানীর ছেলে আব্দুস সোবহান খোকনের মালিকানাধীন ফোর হুইলারে উঠবেন। সেখান থেকে ঘন্টাখানেক পর নামবেন আমতলার মোড়ে। সেখানে কিছু সময় দাড়াবেন একটি ইঞ্জিন ভ্যানের জন্য। তারপর পেলে ভালো। না পেলে পায়ে হাঁটা। একসময় পথে একটি পেয়ে গেলে উঠবেন। তারপর মাছখোলায় পৌছাবেন। সবমিলিয়ে আধাঘন্টার পথ ঘন্টা চারেকের মধ্যে তিনি পৌছে যাবেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
শহরের ফুটপথ বলতে কিছু নেই। যা আছে তা কারো না কারো দখলে। এসব দখলকৃত ফুটপাত দখলমুক্ত করার কেউ নেই। এটা করবেন কিভাবে? রাস্তার উপরের শহরের মধ্যে দুটি ট্রাক স্ট্যান্ড, মাইক্রো স্ট্যান্ড, ইটাগাছা হাটের মোড় থেকে বাঁকাল কোল্ড স্টোরেজ পর্যন্ত মনে হয় সব গাড়ির গ্যারেজ। তাদেরকে শহরের অন্য কোথায়ও কিভাবে জায়গা করে দিবেন সেটা চিন্তা করতে হবে। দীর্ঘদিন পর আগামী ২৬ মে শুক্রবার জেলা রিকসা ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন, ২৭ মে থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হবে। একজন শ্রমিকের সন্তান সুলতানপুর থেকে মাত্র ১৫ টাকা সিটি কলেজ যেতে পারে কিন্তু পায়ে চালিত রিকসা ৫০ টাকার নিচে যেতে চায় না। অবশ্যই ব্যাটারী ভ্যান দুর্ঘটনার অনেকগুলো কারণের একটি কারণ, তবে শহরের শ্র্রমিক কৃষাণ নি¤œ আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সহনীয়ভাবে পর্যায়ক্রমে ব্যাটারী ভ্যান রিকসা বন্ধ করা যেত। কিন্তু সেপথে না যেয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভ্যান চালক ও জনগণের কথা চিন্তা না করেই গোনে গোনে এই গণউপদ্রুপ সৃষ্টির অভিযান কেন চালাচ্ছেন, তা আমরা জানি না। যারা এই সিদ্ধান্ত নেন তারা কেউ রাস্তায় রিকসা ভ্যানে চড়েন না। চড়েন এসি গাড়ি। জনতার দাবী আমাদেরও গণপরিবহনে এসির ব্যবস্থা করা হোক। ভ্যান রিকসা ভাড়ার দামে যেন এক দুই কিলোমিটার ৫ থেকে ১০ টাকায় যাতায়াত করতে পারি। বিষয়টি আইন শৃঙ্খলা কমিটির সম্মানিত সদস্যগণকে ভেবে দেখতে বলবো। লেখক: ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার কর্মী