ভূমি ও ভূমি রাজস্ব


প্রকাশিত : মে ২৭, ২০১৭ ||

পঞ্চানন মল্লিক
ভূমি মানুষের এক প্রাচীন সম্পদ তাই এর গুরুত্ব মানুষের জীবনে অপরিসীম। ভূমি ছাড়া যেমন বেঁচে থাকা কল্পনা করা যায়না, তেমনি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারের উপর নির্ভর করে মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ। তাই মানুষের জীবনে ভূমি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ভূমি যেমন কোন দেশের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি তেমনি ভূমির উপর সরকারের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ভূমি রাজস্ব দ্বারা। রাজস্ব ব্যবস্থা এদেশের বহু প্রাচীনতম এক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে শেরশাহের আমলে পরগনা, মুঘল আমলে সুবেদারী প্রথা এবং ইংরেজরা দেওয়ানী লাভের পর ১৭৭২ সালে কালেক্টরের সৃষ্টি হয়।
প্রাচীনকাল হতে আজ পর্যন্ত ভূমি ব্যবস্থাপনার নান্দনিক পথ পরিক্রমায় সজাগ দৃষ্টি রাখলে আমরা দেখতে পাই, ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে সঠিক ভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নিয়ম বা আইন, কানুন সৃষ্টি হয়েছে। এর কোন কোনটি প্রজাদের মুখে ফুঁটিয়েছে হাসির রেখা আবার কোন কোনটি ভাসিয়েছে চোখের জলে। এক সময় এদেশে জমিদারী প্রথা চালু ছিল। জমিদারের রাজস্ব কর্মচারিরা রাজস¦ আদায়ের স্বার্থে সাধারণ প্রজাদের উপর অনেক অবর্নীয় অবিচার-অত্যাচার চালাত। প্রজাদের নিষ্পেষিত করে আদায় কৃত অর্থের একটা মোটা অংশ জমিদাররা মধ্য স্বত্বভোগী হিসাবে ভোগ করতেন। তখনকার দিনে সূর্যাস্ত আইনে ৩০, চৈত্রের মধ্যে সব খাজনা পরিশোধ না করলে জমিদাররা তাঁদের জমিদারি হারাতেন। তাই নায়েব, গোমস্তা, পাইক-পেয়াদা, বরকন্দাজ প্রভৃতি রাজস্ব কর্মচারিদের দিয়ে নানা পন্থা অবলম্বনে এমন কি জোর জবরদস্তি করে হলেও প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন জমিদারগণ। যে বছর বন্যা, খরা বা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল মারা যেত বা ফসল ভাল হতনা সে বছর খাজনা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কৃষকের জীবন কান্নার লোনা জলে একাকার হত। তবু জমিদারের অত্যাচারের মাত্রা থেমে থাকতনা। জমিদারদের এমন অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে  নিষ্পেষিত কৃষক কূল মরিয়া হয়ে অনেক বিদ্রোহও করেছেন। হাজী শরিয়ত উল্লাহ’র ফারায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, রংপুর এবং দিনাজপুরের কৃষক আন্দোলন, নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, পাবনার কৃষক বিদ্রোহ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইংরেজরা দেওয়ানী লাভের পর এ উপমহাদেশে প্রথমে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। এ ব্যবস্থার ফলে রায়তদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলে এর পরিবর্তে প্রথমে পাঁচসনা নিলামী ব্যবস্থা ও পরে এর পরিবর্তে দশসনা বন্দোবস্ত চালু করেন। এর তিন বছর পর ১৭৯৩ সালে চালু করা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা। পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা বিলুপ্ত করে ১৮৮৫ সালে পাশ হয় বি.টি এ্যাক্ট। বি.টি এ্যাক্টে প্রজাদের অধিকার ও স্বার্থ অনেকটা নিশ্চিত হলেও জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের অসন্তোষের নিরসন হয়নি। ফলে ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সিল ফ্লাউড সাহেবের নেতৃত্বে ‘ল্যান্ড রেভিনিউ কমিশন’ গঠন করা হয়। ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ ও তদপ্রেক্ষিতে জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরোধিতার কারণে গঠিত প্রশাসনিক তদস্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে পাশ হয় জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন। এর ফলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়। পরবর্তীতে উক্ত আইনের আলোকে ১৯৫৫ সালে পাশ হয় প্রজাস্বত্ব বিধিমালা। এর ফলে সাধারণ প্রজাদের দুর্ভোগের দিন শেষ হয়। প্রজাস্বত্ব আইনে প্রজাদের অধিকার, স্বার্থ, সুযোগ-সুবিধার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে কৃষি ও অকৃষি জমির ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে গতিশীলতার সৃষ্টি হয়।
ভূমি রাজস্ব আদায়ে সরকার ১৯৭৬ সালে ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ জারি করেন। বর্তমানে এই অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীতে এর কিছু সংশোধনীর আলোকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়ে থাকে। এর আলোকে কয়েকটি ধাপ বা সিলিং/স্লাভ এ বিভক্ত করে ভূমির ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়। ইতোমধ্যে ২৫ বিঘার নি¤েœর মালিকের কৃষি জমির ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ করা হয়েছে। বাংলা ১৩৯৮ সন হতে ২৫ বিঘার নিচের ভূমি মালিকরা এই সুবিধা ভোগ করছেন। গ্রাম এলাকার কাঁচা বাড়িকে কৃষকের বাড়ি বিবেচনায় এর রাজস্বও মওকুফ করা হয়েছে। মওকুফের আওতা ভূক্ত জমির হোল্ডিং প্রতি পূর্বে মাত্র ২ টাকা এবং বাংলা ১৪২২ সন হতে সন প্রতি ১০ হারে পরিশোধ করে ভূমি মালিকরা দাখিলা গ্রহন করতে পারেন।
ভূমি উন্নয়ন করের হার সময়োপযোগী ও ন্যায়ানুগ করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ৩০, জুন তারিখে সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় ব্যবহার ভিত্তিক প্রতি শতাংশ জমির বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন করের পরিবর্তিত হার নির্ধারন করে সর্বশেষ এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। এ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ব্যক্তি বা পরিবার ভিত্তিক কৃষি জমির মোট পরিমান ৮.২৫ একরের (২৫ বিঘার) অধিক হলে বা কোন সংস্থা কর্তৃক যে কোন পরিমান কৃষি জমি অধিকৃত হলে বা যেকোন মালিক কর্তৃক চা, কফি, রাবার, ফুল বা ফলের বাগান এবং বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ, চিংড়ি চাষ, হাঁসমুরগী ও গবাদি পশুর খামার ইত্যাদি বিশেষ কাজে ভূমি ব্যবহার করলে উক্ত প্রকার ভূমির পরিমান যাই হোক না কেন সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর বার্ষিক প্রতি শতাংশ দুই টাকা হারে পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া এই প্রজ্ঞাপনে অকৃষি জমির ভূমি উন্নয়ন করের হার নির্ধারণের জন্য সারা দেশকে অগ্রসরতার মানদন্ডে ৬টি ধাপে চিহ্নিত করে পরিবর্তিত হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আদেশ ১, জুলাই ২০১৫ খিষ্টাব্দ হতে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
ভূমি রাজস্ব আদায়ের সাথে সরাসরি জড়িত আমাদের ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলো। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি ইউনিয়নে রয়েছে একটি করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস। তবে কোন কোন জেলায় দুইটি ইউনিয়ন মিলেও একটি অফিস দেখা যায়। ভূমি মালিকগণ এখান থেকে বাৎসরিক নির্ধারিত পরিমান ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে জমির দাখিলা গ্রহণ করতে পারেন।
সরকার ২০১৫ সালে ব্যবহার ভিত্তিক ভূমি উন্নয়ন করের পরিবর্তিত হার নির্ধারন করে প্রজ্ঞাপন জারির পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ/চিংড়ি চাষ/রাবার/চা-কপি/ ফুল, ফলের বাগান প্রভৃতি এলাকায় ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পরিমাণ অনেক বেড়েছে এবং আদায় কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত অবস্থা সেই আগের মতই এখনো রয়ে গেছে। সেখানকার ভগ্ন দশা, জীর্ন অবস্থা, পর্যাপ্ত কক্ষ ও আসবাবপত্রের অভাব, তথ্য প্রমাণাদির অপ্রতুলতা, বিনষ্ট ও জরাজীর্ণ রেজিষ্ট্রার এবং ক্ষেত্র বিশেষে পদ শূন্যতাজনিত কারণে জনবলের অভাব, ভূমি রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতার অন্তরায় হচ্ছে। মান্ধাতার আমলের অফিস ব্যবস্থাপনা, এ্যানুয়েল-ম্যানুয়েল যুগের পরিবর্তে এখন সেখানে দরকার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনারও। আর তাতেই সেবা প্রত্যাশী ভূমি মালিকদের কাঙ্খিত সেবার মান নিশ্চিতসহ উল্লেখযোগ্য পরিমান ভূমি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে মনে করি। লেখক: কলামিস্ট ও কবি