প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতার গুরুত্ব এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে শিক্ষক ও অভিভাবকের করণীয়


প্রকাশিত : আগস্ট ৪, ২০১৭ ||

মো. ঈমান উদ্দিন
সব শিশুর মাঝেই সৃজন বা উদ্ভাবনীমূলক কাজ সম্পন্ন করার সুপ্ত প্রতিভা আছে। সৃজন একটি প্রতিভা যার মাধ্যমে শিশুর স্বাতন্ত্রতা প্রকাশ পায়। সৃজনশীলতা হল কোন বিষয় বা সমস্যাকে নতুন আলোকে দেখার বা সম্পন্ন করার ক্ষমতা। সহজ কথায় বলা যায়, সৃজনশীলতা হলো নতুন কিছু কল্পনা বা উদ্ভাবনের ক্ষমতা। এই ক্ষমতা হলো প্রচলিত ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পুন:প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন ধারণা উদ্ভাবনের ক্ষমতা।
শিক্ষাক্ষেত্রে সৃজনশীলতার গুরুত্ব: শিক্ষাক্ষেত্রে সৃজনশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে না বুঝে মুখস্ত করার প্রবণতা অনেক বেশি। কোন কোন ক্ষেত্রে মুখস্ত করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা অবশ্যই বুঝে করা উচিত। অন্যদিকে কোন কোন ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা আবশ্যক। কেননা, স্মৃতিকে সবকিছু ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় প্রশ্নের পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে নিজ সৃজনী ক্ষমতাকেই কাজে লাগিয়ে পরীক্ষায় উত্তর লিখতে হয়। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন বুঝে নিজ ভাষাশৈলী প্রয়োগ করে নিজস্ব চিন্তা ভাবনা সংযোজন করার মধ্যেই সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পেলে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী হয়। সমস্যার নতুন সমাধান দিতে পারে এবং নতুন এবং সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সৃজনশীলতার সুনিদিষ্ট কোন কৌশল নেই যা আয়ত্ব করলেই যে কেউ সৃজনশীল হয়ে উঠবে। শিক্ষক নিজেই সৃজনশীল হয়ে উঠবে। শিক্ষক নিজেই তার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে পারেন। নি¤েœ সৃজনশীলতার বৃদ্ধির কয়েকটি কৌশল তুলে ধরা হল।
চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা দেওয়া: সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজের সুযোগ দিতে হবে। এতে তার অভ্যন্তরীণ যে চিন্তাগুলো আছে সেগুলো দমে যাবে না। বরং গতানুগতিকতার বাইরে সে চিন্তা করতে শিখবে এবং তার কাজগুলো সৃজনশীল হয়ে উঠবে। শ্রেণি কক্ষে প্রশ্নের উত্তর লিখে দেওয়া বা বইয়ে দাগিয়ে দেওয়া অথবা নোট বই থেকে তৈরি উত্তর মুখস্ত করা ইত্যাদি সবই শিক্ষার্থীদের নিজ থেকে লেখার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। যে বৈশাখী মেলায় শির্ক্ষার্থী অনেকবার গিয়েছে পরীক্ষার সময় ‘মেলা’ রচনাটি কমন না পড়লে সে একটি লাইনও নিজ থেকে লেখার চেষ্টা করে না। যদি সে লেখার চেষ্টা করত তবে কিছু না কিছু অবশ্যই লিখতে পারত। ‘নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই রচনা লিখতে হবে’-এ গতানুগতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে লেখার অভ্যাসকে ব্যাহত করে।
কৌতুহলকে উৎসাহিত করা: শিক্ষার্থীর কৌতুহলকে উৎসাহিত করলে তার মধ্যে নতুন চিন্তার উদ্ভব হয়। শ্রেণীকক্ষে ব্যতিক্রমধর্মী কোন প্রশ্ন বা উত্তরকে দমিয়ে বা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং সেই প্রশ্নকে উৎসাহিত করা উচিৎ। সেই সাথে নতুন কৌতুহল উদ্দীপক প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এই প্রশ্নই তার চিন্তার খোরাক হিসেবে কাজ করবে এবং মস্তিষ্ককে সৃষ্টিশীল কাজের জন্য ক্রমাগত উদ্দীপিত করবে।
শ্রেণিকক্ষে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা: গবেষণায় দেখা যায়, ভাল মুড শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশ সহায়ক হয়। হাসি-খুসি ও আনন্দঘন মানসিক অবস্থা শিশুদের মধ্যে স্বত:স্ফূর্ত নতুন ধারণা গঠনে সহায়তা করে। অন্যদিকে শাস্তি, তিরস্কার বা পাঠের অতিরিক্ত চাপ কিংবা পরীক্ষাভীতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় বাধা দেয়।
ধারাবাহিক গল্প বলার মাধ্যমে: স্কুলে যদি শিক্ষক শিশুদেরকে বানিয়ে গল্প বলতে এবং লিখতে উৎসাহিত করে তাহলে শিশুরা গল্প বানাতে চেষ্টা করবে, চিন্তা করবে, গল্প বানাবে। ধারাবাহিক গল্প বলার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। কারণ এ সময় শিক্ষার্থীকে পূর্ববতী ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কল্পনা দিয়ে গল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। জানা গল্পের বাইরে তাকে নিজ থেকে কল্পনা করে ঘটনা সাজাতে হয়।
সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে অভিভাবকের করণীয়: শিশুর বাড়ির সকল পরিবেশে যেমন বাড়ি বা সমাজে যদি শিশুর সৃজনশীল ক্ষমতার ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা হয় এবং ব্যবহার ও চর্চার সুযোগ প্রদান করা হয় তাহলে শিশুর সৃজনশীল ক্ষমতা বিকশিত হবে। যেমন শিশু বাড়িতে বাবা মা বা দাদী নানীর থেকে মজার গল্প শুনে সে অনেক আনন্দ পায়। দাদী বা নানী যদি শিশুকে বানিয়ে একটি গল্প বলতে উৎসাহিত করে তাহলে শিশুরা গল্প বানাতে চেষ্টা করবে, চিন্তা করবে, গল্প বানাবে। প্রথমে হয়তো গোছালো হবে না কিছুটা অসঙ্গতিও থাকতে পারে কিন্তু ক্রমে ক্রমে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে। শিশুদের বানানো গল্প শুনে তাকে উৎসাহিত করা হলে সে আরও গল্প লিখতে উৎসাহিত হবে। লেখক: মো. ঈমান উদ্দিন, ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, তালা, সাতক্ষীরা।