মা-বাপহীন সাতক্ষীরা


প্রকাশিত : আগস্ট ১২, ২০১৭ ||

এসএম শহীদুল ইসলাম: “এ শহর থেকে চলো সব দু:খ নিয়ে যাই/এই ভাঙা অলি-গলি/ উপচেপড়া নর্দমা-আবর্জনা/ এই যানজট/ বিদ্যুৎবিভ্রাট/ গ্যাস-পানির সংকট/ বাজারে পাগলা ঘোড়া/ ফাটকাবাজারে নি:স্ব আত্মহন্তা/ এতোসব দু:খ নিয়ে, চলো, এখনই চলে যাই।” আমার ভুলভালবাসা কবিতায় কবি কোনো এক শহরের দু:খ দুর্দশার কাল্পনিক চিত্র এভাবেই তুলে ধরেছেন। কবির সেই কল্পনা আজ বাস্তব। বলছি, সাতক্ষীরা শহরের কথা। সাতক্ষীরা শহরের একটি রাস্তাও আস্ত নেই। খানাখন্দে ভরে গেছে প্রত্যেকটি সড়ক। প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। বিকল হচ্ছে যানবাহন। জীবন হারাচ্ছেন অনেকেই। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। সড়কে জল জমে জলাশয় সৃষ্টি হচ্ছে। কাদা পানিতে চলতে যেয়ে নাকাল হয়ে পড়ছেন জেলার ২২লক্ষ মানুষ। সড়ক গলে দইয়ের মত হয়েছে। হাটা-চলার কোন উপায় নেই। রাস্তায় হাটা পথে নামলেই কাদা মাখতেই হবে। তারপরও সড়ক সংস্কার হচ্ছে মাঝে মধ্যেই ভাগবাটোয়াটারা নগদে সম্পন্ন করতে।

সড়কের এমন বেহাল অবস্থা বলবত থাকলে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জেলার সুশীল সমাজের নাগরিকরা। শুধু সড়ক বিভাগ নয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও দুর্দশার জন্য দুষছেন তারা। নাগরিক নেতারা বলছেন, সাতক্ষীরা বর্তমানে অভিভাবক শূণ্য। জেলার সাধারণ মানুষের কাছে হেবিওয়েট হিসেবে নিজকে হাজির করলেও কেন্দ্রে যে এসব নেতাদের মূল্যায়ন ও ওজন কতটুকু তা জনগণ আন্দাজ করতে শিখেছে। কেউ কেউ বলছেন যা বলার হম্বি তম্বি এই সাতক্ষীরার নিরীহ মানুষদের সামনে। ঢাকায় যেয়ে এরা হয়ে যায় এক একটা বড় বড় মেকুর। মিউ মিউ করা ছাড়া এদের আর কোন কাজ নেই। পথ পার হবার সময় মুখ ফসকে বের করে ফেলছেন এ ধরনের অকথ্য ভাষা। পথচারিদের ভাষায় আন্দাজ করা যায় তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপ কোন দিকে যাবে। সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সে টাকা গেলো কোথায়? প্রশ্ন সাধারণ জনগণের। সাধারণ জনগণ আক্ষেপ করে বলেন, কোনো কিছু আনার মুরোদ নেই অথচ সরকার যা পাঠায় তা ভাগবাটোয়ারা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। পথচারিরা জানায়, ইঞ্জিনিয়াররা তো জানে বর্ষার সময় রাস্তা খুড়লে কী হয়? জেনে শুনে বুঝে তারা জনগণকে চরম ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিয়ে টুপাইস কামাই করার ধান্ধায় বর্ষার সময় রাস্তা খুড়াখুড়ি করে।

কেউ কেউ বলছেন রাস্তা ঠিক করার মুরোদ নেই, ভ্যান বন্ধ করার মুরোদ আছে। মা-বাপহীন হয়ে পড়েছে প্রত্যেকটি সড়ক। গত আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বর্ষার পর সেপ্টেম্বরের শেষে সড়ক সংস্কার করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সভার দুদিন পর সরকারি টাকা হরিলুট করার উদ্দেশ্যে সড়কের পিচ খুড়ে ফেলা হয়। তার আবার উদ্বোধন করেন সদর এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। এরফলে সড়কের কাদা নতুন মাত্রায় ঘুটাঘুটি শুরু হয়। এ অবস্থা শুধু এবছর তা নয়। বিগত দশ বছর ধরে চলছে সড়কে দুর্দশা। ২০১৩ সালে এ সড়ক সংস্কার করা হয়। তবে সে সময় ঠিকাদার যেদিন যেখানে কাজ করেছেন ঠিক তার পরদিন সেখানে ছাল চামড়া উঠে যায়। এনিয়ে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট হলে সড়ক মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত টীম আসেন। অভিযোগ রয়েছে টু পাইস নিয়ে ওই টীম ঢাকায় ফিরে যাবার পর ঠিকাদার বিল পেয়ে যায়। ফলে সড়কে যে দুর্ভোগ ছিলো সে দুর্ভোগ থেকে যায়।

নাগরিক নেতারা বলছেন, এ বছর এখনো সাতক্ষীরায় ভারি বর্ষণ হয়নি। যে টুকু বৃষ্টিপাত হয়েছে তা স্বাভাবিকের চেয়েও কম। সড়কে পানি, বাড়িতে পানি। শুধু পানি আর পানি। শহরে থেকেও পানির সাথেই বসবাস করছেন এই এলাকার মানুষ। যাতায়াত ও যোগাযোগে সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছেন জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ। এ বিষয়ে পৌর মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতি জানিয়েছেন সম্প্রতি শহরকে নান্দনিক রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দুই কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে। সাতক্ষীরা হবে তিলোত্তমা নগরী।