স্বাগতম মাহে রমজান


প্রকাশিত : মে ২৮, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
আরবী শব্দ ‘সাওম’ এর আভিধানিক অর্থ কোন কিছু থেকে বিরত থাকা এবং তা পরিত্যাগ করা। ইসলামী পরিভাষায় সুব্হে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার নাম সাওম বা রোজা। ইসলামী বর্ষপঞ্জীর নবম মাস রমজান। এটি এমন একটি মাস যার সাথে বিশ্ব মুসলিমের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। আরবী ‘রমজ’ ধাতু থেকে এসেছে রমজান শব্দটি। যার অর্থ পুড়িয়ে ফেলা। পুরো একমাসব্যাপী এই রোজা মানুষের মধ্যেকার সমস্ত পাপ ও অকল্যাণকে পুড়িয়ে ফেলে তাকে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়, সেজন্য এর নাম সিয়াম বা সংযম। এ মাসে অপ্রাপ্ত বয়স্ক, রোগী, মুসাফির, পাগল, হায়েজ-নেফাস সম্পন্ন মহিলা ও শরীয়তের পরিভাষায় অক্ষম ব্যতীত প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর রোজা পালন করা ফরয। আমাদের পূর্ববর্তী মানুষদের উপরও রোজা ফরয ছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা পালন ফরয করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সুরা আল বাকারা-১৮৩)। তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ ভয় করা, বিরত থাকা, আত্মশুদ্ধি, পরহেজগারী নিজেকে কোন বিপদ থেকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় সকল প্রকার অন্যায় ও অনাচার বর্জন করে কুরআন ও সুন্নাহ্র নির্দেশমত জীবন যাপনের মাধ্যমে আল্লাহকে প্রতিনিয়ত ভয় করে চলাকে তাকওয়া বলে।
মানব জীবনে রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। এ মাসেই নাযিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন। তাই তো এ মাসের এত মরতবা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে ঃ ‘রমজান মাস এমন একটি মাস যে মাসে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে আল কুরআন নাযিল হয়েছে (বাকারা-১৮৫)। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পায়, তারা যেন রোজা রাখে, কেউ পীড়িত হলে অথবা সফরে থাকলে সে যেন অন্য সময়ে সে (রোজার) সংখ্যাগুলো পূরণ করে। সাহাবী হযরত আবু হোরাইয়া (রা.) বর্ণিত একখানা হাদীসে রয়েছে: আল্লাহর রাসুল (স.) বলেন, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন সঙ্গত কারণ ছাড়া যদি কেউ রমজান মাসের একটা রোজাও ভঙ্গ করে তবে অবশিষ্ট সমগ্র জীবন রোজা রেখেও তার ক্ষতিপূরণু করা সম্ভব হবে না (তিরমিযি, আবু দাউদ)। কারণ রমজান মাসে রহমাতের যে প্লাবনধারা প্রবাহিত হয়, বছরের অন্য কোন সময় তা কল্পনাও করা যায় না। হাদীস শরীফে রমজান মাসকে তিনটি দশকে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের এবং তৃতীয় দশক নাজাতের। বলা বাহুল্য, এই এই তিনটি দশকের প্রত্যেকটির গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। নাজাত শব্দের আক্ষরিক অর্থ মুক্তি। এ মুক্তি অকল্যাণ থেকে মুক্তি, এ মুক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি। আর এ মুক্তির জন্যই এতেকাফের সাধনা। এই নাজাতের দশকের বিজোড় রাতগুলোর একটিকে বলা হয় ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থাৎ সম্মানিত বা মহিমান্বিত রজনী। এ রজনীতে যে বান্দা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হাত তুলতে পারে, তার মত সৌভাগ্যবান আর ক’জন হতে পারে? এই রাতকে বলা হয়েছে ‘সহ¯্র মাস অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর।’ এযে কতো মহিমান্বিত ব্যাপার তা শুধু অনুভব ও উপলব্ধি করা যায় মাত্র, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
প্রকৃতপক্ষে পবিত্র রমজানের রোজা পালনের দ্বারা সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে দেহ ও মনকে রক্ষা করে। সিয়াম সাধনা মানুষের মনের কলুষ-কালিমা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়ে মনকে নির্মল ও পবিত্র করে তোলে। পাপরাশিকে সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ করে মানুষকে করে তোলে পূণ্যবান, যোগ্য করে তোলে সাধারণ মানুষকে আল্লাহ তায়লার অসাধারণ করুণা ও ক্ষমা গ্রহণ করার জন্য। আর এটাই হচ্ছে রোজার মূলতত্ত্ব। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা ঈমান ও ইখলাসের সাথে পালন করে তার পূর্বের সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেয়” (বুখারী শরীফ)। আর যে ব্যক্তি রমজানে রাত্রি জাগরণ করে এবাদতে লিপ্ত থাকে তারও পূর্ববর্তী সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমান ও একীনের সংগে এবাদত করে তারও সকল গোনাহ আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন (বোখারী-মুসলিম)। রোজা পালনের দ্বারা মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ পাপরাশি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নি:শেষ করে দেয় এবং দেহ কাঠামোকে পাপমুক্ত ও পবিত্র করে। বস্তুতঃ সিয়াম কুপ্রবৃত্তি আয়ত্বে আনার হাতিয়ার। সিয়াম মনকে পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল করে। রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। শত্রুর আক্রমণ থেকে ঢাল যেরূপ পরিত্রাণ দেয়, রোজা সেরূপ রোজাদারকে শয়তানের ওয়াসওয়াসহ, অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে অত্মরক্ষা ও দোজখের শাস্তি থেকে মুক্তি লাভের জন্য ঢালস্বরূপ। অথচ এ ঢালকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে পরহেজ করতে হবে। কিয়ামতের দিন রোজাদার এর জন্য রোজা সুপারিশ করবে। রোজাদারের জন্য জান্নাতের প্রবেশের জন্য রাইয়ান নামক একটি বিশেষ দরজা আছে, সে দরজা দিয়ে রোজাদাররা প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করবে এবং তারা কখনও তৃষ্ণার কষ্ট পাবে না। বিখ্যাত সাহাবী হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, হুজুর (সা.) বলেছেন, (তবে অবশ্যই) রোজার মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে তার সমুদয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। তার প্রত্যেক তাসবীহ ও তাহলিলের বিনিময়ে বেহেস্তের মধ্যে একখানা প্রসাদ তার জন্য তৈরি করা হয়।
আল্লাহ পাক হাদীসে কুদসীতে এরশাদ করেছেন, “রোজা আমারই জন্য আর আমিই এর প্রতিদান প্রদান করবো।” আল্লাহতায়ালা বলেন, বান্দা আমার সন্তুষ্টির আশাতেই খাদ্য, পানীয় ও সম্ভোগ বর্জন করে থাকে। রমজানের রোজা আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ এনে দেয়। গুণাহের কারনে আল্লাহ পাক ও তার বান্দার মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়। ফলে আল্লাহ পাকের সংগে তার বান্দার সম্পর্কে শিথিল হয়ে পড়ে এবং পরিণামে বান্দা তার রবের করুণা থেকে বঞ্চিত হয়। মাহে রমজান আল্লাহ পাকের রহমত ও করুণা সৃষ্টির এক অবারিত দ্বার। মালিকের সাথে বান্দার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়, যে শিথিলতা দেখা দেয়, রমজানের রোজা তা দূর করে। হযরত রাসুলে করিম (সা.) এরশাদ করেছেন: “যখন রমজান উপস্থিত হয় তখন বেহেস্তের দরজাগুলো খুলে যায় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিশপ্ত শয়তানগুলো আবদ্ধ করে রাখা হয়। ফেরেশতাদের মারফত বলে দেয়া হয় যে, হে নেককার লোকজন! তোমরা সওয়াবের কাজসমূহ সম্পন্ন কর এবং বদকারদেরকে বলে দেয়া হয় তোমরা পাপ কাজ হতে বিরত থাক।” রোজা অশ্লীল কার্যাবলী ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। রোজার দিনে রোজাদারকে তার হাত-পা, নাক-কান, জিহ্বা এমনকি অন্তরকেও নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা দেয়। রোজা হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ, যাতে করে মানুষ সারা বছর এভাবে চলতে পারে। যেমন শেষ রাতে সেহরী খাওয়া, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে পানাহার বন্ধ করা, সূর্যাস্তের পর পরই নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করা যাতে আগে কিংবা পরে না হয়। আবার ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ ও পানাহারের পর রুটিন মাফিক এশার ও তারাবিহ’র নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া একটা প্রশিক্ষণ। এই এক মাস যে ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে তাকওয়ার অনুশীলন গ্রহণ করে বছরের বাকী এগার মাস তার প্রতিফলন হয়।
সিয়াম মানুষকে ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, সংযম, সৌহার্দ্য, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্কম মজবুত করার শিক্ষা দেয়। রমজান উপলক্ষে যে ব্যক্তি তার অধীনস্থ কর্মচারী বা দিন মজুরদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে তাদের কাজের চাপ লঘু করবে, স্বয়ং আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর দয়াশীল হবেন। তেমনি অভিসম্পাত রয়েছে ঐ সমস্ত লোকের জন্য যারা রমজান মাসকে মূল্য দেয় না। সর্বোপরি নানা প্রকার শোষণ ও অনাচারের মাধ্যমে সিয়ামের পবিত্র পরিবেশ বিঘিœত করে। জীবনের চূড়ান্ত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো আল্লাহ প্রেম। যা একজন মানুষের মধ্যে সিয়ামের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। বস্তুত রমজানের রোজার ফজিলত সত্যিই অসীম ও অতুলনীয়। মহান আল্লাহ পাকের হুকুম ও রেজামন্দি হাছিলের উদ্দেশ্যেই প্রকৃত রোজাদারের সার্থকতা নিহিত। হে আল্লাহ! এত বড় নেয়ামতে ভরপুর পূণ্যমাসে আমাদের প্রত্যেককে রোজা পালনের তাওফিক দান করুন।
রোজা তথা সিয়াম সাধনার নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় উপকারের পাশাপাশি পার্থিব কল্যাণও উপেক্ষা করার মতো নয়। সেদিকে লক্ষ্য করলে সিয়াম শুধু এবাদতই নয়, মানব কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও বটে। রমজানের শিক্ষাকে যদি আমরা প্রকৃত অর্থে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি এবং সকল কর্মকান্ডে অনুসরণ করি, তাহলে তা হবে আমাদের জীবনে মাহে রমজানের সাধনার যথার্থ প্রতিফলন। আমাদের প্রত্যাশা সিয়াম সাধনার কল্যাণে আমরা শুদ্ধ হবো, নির্মল হবো এবং আল্লাহর রহমত লাভে সমর্থ হবো। আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে রমজানের চিরন্তন চেতনার যথার্থ প্রতিফলন হবে-এটাই আজ একান্ত কামনা। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা