লেখাপড়া শিখবো, সাংবাদিক হবো: মুক্তামনির স্বপ্ন


প্রকাশিত : জুলাই ১৭, ২০১৭ ||

ডেস্ক রিপোর্ট: মুক্তামনির রোগ নিয়ে চলছে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসক ও নার্স ছাড়াও তাকে দেখতে কেবিনে ঢুকছে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। রবিবার (১৬ জুলাই) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার খোঁজ নিতে গিয়ে চোখে পড়লা এমন চিত্র। এই কৌতূহল নিয়ে সে কিছুটা বিরক্ত। তবুও কেমন আছো জানতে চাইলে মুখে হাসি এনে সাতক্ষীরার ১১ বছরের মেয়েটি বললো, ‘ভালো আছি। ডাক্তাররা বলছেন আমি ভালো হয়ে যাবো। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন যেন সুস্থ হতে পারি। তখন লেখাপড়া শিখবো, সাংবাদিক হবো।’

মুক্তামনি বলে, ‘আমি আবার লেখাপড়া করতে চাই। আমরা দুই বোন মিলে আবার স্কুলে যেতে চাই।’ কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছো জানতে চাইলে সে বলে, “ক্লাস ওয়ানে পড়েছি। ক্লাস টু’র বইও গিয়ে নিয়ে আসছিলাম। কিন্তু তারপর আর স্কুলে যাইতে পারিনি।” লেখাপড়া করে কী করতে চাও প্রশ্ন করলে মুক্তামনি বলে ওঠে, ‘সাংবাদিক হতে চাই।’


এর মধ্যে মুক্তামনির যমজ বোন হীরামনি বেডের পাশে হাজির হলো একটি ব্যাগ নিয়ে। এর মধ্য থেকে সে একে একে বের করলো নেইলপলিশ, লিপস্টিক, চুলের বিভিন্ন রঙের ব্যান্ড, হেয়ার ক্লিপ, ব্রেসলেটসহ নানান কিছু। মুক্তামনির লিকলিকে বাঁ-হাতে সেগুলো পরিয়ে দিতে থাকে হীরা। লাল রঙের ব্রেসলেট পরানোর পর সে হীরাকে বলে, ‘এটা না, নীল রঙেরটা বের করো আপা।’ যমজ হলেও তারা একে অপরকে আপা ডাকে বলে জানালেন মা আসমা খাতুন।

 

জানা গেল, মুক্তামনির সাজগোজের অভ্যাস নতুন নয়। সবসময়ই সাজতে ভালো লাগে তার। সুন্দর পোশাক পরতেও পছন্দ করে সে। সেই কবে চার বছর আগে কনে সেজেছিল, ওই কথাও মনে আছে তার। মোবাইল ফোনে মেয়ের সাত বছর বয়সের সেই ছবি দেখালেন বাবা মো. ইব্রাহীম হোসেন। তখনও এত ফুলে যায়নি তার হাত, ধরেনি পোকাও। কিন্তু ফোলা ছিল বলে জানালেন মা।

ছবিটিতে দেখা গেলো, মুক্তামনির বাঁ-হাতভর্তি লাল-নীল রঙের চুড়ি। গলায় তিন লহরের গয়না। ডানহাতের আঙুলে তিনটি আংটি। লাল জামার সঙ্গে মিলিয়ে সোনালি জরির ওড়না। নকল চুলের একপাশে বিনুনি আর মাথার সামনে রঙ-বেরঙের গয়না। আছে টিপ-লিপস্টিকও। সব মিলিয়ে বউয়ের সাজে মুক্তামনি।

 

 

‘সেই শেষবার। তারপর আর এমন করে সাজা হয়নি ওর। আর এভাবে সাজার স্বপ্ন দেখেনি আমার মেয়ে’ — বলতে বলতে ধরে আসে মায়ের গলা। এভাবেই তিনি বলতে থাকলেন, ‘এই লাল ওড়না দুই বোনের জন্য এক পহেলা বৈশাখে কিনে আনছিল ওদের বাবা। মেয়েরা সাজতে পছন্দ করে বলে ওদের বাবা প্রচুর সাজগোজের জিনিস কিনে আনে। আর ওর মিন্দি (মেহেদি) দেওয়া না দেখলে আপনি বিশ্বাস করিবেন না। ঘাড় দিয়ে চেপে আরেক হাতে সে মিন্দি দেয়, কারও দেওয়া তার পছন্দ হয় না।’

 

বিরল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় সাতক্ষীরার মুক্তামনি এখন সবার মনোযোগের কেন্দ্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন, এজন্য মেয়েটি ধন্যবাদ জানাতে ভোলেনি তাকে। পাশে বসা মুক্তামনির বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে সুস্থ হবে এ আশাই কোনোদিন করিনি। কিন্তু সাংবাদিকদের নজরে আসায় আজ আমার মেয়ে এখানে। দেশের সেরা ডাক্তাররা আমার মেয়েকে দেখছেন। তারা বলছেন, আমার আম্মুজান সুস্থ হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন আমার মেয়ের। সবই আপনাদের কল্যাণে। আমি চাই, আমার দুই মেয়েও লেখাপড়া শিখে এমন সাংবাদিক হোক। আমার মতো হাজারও অসহায় বাবার পাশে তারা দাঁড়াক, মানুষের কল্যাণে আসুক’— বলতে বলতে চোখ মোছেন ইব্রাহীম হোসেন।

গত ১২ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তির পর প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা চারটি রোগের কথা ধারণা করলেও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে লিমফেটিক ম্যালফরমেশন রোগে আক্রান্ত মুক্তামনি। এটি একটি জন্মগত রোগ (কনজিনেটাল ডিজিস)। এর বিশেষত্ব হচ্ছে জন্মের পরপরই কিছু ক্ষেত্রে এর প্রকাশ পায় কারও ক্ষেত্রে, আবার কারও ক্ষেত্রে পায় না।
তবে মুক্তামনি এতদিন অবহেলা আর অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে বলে পরিবার এবং চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে। অবশ্য দেরিতে হলেও চিকিৎসকরা এখন বলছেন, তারা আশাবাদী। দীর্ঘমেয়াদী এক চিকিৎসার পরে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।