শিশুর সুরক্ষিত ভবিষ্যত বনাম ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার


প্রকাশিত : মে ২৮, ২০১৭ ||

মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল
শিশুকাল শব্দটি আমাদের খুব কাছের। এই শব্দটি শুনলেই আমাদের মনের মাঝে একটি মায়াময় দুরন্ত অসম্ভব ভালোলাগার অনুভূতি ভেসে ওঠে। আবার এই শিশুরা আমাদের খুব কাছের, আমাদের আদরের, আমাদের ভবিষ্যত। অথচ এই শিশুদের ভবিষ্যত আজ হুমকির মুখে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ি চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১৪৪ শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এ হিসেবে প্রতিমাসে গড়ে ৪৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ধরণের ধর্ষণ শিশু নির্যাতন এবং শিশু যৌন হয়রানি মত উদ্বেগজনক বিষয়ে ইন্টারনেটের অপব্যবহার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যেমন তথ্য প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারবোনা তেমনি এর নিরাপদ ব্যবহার স¤পর্কে আমাদের অবগত হওয়া খুবই জরুরী। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের একটি জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৭ শতাংশ শিশু পর্ণ ভিডিও দেখেন। বিষয়টি সমগ্র রাষ্ট্র তথা জাতির জন্য উদ্বেগজনক। একবার ভেবে দেখুন আমাদের কোমলমতি শিশুরা সুস্থ যৌন শিক্ষার পরিবর্তে একটি বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। আবার বর্তমান সময়টি তথ্য প্রযুাক্তর। তথ্য প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্টতা ছাড়া আমাদের শিশুরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। ইন্টারনেট মানব সভ্যতার একটি বিস্ময়কর অবদান। এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাদের শিশুরা অবাধ তথ্যের সম্ভারে বিচরণের মধ্যদিয়ে নিজের চিন্তা জ্ঞানের পরিধি সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারছে। কিন্তু ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহারটি ও তাদের জানতে হবে, না হলে সেটি হতে পারে তাদের জন্য মারাত্মক বিপদজনক। আসুন দেখা যাক কিভাবে শিশুরা ইন্টারনের মাধ্যমে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে।
আমাদের শিশুরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেটের এখন সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই সামাজিক যোগযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা বন্ধুত্ব করছি নতুন নতুন মানুষের সাথে। আমাদের শিশুরা এই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ ব্যাবস্থা যেমন ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ইসস্টোগ্রাম ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব হচ্ছে নতুন নতুন নতুন মানুষের। কেউ কেউ তাদের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠছে। অনেক সময় শিশুর তাদের এইসব ছেলে বা মেয়ে বন্ধুর কাছে নিজের ইচ্ছায় বা বন্ধুটির ইচ্ছায় সেক্সটিং বা যৌন উত্তেজনামুলক ছবি, ভিডিওধারন করে তাদের পাঠাচ্ছে। কিন্তু স¤পর্ক ভেঙে গেলে এই অডিও ভিডিওগুলি ছড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেটে। শিশুদের প্রতি বিকৃতভাবে আকৃষ্ট ব্যক্তিরা ভিডিওগুলো সংগ্রহ এবং বিক্রি করছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে। যা শিশুদের বর্তমান ও ভবিষ্যত বিকাশের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলিতে চোখ বোলালে দেখা যায় এ ধরণের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর কত ঘটনা তো সমাজ লোক লজ্জার ভয়ে রয়ে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। আবার বেশকিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে যেমন, ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়না। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ছয়জন ছেলের মধ্যে একজন ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং প্রতি চারজন মেয়ে শিশুর মধ্যে একজন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুরা অনাত্মীয়, বয়সে তরুণ মানুষ দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয় কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সব ধরণের সব বয়সের মানুষ দ্বারা শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে কাজ করছে সাতক্ষীরার অগ্রগতি সংস্থা। অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুর সবুর বিশ্বাসের মতে প্রতিদিন ইন্টারনেটের মাধ্যমেই বিকৃত যৌন নির্যাতন এবং যৌন বাসনার শিকার হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অগনিত শৈশব। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা বুঝে উঠতে পারছেনা, বলে উঠতে পারছে না তাদের সেইসব অমানবিক নির্যাতনের কথা। তাই শিশুদের প্রতি বিকৃত যৌন আসক্তি মানুষগুলো থেকে যাচ্ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। এজন্য আগাম সর্তক হতে হবে পরিবার এবং স্কুলগুলোকে। এধরণের ঘটনাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা দরকার। সরকারকে নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহারবিধি পাঠ্যপুস্তকে সংযুক্ত করতে হবে এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। এভাবেই আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে শিশুর নিরাপদ শৈশব’।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুর যৌন নির্যাতনকে এখন আর হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। শিশুর হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়ার সাথে সাথে তাকে শিখিয়ে দিতে হবে এর নিরাপদ ব্যবহার। তাকে জানিয়ে দিতে হবে এর ক্ষতিকর দিক। তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে শিক্ষামুলক ওয়েবসাইটের সাথে। ডিভাইসে রাখতে হবে প্যারেন্টিং কন্ট্রোল।
ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ আমাদের সবার জন্য অসীম তথ্যভা-ার এবং বিনোদনের সীমাহীন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই দুনিয়ার বাইরে নয় আমাদের শিশুরা। আপনার শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে সামান্য অসচেতন হলেই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলোতে আকৃষ্ট হতে পারে শিশুরা। এজন্য শিশুদের ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে সরিয়ে না দিয়ে সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করুন। প্রয়োজনে আপনার শিশুর জন্য আলাদা আলাদা লগইন আইডি এবং পাসওয়ার্ডের ব্যবস্থা করুন। এতে প্রয়োজন হলে ইন্টারনেটে প্রত্যেক শিশুর অ্যাক্টিভিটি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
বাসায় ব্যবহৃত ইন্টারনেট-সংশ্লিষ্ট ডিভাইসে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করুন। এতে ইন্টারনেটে গেম বা পছন্দের কোনো কনটেন্ট দেখার সময় অনাকাংখিত কোনো সাইটে প্রবেশ করতে না পারে শিশুরা, যা তাদের মানসিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের সর্বাধিক নিরাপত্তা জোরদারে শিশুদের সাহায্য করুন। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু পরিচিতদের সাথে কথা বলার সুযোগ দিন শিশুদের। পপ-আপ ব্লক করুন এবং ওয়েবক্যাম ও জিপিএস সিস্টেম ডিসঅ্যাবল করে রাখুন। শিশুরা কম্পিউটার ব্যবহার করে সাধারণত গেম খেলা এবং ভিডিও দেখার জন্য। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট বন্ধ রাখুন। অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে রেখে নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুযোগ দিন এবং প্রতিদিন কম্পিউটার ব্যবহারের সময়সীমা ঠিক করে দিন।
শিশুকে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিন। অনলাইনে তারা কার সাথে কথা বলছে এবং কথা বলার ধরণ সম্পর্কে সতর্ক করুন। এছাড়া ইন্টারনেট একজন মানুষকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত শিক্ষা দিন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যাতে তারা বাস্তব জীবনের সাথে বেমানান কিছু করতে আগ্রহী হয়ে না ওঠে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় যাতে বিনামূল্যের কোনো চমকপ্রদ অফার গ্রহণে আগ্রহী না হয়, সে বিষয়ে শিশুকে সতর্ক করুন। বাস্তবিকই এ ধরণের অফারের মাধ্যমে এমবেডেড কুকিজ এবং ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে থাকে সাইবার অপরাধীরা। ভুল করেও যাতে এ ধরণের লিংকে ক্লিক না করে, সে বিষয়ে বুঝিয়ে বলুন।
সমসাময়িক সাইবার ইস্যু নিয়ে ভালো-মন্দ দিকগুলো খোলামেলা আলোচনা করুন শিশুর সাথে। অনুসন্ধানের চেষ্টা করুন বাস্তবে ইন্টারনেট ব্যবহারে কোন ধরণের প্রভাব পড়ছে আপনার শিশুর ওপর। আপনার সন্তান কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করছে কিনা, তা খেয়াল করুণ। প্রয়োজনে জিজ্ঞেস করুন সে বা তার কোনো বন্ধু সাইবার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে কিনা। আর শিশুর সাথে গড়ে তুলতে হবে বন্ধুত্বমুলক স¤পর্ক। যেন শিশুটি তার সবকথা আপনার সাথে বলতে পারে। তবেই আমরা গড়ে তুলতে পারব শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যত। লেখক: আমাদের সময় ও মাছরাঙা টেলিভিশনের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি