শেকড়ের সন্ধানে আমরা ক’জন ভাগিরথির কুল-কুল ¯্রােতে আজো যে কান্না শোনা যায়


প্রকাশিত : জুলাই ১৭, ২০১৭ ||

আবুল কাসেম
নৌকায় ভাগিরথি নদী পার হতে হতে উত্তেজনা আর শিহরণ গ্রাস করেছিল আমার।  মনে হচ্ছিল, শেকড়ের সন্ধানে যাচ্ছি। একটু পরেই যাচ্ছি সেই স্থানে, যেখানে প্রায় দু’শ বছরের জন্য প্রোথিত হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা। এখানকার নৌকায় বড় করে চাটাই বসানো। দিব্যি পার করা হচ্ছে প্রাইভেট আর পিক-আপসহ মাঝারি যান। পার হয়ে কিছ্ক্ষুণের মধ্যে চলে এলাম ঐতিহাসিক সেই স্থানে।
হ্যাঁ, পাঠক মুর্শিদাবাদের খোসবাগের কথা বলছি। কত পৈশাচিকতা আর কত হাহাকার চাঁপা পড়ে আছে এই খোসবাগের প্রতিটি মাটির কণায়। তার হিসেব ইতিহাসও দিতে পারেনি এখনো। নবাব আলিবর্দি খাঁ কি জানতেন,  তার নির্মিত এই আনন্দ বাগানই সারা দুনিয়াকে জানান দেবে, কি বিশ^াসঘাতকতা, কি নিষ্ঠুরতা একদিন ধারণ করতে হবে খোসবাগকে। আলিবর্দি খাঁ বিকেলে এখানে এসে বিশ্রাম করতেন। ধর্মপ্রাণ নবাব একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন নামাজ পড়ার জন্য। মসজিদের মূল ফটক থেকে আরো একটি স্থাপনা ভেদ করে রাস্তা দেখা যেত। সেই খোসবাগে এখনো বোবা কান্না হয়ে ফেরে সিরাজ, তার মা, তার স্ত্রী, শিশু কন্যাসহ অনেকের। আসছি সেসবে।
খোসবাগের প্রথম কবরটি আলিবর্দি খাঁর স্ত্রী সরফুন্নেসা বেগমের। ৩৪টি মৃত্যুর মধ্যে মাত্র সরফুন্নেসা ও তার স্বামী আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুই স্বাভাবিক ছিল। একটু সামনে যেতেই চোখে পড়ল আলিবর্দি খাঁর দু’কন্যা কুচক্রী নারীর প্রতিক ঘষেটি বেগম ও সিরাজ মাতা আমিনা বেগমের কবর। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় সিরাজের পতনের পর নবাবের পরিবারকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার জিঞ্জিরায়। তাদেরকে ঢাকায় পাঠিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারেননি মীর মীরণ। কৌশলে তাদেরকে হত্যার জন্য মীরণ বেছে নেন নবাব পরিবারের অনুগত আসফ আলীকে। তিনি ঢাকাতে এসে ঘষেটি বেগম ও আমিনা বেগমসহ ১১ জন নারী সদস্যকে মুর্শিদাবাদ নেওয়ার জন্য বজরায় উঠিয়ে দেন। বুড়িগঙ্গা-ধলেশ^রীর সঙ্গমস্থলে বজরার তলার খিল খুলে দেয় আসফ আলী। অসহায় এসব নর-নারীর আত্মচিৎকার নদী তীরের লোকজনের কানে না পৌছালেও সৃষ্টিকর্তা ঠিকই শুনেছেন। কথিত আছে, বজরা ডুবে যাওয়ার আগে আমিনা বেগম অভিশাপ দিয়েছিলেন, মীরণ যাতে বজ্রাঘাতে মারা যায়। তাদের মৃত্যুর কয়েকদিন পরই পাটনায় বজ্রাঘাতে মীরণ মারা যায়। যদিও অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন, পিশাচ মীরণকে দিয়ে ইতিহাসের সব নিষ্ঠুরতম খেলা তাকে দিয়ে খেলিয়ে ইংরেজরা তাকে গুলি করে হত্যা করে বজ্রাঘাতে মারা গেছে বলে প্রচার দেয়। সামনে এগুতেই ডান হাতে দেখা যাবে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে আছেন সিরাজের ১৭ জন নিকটাত্মীয়। তারা ঢাকা, পাটনা ও মুঙ্গের থেকে এসেছিলেন সিরাজের সাথে শেষ দেখা করতে। তবে তাদেরকে খাদ্যের সাথে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়। তারা যাতে বাড়ি ফিরে বিদ্রোহ না করতে পারে, সেজন্য মীরণ এভাবেই তাদেরকে হত্যা করেন। আমাদের গাইডের দেখিয়ে দেওয়া মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনীর স্বাক্ষ্য বহনকারি থরে থরে সাজানো এসব কবর দেখতে দেখতে চোখ যেমন ভিজে আসছিল, তেমননি পাও ধরে আসছিল। তবুও সিরাজের কবর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে সামনে পথ চলা। বাম পাশে রয়েছে আরেক বিশ^াসঘাতক দানেশ ফকির ওরফে দানসা ফকির ও তার পরিবারবর্গের কবর। এসব ইতিহাস অবশ্য পাঠকদের জানা। তারপরও মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের কাহিনী লিখতে গেলে সেসময়ের ইতিহাসের অংশ যারা, তাদের নিয়ে লিখতেই হয়। পরাজিত নবার ছদ্মবেশে স্ত্রী লুৎফা ও মেয়ে উম্মতজারাকে নিয়ে রাজমহলের দিকে পালাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে মেয়ের পানি পিপাসার কারণে নৌকা থামাতে হয়েছিল সিরাজের। নীচে নামতেই নবাবী জুতা দেখে চিনতে পেরে ইংরেজদের হাতে সিরাজকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন এই বিশ^াসঘাতক কথিত পীর। তবে নজরাণা পাওয়ার আশায় তিনি একাজ করলেও তার কপালে জুটেছিল ইংরেজদের বুলেট।
পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে ঐতিহাসিক যাত্রাপালা ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’ যাত্রাপালায়  সিরাজের সেই করুণ উচ্চারণ ‘উপায় নেই—গোলাম হোসেন’। হ্যাঁ, আমি গোলাম হোসেনের কথা বলছি। গোলাম হোসেনের আসল নাম অরুণদেব চক্রবর্তী। অসাম্প্রদায়িক রাজপরিবারের বিশ^স্ত ভৃত্য গোলাম হোসেন ও সিরাজের দেহরক্ষী আব্দুল হোসেন ও সাব্দুল হোসেনের কবরও রয়েছে এখানে। যারাও ৫৭’র ট্রাজেডির অন্যতম শিকার।
গাইড আমাদের নিয়ে সামনে চললেন। ঘরের ভেতরের একটি কবর দেখিয়ে যেইমাত্র তিনি বললেন, এই হলো বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ অধিপতি নবার সিরাজ-উদ-দৌলার কবর, আমি নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের জন্য ফিরে গেলাম আমার জন্মস্থান পাঁচপাড়া গ্রামে প্রাইমারির ছাত্র থাকাকালিন সময়ে। রাতে পড়ার টেবিলে বসে পাশের গ্রামে দূর্গাপুজার সময়ে মন্দিরে বাজানো ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’ যাত্রাপালায় দৃড়চেতা সিরাজের সেই অমোঘ উচ্চারণ, ‘‘বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার অধিপতি দাদু, তুমি বলেছিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রশ্রয় দিওনা। সুযোগ পেলেই তারা সিংহাসন দখল করবে। তোমার শেষ উপদেশ, আমি ভুলিনি জনাব। ’’ কানকে বিদ্ধ করছিল। হায়রে! মুর্শিদাবাদ। তুমি কি জান, কোন মহাপুরুষকে তুমি শেষ আশ্রয় দিয়েছ। ইনি হলেন সেই সিরাজ, যিনি বালক বয়সেই পাটনার শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি বালক বয়সেই ঢাকার নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি সূনিপুণ যোদ্ধা হিসেবে আলিবর্দি খাঁর মন জয় করেন।  বিচক্ষণ আর বিপুল শৌর্য-বীর্যের অধিকারি না হলে আলিবর্দি খাঁ তাকে উত্তরাধিকারি মনোনিত করবেন কেন। শুধু তাই নয়, সিংহাসনে আরোহন করে তিনি একাধারে কাশিমবাজার দুর্গ অবরোধ করে ওয়াটস্কে অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন, কলকাতা দুর্গ দখল করেন ও নবাবগঞ্জের যুদ্ধে জয়লাভ করেন। সিরাজ ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত থাকতেন’-তার চরিত্রের ওপর ইংরেজদের আরোপিত এসব কালিমা লেপন যে সর্বৈব মিথ্যা, তা এসব কার্যক্রমে প্রমাণ মেলে। তাছাড়া মুর্শিদাবাদে সিরাজের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন সিরাজুম মদিনা’ বা সাদা মদিনা নবাবের ধর্মপরায়নতার প্রমান মেলে। সিরাজের কবরের সামনে দাঁড়াতেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। পাঠকদের জানা ইতিহাস এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। সেদিন নবাবকে হত্যা করে তার মৃতদেহটি চাক চাক করে কেটে একটি বস্তায় ভরে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে কি নিষ্ঠুর আর পৈশাচিক ঠাট্টা করা হয়েছিল সিরাজের গর্ভধারিণী মায়ের সাথে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, খোসবাগের বিখ্যাত আম খাবেকিনা। উত্তরে হ্যাঁ সূচক জবাব দিতে, তাদের সামনে বস্তাভর্তি সিরাজের মরদেহ পাঠানো হয়েছিল। সিরাজের খ-িত মস্তক দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন দুখিনী মা। পৌনে সাত ফুট মতান্তরে সাড়ে ছয় ফুট দীর্ঘদেহী সূদর্শন সিরাজের কবর ছোট হওয়ার ঘটনা কাহিনী এটাই। সিরাজের কবরের পাশেই রয়েছে তার ভাই মির্জা মেহেদীর কবর। পাশেই পায়ের কাছেই মহিয়সী লুৎফার কবর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাগলপ্রায় লুৎফা সিরাজের কবরের নিকটে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। কথিত আছে, সিরাজকে হত্যার পরে মীরণ বিয়ের পয়গাম পাঠান অনিন্দ্যসুন্দরী লুৎফার কাছে। ঘৃণাভরে তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাান করে বলেছিলেন, ‘সারাজীবন চড়েছি হাতির পিঠে। ছাগলের পিঠে চড়তে পারবনা। ‘‘দু’কদম পরেই আলিবর্দি খাঁর কবর। বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার ১৬ বছরের নবাব। চিত্তবিনোদননের জন্য তিনি খোসবাগ নির্মাণ করেছিলেন। নামাজ পড়ার জন্য তিনি খোসবাগে মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন। অদৃষ্টের পরিহাস! তিনি কি আদৌ আঁচ করতে পেরেছিলেন, কত নিষ্ঠুরতা, ষড়যন্ত্র, কত হাহাকার আর বেদনার দীর্ঘ নি:শ^াস চাঁপা পড়বে তারই অতি যতেœ নির্মিত এই খোসবাগে।
হঠাৎ করে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে নিজেদের কিছুটা আলগা করতে হয়ত এর দরকারও আছে। তাছাড়া ভ্রমণের পরতে পরতে থাকে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। লেখক মার্ক টোয়েনের সেই উক্তি‘ বিশ বছর পরে এই ভেবে হতাশ হবেন, আপনার যেখানে ভ্রমণ করা সম্ভব ছিল, তা আপনি পারেননি। সুতরাং দেরী না করে বেরিয়ে পড়–ন, আর নিজেকে আবিস্কার করুন ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়।” সহকর্মী সাংবাদিক শামীম পারভেজ কে আমরা পর্যটনীয় এরোপ্লেন বলতেই পারি। দেশে-বিদেশে ভ্রমণের বিষয়ে তার রয়েছে চমৎকার অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি তার সাথেই রওয়ানা হয়েছিলাম মুর্শিদাবাদ দেখতে। ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাকে সবসময় টানে। আমি বারবার ফিরে যেতে চাই আমাদের শেকড়ে। তাছাড়া বাংলার সবশেষ স্বাধীন নবাবদের ঘটনা-দূর্ঘটনাবহুল স্মৃতিবিজড়িত স্থান না দেখলে পূর্ণতা আসেনা। সাথে ছিলেন ইভারগ্রিণ সরোয়ার ভাই, কৌতুকপ্রিয় মজার মানুষ আমিরুজ্জামান বাবু ভাই, কালেরকণ্ঠের মোশাররফ ভাই, অনুজ ও উদীয়মান সাংবাদিক নাহিদ ও আসাদুজ্জামান মধু।
ট্রেনে করে মুর্শিদাবাদে যখন পৌছালাম, তখন কিছুটা রাত হয়ে গেছে। মুর্শিদাবাদ জেলা বেশ কোলাহল ও যানজটমুক্ত শহর। পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম শহর মুর্শিদাবাদে সুউচ্চ আধুনিক কোন ভবন চোখে না পড়লেও পুরনো ভবনগুলো আভিজাত ও সুদৃশ্য।
ভ্রমণ শুরু হয়েছিল কাঠগোলা দেখার মধ্য দিয়ে। পুরো এলাকা জুড়ে শুধু আম আর আম গাছ। তবু এর নাম কাঠগোলা কেন হলো, কৌতুহল থাকলেও ব্যস্ততার কারণে উত্তর খোজা সম্ভব হয়নি। কাঠগোলার কয়েকটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাজস্থান থেকে আগত ব্যবসায়ী লছমিপত সিং ১৮৭৪ সালে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করেন। ভবনের ভেতরে লছমিপত সিংয়ের কষ্টিপাথরের একটি মূর্তিও রয়েছে। এই মূর্তির সামনে যেয়ে সরোয়ার ভাই তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘কিগো! বাংলার নবাবেরা এসেছেন! একটু খানাপিনা আর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করুন! ’’ বর্তমানে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও মাছের চিড়িয়াখানাও নির্মিত হয়েছে। ভাল লাগল বিলিয়ার্ড খেলার বোর্ড দেখে। আভিজাত ইংরেজরা খেলাটি পছন্দ করতেন।
কাঠগোলা থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। অনেক দর্শীয় স্থান দেখতে হবে। জগৎ শেঠের প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে আশ্চর্য হলাম তৎকালিন সময়ে শেঠদের শান-শওকত ও বিলাসবহুলতার স্মৃতি নিদর্শন দেখে। দু’শ বছর আগে ইস্ত্রি করে জামা-কাপড় পরতেন জগৎ শেঠ। নিতেন আধুনিক চিকিৎসাও। সেআমলে ব্যবহৃত সুই-সিরিঞ্জ এখনো সংরক্ষিত আছে তার প্রাসাদে।  তার আসল নাম মহাতাপ চাঁদ। জগৎ শেঠ তাদের পারিবারিক উপাধি। ’জগৎ শেঠ’ অর্থ জগতের ব্যাংকার। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ইংল্যান্ডের মুদ্রার সাথে এদেশীয় মুদ্রার বিনিময় করার প্রয়োজনেই ইংরেজদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে জগৎ শেঠের। ঐতিহাসিকদের মতে, মীর জাফরের আমলে জগৎ শেঠ ভালোই ছিলেন। পরবর্তীতে মীর কাসিম নবাব হলে জগৎ শেঠ ইংরেজদের সাথে আবারো চক্রান্ত শুরু করেন। একপর্যায়ে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে হেরে গেলে ক্রুদ্ধ মীর কাসিম জগৎ শেঠকে মাংঘর এলাকায় শিরñেদ করে হত্যা করেন।
জগৎ শেঠের বাড়িতে রয়েছে তৎকালিন সময়ে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের বিশাল এক সংগ্রহশালা। রয়েছে সোনা ও রুপার মুদ্রা। টাকশাল, জলসা-ঘর, তাশ-ঘর আর যেখানে-সেখানে সুঢৌল বুক আর চওড়া কটিদেশবিশিষ্ট নগ্ন নারীমুর্তি সেসময়ে শেঠদের জৌলুসপূর্ণ জীবন-যাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পালানোর জন্য তিনি অবশ্য প্রাসাদের মধ্যে সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করে রেখেছিলেন। যদিও এপথ তার মৃত্যুকে ঠেকাতে পারেনি।
জগৎ শেঠের প্রাসাদ দেখে সবাই আসি নেমক হারাম দেউড়িতে। পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, আমরা কোথায় এসেছি। নিমক খেয়ে যারা হারামি করে আর বিশ^াসঘাতকদের সমর্থক নামতো ভারতবর্ষে একটাই, মীর জাফর! প্রতি বৃহস্পতিবার দেউড়ির মূল ফটকের মধ্যে ঢোকার অনুমতি থাকে দর্শনার্থীদের। তবে একেবারে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপরও দ্বিতীয় গেট দিয়ে উকি মেরে দেখা গেল, এখানে একটি শিয়া মসজিদ আছে। আর তার পাশে মীর জাফরের বংশধর ড. সৈয়দ রেজালি খানের বাসঘর। মধুতো প্রধান ফটকের ভেতর ঢুকতেই ক্রোধান্ধ হয়ে ইট মেরে বসল পাচিলের গায়ে। হয়ত বর্তমান প্রজন্মের এসব তরুণেরা বংশানুক্রমিক নিষ্পেষণের ইতিহাস জানে বলেই নিজেকে সামলাতে পারেনি।
মীর জাফর ভারতবর্ষে এসেছিলেন ইরান থেকে। তিনি শিয়া মুসলিম ছিলেন। বিহারে এসে তিনি নবাব আলিবর্দি খাঁর অধীনে চাকরি নেন। গিরিয়ার যুদ্ধে তিনি রণকৌশল দেখিয়ে আলিবর্দির নজরে আসেন এবং পরবর্তীতে প্রধান সেনাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন। তিনি আলিবর্দি খাঁর বৈমাত্রেয় বোনকে বিয়েও করেছিলেন। বিশ^াসঘাতকতা ছিল মীর জাফরের মজ্জাগত বিষয়। আলিবর্দি খাঁ জীবিত থাকতে তিনি একবার তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে লোকমুখে প্রচলিত আছে মীর জাফর কুষ্ঠরোগে পরিণত বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তবে এর ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। তিনি যেভাবেই মারা যাননা কেন, সহ¯্রবছর তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের গালি আর বিশ^াসঘাতকতার প্রতিনাম হিসেবে। তবে আগে থেকে শুনে আসছিলাম, মীর জাফরের কবরে দর্শনার্থীরা ঘৃণাস্বরুপ প্র¯্রাব করেন। তবে আদৌতে এসব ঘটেনা এখানে। জাফরগঞ্জে মীর জাফর ও তার বংশধরদের এক হাজার ১শ’ কবর রয়েছে।
জাফরগঞ্জ থেকে হাজারদুয়ারী আসা হলো। ভেতরে ঢুকতে পারেনা বলে গাইডরা সামনের কিছু দৃশ্যপটের বর্ণনা দিয়ে টাকাটা হালাল করার চেষ্টা করেন। তবে আমাদের গাইড হাসিব ছিলেন বেশ চৌকষ ও বাকপটু। তিনি হাজারদুয়ারীর সামনে ১৬০ মণ ওজনের বাচ্চা বলি কামান ও ধর্মীয় স্থাপনা সিরাজুম্মদিনার বা সাদা মদিনার বিষয়ে বর্ণনা দিলেন। কামান তৈরি ও ডুবে যাওয়ার প্রায় দু’শ বছর পরেও কার্যক্ষমতায় এটি নতুনের মত ছিল। হাজারদুয়ারী রাজপ্রাসাদ তৈরির প্রাক্কালে ভাগিরথি থেকে বালু উত্তোলনের সময় উদ্ধার হয় কামানটি। কথিত আছে, বারুদ ভরে কামানটি ফায়ার করার পর বিস্ফোরিত বিকট শব্দে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এর নামকরণ করা হয় বাচ্চা বলি কামান। সাদা মদিনা নবাব সিরাজের সময়ে নির্মিত একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করা হয়। অন্যান্য স্থাপনাগুলো ইংরেজরা ধ্বংস করে দেয়। কথিত আছে, মদিনার মাটি মাঝখানে রেখে তৈরি করা এই স্থাপনাটির দরজা তৈরি করা হয়েছিল বহু মুল্যবান রতœসামগ্রী দ্বারা। সিরাজের পতনের পর মীর কাসিম দরজাটি খুলে নিয়ে মুঙ্গেরে যান।
‘হাজারদুয়ারী প্রাসাদ’ নামটা শুনলেই শিশুরাও বলতে পারবে এর নামকরণের হেতু। হ্যাঁ, হাজারটা দরজা আছে এ প্রাসাদে।
হাজার দুয়ারীতে উঠতে যাওয়ার সিঁড়িতে হাসিবের একটি ডায়ালগ সবার ভালো লাগল। ‘জনাব, এই মুহুর্তে নিজেকে নবাব ভাবুন, আর নবাবী কায়দায় ধীর পদব্রজে রাজপ্রাসাদে ঢুকুন। ’’
টিকিত কাটাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই অপার বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। সিরাজের পতনের ৭২ বছর পরে ১৮২৯ সালে তৎকালিন গভর্নর জেনারেলের উপস্থিতিতে পুতুল নবাব হুমায়ুন জা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ৮ বছর পর ১৮৩৭ সালে প্রাসাদের নির্মাণকাজ শেষ হয়। নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা।
হাজারদুয়ারী যত ছবির মতই হোক, ঘৃণা লাগছিল সিরাজের মরদেহ আর দেশের গোলামির জিঞ্জিরের ওপর দাঁড়িয়ে পুতুল নবাবদের নর্তণ-কুর্দণের এদৃশ্য দেখতে। তবুও উঠলাম। প্যালেসের সামনের ভাগের বিশাল সিঁড়ি তৃতীয় তলার দরবার কক্ষে উঠেছে। ঘোড়া চালিয়েই অমাত্যবর্গ আসতেন এখানে। দু’ভাগে সিংহমূর্তি ও কামান রয়েছে। একটি কক্ষের জাদু আয়নায় নাকি নিজের মুখ ছাড়া অন্যদের মুখ দেখা যায়। তবে বাস্তবে এর প্রমাণ পেলামনা।
প্রাসাদটির প্রথম তলায় দর্শণীয় অনেক কিছুই আছে। নবাব আলিবর্দি, সিরাজের ব্যবহৃত তলোয়ার, নাদির শাহের শিরস্ত্রাণ, মীর কাসিমের ছোরা দেখা গেল। তবে দ্রুত হেটে যাওয়ার কারণে অনেককিছু মিস করছিলাম। মোহম্মাদী বেগের যে ছোরায় সিরাজ নিহত হয়েছিলেন, সেটিও দেখা গেল। খানিকক্ষণ থমকে গেলাম। এই সেই ছুরি, যার ফলায় শুধু দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজই ক্ষতবিক্ষত হননি, এককালের স্বর্ণগর্ভা বাংলাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে সাহারার বিরাণভূমি বানিয়ে ছেড়েছে। স¤্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যবহৃত হাতির দাতের পালকি, স¤্রাট শাহজাহানের হাতির দাঁতের তাজাম (হাতির পিটে চড়া গদি আটা আসন) দেখে পুলকিত হলাম।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় চিত্রকলায় ঠাসা। কিছু তৈলচিত্রও আছে। আছে লাইব্রেরিও। আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরী, খলিফা হারুন-আল-রশিদের হাতে লেখা বিশাল কোরান শরীফসহ বিভিন্ন দূস্প্রাপ্য জিনিস এখানে রাখা আছে। ইংরেজিতে বর্ণনা থাকলে ভালো হতো। দ্বিতীয়তলার দরবার হলটি খুবই সুদৃশ্য। যেখানে পুতুল নবাবেরা বসে থাকতেন, আর ছড়ি ঘোরাতেন ইংরেজরা। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল, মীর জাফরের পরবর্তী বংশধরেরা ‘ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ’ এমন ভঙ্গিতে বসে থাকতো। রাণী বিক্টোরিয়া ১০১টি বাতি সম্বলিত বিশাল একটি ঝাড়বাতি নবাব ফেরাদুন জাকে উপহার দিয়েছিলেন। গাইডের মুখে শোনা গেল, এমন ঝাড়বাতি নাকি পৃথিবীতে আর মাত্র একটি আছে। আর সেটি আছে বাকিংহাম প্যালেসে। ফেরাদুন জা ছিলেন একশ’ একটি ছেলের বাবা। ছেলেদের সংখ্যার সাথে মিল রেখে রাণী নবাবকে উপহার দিয়েছিলেন। এ জায়গায় আর নয়! আমার পুর্বপুরুষদের মেহনতি ঘাম আর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ যেন মানষপটে ভেসে উঠছিল।
ভ্রমন প্রায় শেষ। বৃষ্টি¯œাত রুপালি রোদ আর মুর্শিদাবাদের বোবাকান্না প্রায়শই আমাকে উদাস করে দিচ্ছিল। বাতাসের শো শো শব্দ শরীরে হাজারো ষড়যন্ত্র আর লাশের পচা গন্ধের আঁচ লাগিয়ে দিচ্ছিল।
সন্ধ্যার পরে গেলাম মতিঝিলে। ঘষেটি বেগমের প্রাসাদে। তার স্বামী খুবই যতœ করে প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন। পলাশী ষড়যন্ত্রের রুপরেখা এই মতিঝিল থেকেই প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেজন্যই মতিঝিল প্রাসাদ আজ নিশ্চিহৃ হয়ে লজ্জায় হয়ত মাটিতে মুখ লুকিয়েছে। আসলে প্রাসাদ, মানুষ ও তার শৌর্য্য-বীর্য কিছুই স্থায়ী থাকেনা। তাকে শুধু সত্য, ন্যায় আর বীরত্বের ইতিহাস।
হাজার বিঘার মতিঝিল পার্কের নির্মাতা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। চমৎকার করে সাজানো হয়েছে পার্কটি। রাতে পলাশীর ইতিহাস নিয়ে লাইট অ্যা- সাউন্ড শো বেশ ভালো লাগল। সবচেয়ে ভাল লাগল, নেপথ্যের কণ্ঠটি। মতিঝিলের ষড়যন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে মঞ্চে স্থাপিত ঘষেটি বেগম, মীর জাফর, লর্ড ক্লাইভসহ পাঁচটি কষ্টিপাথরের মুর্তি স্থাপনের মাধ্যমে। যেখানে ষড়যন্ত্র করে ইতিহাসকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই সত্য উদঘাটনে এই শো এর আয়োজন!  লেখক: সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি ও দৈনিক সংবাদ