একীভূত শিক্ষা ও শিক্ষা-বহির্ভূত শিশু


প্রকাশিত : জুলাই ১৭, ২০১৭ ||

সানজিদা শাহ্নাজ
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। যে দিন আমাদের সকল শিশুকে গুণগত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারবো, সেদিনই আমরা এ সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবো। আমাদের দেশে অনেক শিশু আছে যারা ইচ্ছা করলেই লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ বিদ্যালয়ে আসলেও দু’এক বছরের মধ্যে বিদ্যালয় ত্যাগ করছে। এ সকল শিশুরা শিক্ষা বহির্ভূত থেকে যাচ্ছে। এ শিক্ষা বহির্ভূত শিশুরা হল: পথ শিশু, শহরের বস্তিবাসী শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, বিশেষ পেশাজীবী সম্প্রদায়ের শিশু (মুচি, মেথর, বেঁদে, যৌনকর্মী, মৎসজীবী ইত্যাদি), কর্মজীবী শিশু, পরিত্যাক্ত শিশু, নি:স্ব পরিবারের শিশু, এতিম শিশু, চা বাগানের শিশু, পাচার হয়ে ফিরে আসা শিশু, জেলখানার শিশু ও এধরনের শিশুরা চরম দারিদ্রতায় নিমজ্জিত শিশু। এদের স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা নেই। এরা অপুষ্টির শিকার। এদের থাকার জায়গা নেই। এসকল শিশু সবচেয়ে বেশী সুবিধা বঞ্চিত। এসকল শিশুকে মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় এনে তাদের উপযোগী শিখন চাহিদা ও সম্ভবনা বিবেচনায় নিয়ে পাঠদন কার্যক্রম পরিচালনা ও বিদ্যালয় পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে একই শিক্ষা আবর্তিত। এ শিক্ষা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য নির্বিশেষে বলে শিশুর বিকাশ ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে একীভূত শিক্ষা ও শিক্ষা বহির্ভূত শিশু।
একীভূত শিক্ষা হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া যা প্রত্যেক শিশুর চাহিদা ও সম্ভবনা অনুযায়ী শিখন ও জ্ঞান অর্জনের প্রতিবন্ধকতা সীমিত অথবা দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায়। সকল শিশুকে একই শ্রেণিতে রেখে একই পাঠ্যপুস্তক ও কারিকুলামের আওতায় নিয়ে নিজ নিজ চাহিদা ও সম্ভবনা অনুযায়ী তাদের শিক্ষার প্রয়োজন মেটানোকেই একীভূত শিক্ষা বলে। একীভূত শিক্ষার আওতায় যে সকল শিশু তারাই বেশী সুবিধা বঞ্চিত শিশু। যেমন :
পথ শিশু : পথ শিশুরা সামাজিক বৈষম্যের শিকার। এরা স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ শিশুরা পুষ্টিহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে ভুগছে। মি. প্যানডার পথ শিশুদের সংজ্ঞা দিয়েছেন, “কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যার পথ হচ্ছে অবাসস্থল এবং যার কোন উপযুক্ত নিরাপত্তা নেই।’’
সমাজসেবা অধিদপ্তর এদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন ’আঠারো বছর বয়সের চেয়ে কম বয়সী শিশু যাদের বসবাস, খেলাধুলা, কাজ, কর্ম ঘুমানো পথেই সম্পন্ন হয় এবং যারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত তারাই পথ শিশু’। মাত্র ৪৪% পথ শিশু হয় বিদ্যালয়ে যায় অথবা ইতিমধ্যে বিদ্যালয় ত্যাগ করেছে। সরকার চেষ্টা করছে এ ধরনের শিশুদের বিদ্যালয়ে আনার।
হতদরিদ্র পরিবারের শিশু : হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদেশের জনসংখ্যার ৩০% মানুষ হতদরিদ্র। দরিদ্রতা প্রায় ১০% শিশুর বিদ্যালয়ে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এদের অভিভাবকরা শিক্ষার ব্যয় বহন করতে অক্ষম। দরিদ্রতা শুধু যে ভর্তি হতে বাধা দেয় তা নয় বরং বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠ সমাপনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সরকার এসব শিশুর জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে তবুও এরা সুবিধা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
যৌনকর্মীদের শিশু : যৌনকর্মীদের শিশুরা মায়ের পেশার কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক কর্মকান্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তো নেই-ই বরং তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যাচ্ছে। এমনকি বিদ্যালয়েও তাদের ঠিকমত জায়গা হয় না। বে-সরকারি সংস্থা এদের নিয়ে কাজ করছে। কিছু কিছু শিশু ইতিমধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে ও ভর্তি হচ্ছে।
দূর্গম এলাকার শিশু : হাওড়, নদীর চর, সমুদ্রতীর অঞ্চল, দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যহীনতায় জীবন-যাপন করছে। এসব শিশুরা ৭৫% বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তবে নিয়মিত নয়। এদের মধ্যে প্রায় ৬৫% শিশুই ঝরে পড়ে। হাওড় অঞ্চলে ঝড়ে পড়ার হার খুবই বেশী।
বস্তিবাসী শিশু : শহরে বস্তিবাসী শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বস্তিতে নেই কোন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, গ্যাস, বিদ্যুৎ পানির সুব্যবস্থা। জরিপে দেখা যায় বস্তিবাসী ৮-১৪ বছর বয়সী ৮৪% শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি বা কোনদিনই বিদ্যালয়ে যায়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে দরিদ্রতা।
পাচার হওয়া শিশু : আমাদের দেশে প্রতিবছরই নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। পাচার হওয়া শিশুরা দেশে ফিরে আর লেখাপাড়র সুযোগ পায় না। এদের পাচার হওয়ার কারণ হল অশিক্ষা, বহুবিবাহ, তালাক দেয়, স্বামী পরিত্যাগ করা, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া।
এতিম শিশু : বাংলাদেশে এতিম শিশুদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। সমাজ সেবা অধিদপ্তর প্রায় ৯৬০০ এতিম শিশুর শিশু পড়ালেখা, চিকিৎস্যা, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বেশ কিছু এনজিও, বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান এতিম প্রতিষ্ঠান এতিম শিশুদের জন্য কাজ করছে।
মৎস্যজীবী শিশু : মৎস্যজীবী পরিবারের অনেক শিশুই তাদের বাবা মাকে কাজে সহায়তা করতে গিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তারা বিদ্যালয়ে আসছেনা। আর যারা আসছে তারা বিভিন্ন কারণে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।
চা বাগানের শিশু : সিলেট, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার জেলায় অনেক চা বাগান আছে। এসব চা বাগানে প্রচুর শিশু আছে যারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসকল পরিবার চা বাগান ভিত্তিক অর্জনের সাথে জড়িত। চা বাগান অঞ্চলের প্রায় ৬০.৪% শিশু বিদ্যালয়ে যায় না।
জেলখানায় শিশু : অনেক শিশুরা বিভিন্ন কারণে জেলখানায় আবদ্ধ থাকে। এজন্য এসব শিশুরা পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে মাত্র দুটি কিশোর সংশোধনাগার রয়েছে। কিন্তু তাও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী শিশু : প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩।’ এ আইনের ৩২ ধারায় প্রতিবন্ধীদের ধরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শারীরিক, মানসিক বুদ্ধিগত, বিকাশগত, ইন্দ্রিয়গত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন ধরন সমূহ : ১। অটিজম ২। শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩। মানসিক বেকার জনিত প্রতিবন্ধী ৪। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৫। বাক প্রতিবন্ধী ৬। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ৭। শ্রবণ প্রতিবন্ধী ৮। শ্রবণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৯। সেরিব্রাল পালসি ১০। বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী ১১। অন্যান্য প্রতিবন্ধী।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর ৩২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভর্তি সংক্রান্ত বৈষম্যের প্রতিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, প্রতিবন্ধীকতার কারণে কোনো শিশু প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তৃপক্ষ উক্ত ব্যক্তির অন্যান্য যোগ্যতা থাকা সত্বেও ভর্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করিতে পারিবেন না।।
এ আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি কোন প্রকার বৈষম্য করা হলে তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ সামাজিক শ্রেণি বিভাজন ও ব্যক্তি সামর্থের পার্থক্য থাকা সত্বেও সকল শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার অভিন্ন কারিকুলামের মধ্যে রেখে মূলধারায় শিক্ষায় সম্পৃক্ত করে প্রত্যেক তার নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করার চলমান প্রক্রিয়াই হচ্ছে একীভূত শিক্ষা। এ শিক্ষা ধর্ম, বর্ণ গোত্র, ও স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য নির্বিশেষে সকল শিশুর বিকাশ ও উন্নয়নে কর্মকর ভূমিকা পালন করে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, দক্ষিণ কাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।