হিরোশিমা এবং তারপর


প্রকাশিত : আগস্ট ৪, ২০১৭ ||

ড. এম. মতিউর রহমান
আজ ৬আগস্ট ঐতিহাসিক হিরোশিমা দিবস। আজ থেকে ঠিক ৭২ বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬আগস্ট আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত হয়েছিল জাপানের হিরোশিমা শহরের উপর এটম বোম্ব বা পারমানবিক বোমা। জাপানী সময় সকাল ৮টা ১৫মিনিট ১ সেকে-ের সময় এই বোমাটি দ্যা এনোলা গে নামক একটি বি-২৯ যুদ্ধ বিমানের সাহায্যে বোমাটি নিক্ষেপ করে নিরাপদে ফিরে যায় নিজ ঘাটিতে। ‘‘লিটল বয় ’’ ছদ্ম নামের বিমানটি মুহুর্তের মধ্যে হিরোশিমার ৭৬ হাজার দালান কোটার মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার ধ্বংশ করে ফেলে। প্রথম দিনেই মারা যায় প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার অধিবাসী এবং আহত হয় প্রায় ৭০ হাজারের মতো। পরবর্তীতে ৯আগস্ট নাগাসাকি শহরের উপর নিক্ষিপ্ত হয় ফ্যাটম্যান ছদ্ম নামের দ্বিতীয় পরমাণু বোমাটি রাত ৩টা ৪৭মিনিটে কারমিন রিহান নামক জনৈক বিমান চালক এই বোমাটি নিক্ষেপ করে। ২২ হাজার টন টিএনটির সমপরিমাণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিমানটি বিস্ফোরণের ফলে মারা যায় প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ, আহত হয় সমপরিমাণ লোক এবং ধ্বংশ হয় ২০ হাজারের মত ঘরবাড়ি।
প্রত্যেক ধ্বংশের পশ্চাতে থাকে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। প্রত্যেক ধ্বংসের পশ্চাতে থাকে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম হয়নি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও ৯ আগষ্ট নাগাসাকি শহরের উপর পরমাণু বোমা বা এটমবম্বের ধ্বংসযজ্ঞে যে পৃথিবী শিহরিত হয়েছিল, মাত্র দশকের ব্যবধানে পৃথিবী উপলব্ধি করতে শুরু করল কৃষি, শিল্প, চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সেই পরমাণু শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। এটমবোম্ব বা পরমাণু বোমা আর কিছুই নহে, শুধুমাত্র বিভাজন যোগ্য ভারী মৌলিক পদার্থের পরমাণুর অতি অল্প সময়ে যতসম্ভব ক্ষুদ্র স্থানে বিভাজন ঘটানো। সে প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশান। একগ্রাম ভারী মৌলিক পদার্থ ইউরেনিয়াম বা প্লুটুনিয়াম ইত্যাদির অনিয়ন্ত্রিত ফিশান হলে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগেরও কম সময় এবং তাপ উৎপন্ন হবে। ধারনা করা যায় কত অল্প সময়ের মধ্যে এবং অতি ছোট পাত্রে কী বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা গেল। তাইত ইহা এটমবোম্ব। হিসাব করে দেখা গেছে মাত্র ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম ২৩৫ বিভিজান হলে যে তাপের উৎপত্তি হয়, তা দিয়ে প্রায় ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। জীবাশ্ব জ্বালানী পোড়ায়ে এই পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করতে প্রয়োজন প্রায় ২টন কয়লা। এ থেকে অনুমান করা যায় আনবিক কত শক্তিশালী।
বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের মূহুর্তে সৌরজগতের কেন্দ্র বিন্দু সুর্যের যে আলো ও তাপ পৃথিবীকে সচল রেখেছে তার মূলে আছে সূর্যে প্রতিনিয়ত উৎপন্ন পরমাণু শক্তি। সূর্যে প্রতি মুহুর্তে ঘটছে অসংখ্য এটমমোম্বের বিস্ফোরণ। সূর্যে শুধু ফিশান বিস্ফোরণ নহে, ফিউশন বিস্ফোরণও হচ্ছে। ফিউশন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। ফিউশনে দুটি হালকা পরমাণুকে ফিউজ বা সংযোজিত করে একটা নতুন মৌলিক পদার্থের সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়ার বিপুল পরিমাণ তাপ ও শক্তির উৎপন্ন হয়। ফিউশন ঘটাতে যেটা একান্ত প্রয়োজন তা হলো অতি উচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত। এই তাপমাত্রা দুটি হালকা পরমাণু (যেমন ১নং মৌল হাইড্রোজোনর দুটি আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম এই অতিউচ্চ তাপমাত্রায় ফিউজ হয়ে আর একটি মৌলিক পদার্থ হিলিয়ামের একটি পরমাণুর সৃষ্টি করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে) সুর্যের ভিতর ফিশন প্রক্রিয়ায় অতি উচ্চমাত্রার তাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই তাপমাত্রায় সুর্যে প্রতি মুহুর্তে লক্ষ লক্ষ ফিউশন ঘটছে যার ফলে উৎপন্ন তাপ ও আলো এবং ফিশান প্রক্রিয়ার উৎপন্ন ও আলো সুর্যকে চির উত্তপ্ত ও আলোকিত রেখেছে। পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিশান বোমার সাহার্যে উৎপন্ন তাপকে ব্যবহার করে যে হাইড্রোজেন বোমার তৈরী করা হয়েছে ইহাই সুর্যের সেই ফিউশন বোম্ব।
সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে সব থেকে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল বিদ্যুৎ শক্তি। আধুনিক বিশ্বে এক মুহুর্ত বিদ্যুৎ ছাড়া চলার কথা চিন্তা করাই অসম্ভব। সে জাতি বা দেশ তত বেশী উন্নত যার বিদ্যুৎ ব্যবহার যত বেশী। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূলমন্ত্র হলো তাপের সাহায্যে পানি গরম করে বাষ্প তৈরী করে সেই বাষ্প দ্বারা জেনারেটরের টারবাইন ঘুরানো। তাই দরকার তাপ উৎপাদন করার জন্য জ্বালানী। এই জ্বালানী হতে পারে আমাদের পরিবেশ গাছপালা, বনজঙ্গল হতে প্রাপ্ত লাকড়ী পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা জীবাশ্ম খনিজ জ্বালানী-কয়লা তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, সূর্যতাপ এবং পরমাণু ফিশান ও ফিউশন পদ্ধতিতে উৎপন্ন গাছপালা ও বনজঙ্গল জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করা অকল্পনীয়, জীবাশ্ম জ্বালানীর মজুদও সীমিত, সূর্যতাপ ব্যবহার করে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রশ্নবিদ্ধ। তাই ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবেলার একমাত্র ভরসা থাকলো পারমাণবিক জ্বালানী। প্রশ্ন উঠতে পারে পৃথিবীতে কী আনবিক শক্তি ব্যবহার করে চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য পরিমিত জ্বালানী ইউরেনিয়াম ও ডিউটেরিয়াম আছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূলতত্ত্ব হল বাষ্পের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রের টারবাইন চালানো। আর এই টারবাইন চালানোর জন্য বাষ্প বয়লারে রাখা পানিকে চাপ দিয়ে উৎপাদন করা হয়। পানিকে তাপ দেয়ার জন্য প্রয়োজন জ্বালানীর। যে জ্বালানীর উৎস হতে পারে গাছপালা, কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পারমানবিক প্রক্রিয়া (ফিশান ও ফিউশান) আমাদের অনেকের ধারণা কয়লা, তেল বা গ্যাস ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক প্লান্টের সাহায্যে তৈরী বিদ্যুৎ বিভিন্ন। মোটেই নহে। বিদ্যুৎ বিদ্যুৎই-তাই তা জীবাশ্ম ব্যবহার পাওয়ার প্লান্টেই হোক বা নিউক্লিয়ার রিএ্যাক্টর ব্যবহার করা পাওয়ার প্লান্ট থেকেই হোক। জ্বালানী ব্যবহার না করলে তাপ উৎপন্ন হয় না, আর তাপ উৎপন্ন না হলে বয়লারে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরী করা যাবে না, টারবাইন চলবে না বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে না। অতএব তাপ উৎপাদনের জ্বালানী না থাকলে কোন প্রকারেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। পৃথিবীতে জ্বালানীর প্রাপ্যতা সীমাবদ্ধ বটেই। ফিশান ও ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম ও ডিউটেরিয়ামই একদিন না একদিন নিঃশেষিত হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা চুপ করে বসে নেই। খাতা কলম নিয়ে তারা হিসেব করতে লেগে গেছেন পৃথিবীতে প্রাপ্তব্য বিভিন্ন প্রকার জ্বালানী ব্যবহার করে কতদিন পর্যন্ত কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হবে। অনিয়ন্ত্রিত ফিশান প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে পাওয়ার রিএ্যাক্টরে বিদ্যুৎ উৎপাদন গত শতাব্দির পঞ্চাশ দশক থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। আজকাল পৃথিবীর সমস্ত উৎপন্ন বিদ্যুতের প্রায় ১৫ শতাংশই পাওয়ার রিএ্যাক্টরে উৎপন্ন বিদ্যুৎ।
ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানী ডিউটোরিয়ামের প্রধান উৎস পানি। এক গ্যালন পানিতে সাধারণত ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ ১/৮ গ্রাম এবং এই পরিমাণ ডিউটেরিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে তা দিয়ে ১০০০ ওয়াটের একটা বাতি ১ কোটি কোটি বছর জ্বালানো যাবে। সমুদ্রের পানিতে ১০ কোটি কোটি (১০,০০০০০০০০,০০০০০০০০) পাউন্ড ডিউটেরিয়াম আছে। ফিউশন প্রক্রিয়ায় এর থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তা দিয়ে বর্তমানে যে হারে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় সেই হিসাবে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর চলবে। শুধু প্রশ্ন থাকবে একটা। নিয়ন্ত্রিত ফিউশন ঘটায়ে উৎপন্ন তাপ কাজে লাগানো। হিরোশিমায় এটমবোম্বের অনিয়ন্ত্রিত ফিশন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত করে যদি ২০ বছরের মাথায় নিয়ন্ত্রিত ফিশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হয়ে থাকে, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে নিউক্লিয়ার ফিউশনকে নিয়ন্ত্রিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না কেন? বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখক: পরমাণু বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবীদ (প্রাথমিক)