গোবিন্দপুর এ এইচ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় শোক দিবস পালন

কাশিমাড়ী (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২ তম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে শ্যামনগরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ গোবিন্দপুর এ এইচ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। অধ্যক্ষ গাজী মোঃ সফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সকল কর্মসূচীর মধ্যে ছিল জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কীর্তির উপর আলোচনা সভা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন, রচনা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, হামদ্ ও নাত এবং সবশেষে ১৫ ই আগষ্টে শাহাদাত বরণকারী সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হাকিম, সহ-প্রধান শিক্ষক শচীন্দ্রনাথ মণ্ডল সহ সকল শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বৃন্দ। দোয়া মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা মোস্তফা নূর হোসেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলা প্রভাষক প্রবীর কুমার রপ্তান।

ব্রহ্মরাজপুর ডি.বি গার্লস হাইস্কুলে শোকাবহ পরিবেশে জাতীয় শোক দিবস পালন

সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ডি.বি. মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ‘শোক হোক শক্তির হাতিয়ার’ এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে শোকাবহ পরিবেশে পালিত হয়েছে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে সমবেত কন্ঠে তীয় সংগীত পরিবেশন, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত অবস্থায় উত্তোলন, এক মিনিট নিরবতা পালন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন, কালো ব্যাজ ধারণ, আলোচনা সভা,পুরস্কার বিতরণ,খাদ্য বিতরণ, বৃক্ষরোপন, দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. নজরুল ইসলাম এতে প্রধান অতিথি হিসেবে জাতির জনকের নীতি আদর্শ ও চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সৈনিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার আহ্বান জানান। এর আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ অনুকরণ ও স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. এমাদুল ইসলাম দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শোকমঞ্চে বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. আসাদুজ্জামান বাবু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ আব্দুর রশিদ, স্কুলের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছোবহান, ইউপি সদস্য রেজাউল করিম মঙ্গল, কোরবান আলী, স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লক্ষ্মীকান্ত মল্লিকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে অসমাপ্ত মহাকাব্য ও চিরঞ্জীব মুজিব সহ বঙ্গবন্ধুর ৭মার্চের ভাষণ প্রদর্শন করেন স্কুলের সহকারি শিক্ষক শহীদুল ইসলাম ও শামীমা আক্তার। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার এসএম ছায়েদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সহকারি জেলা শিক্ষা অফিসার অলোক কুমার তরফদার,সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. জাহিদুর রহমান ও সহকারি শিক্ষা অফিসার আবুল হোসেন। এছাড়া বক্তব্য রাখেন সহকারি প্রধান শিক্ষক অনুজিৎ কুমার মন্ডল, সহকারি শিক্ষক নজিবুল ইসলাম, এসএম শহীদুল ইসলাম, হাফিজুল ইসলাম, দেবব্রত ঘোষ, শিক্ষার্থী সুমাইয়া সুলতানা আঁখি প্রমুখ। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন শিক্ষক নজিবুল ইসলাম। এসময় স্কুলের ম্যানেজিং কমাটির সদ্স্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করে শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা ও ফারজানা আক্তার। অনুষ্ঠান শেষে বিরল প্রজাতির বৃক্ষরোপন করেন অতিথিবৃন্দ।

শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ

শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

জনাব মোঃ আজিজুর রহমান
চালান ডিসকভার গাড়ি,
সবুজশ্যামল প্রশংসিত গাঁও
মাহমুদপুরে তার বাড়ি।
জন দরদী, সুন্দরের পূজারী
জানে এলাকাবাসী,
আচারআচরণে তুষ্ট মোরা
তাইতো ভালোবাসি।
সুমিষ্টভাষী, পরোপকারী
করেন না কারো ক্ষতি,
তাইতো তিনি মোদের গাঁওয়ে
প্রিয় ব্যক্তিত্ব অতি।
এলাকাবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে
স্বপন দেখেন দিবানিশি,
অবহেলিত জনপদে স্বাক্ষরতার হার বাড়বে
চলে হিসাব কষাকষি।
তাই দক্ষ হাতে অধ্যক্ষ পদে
ধরলেন কলেজের হাল,
স্বগর্বে যাত্রা করলো সীমান্ত আদর্শ কলেজ
তুলে দিলেন তার পাল।
কলেজ ক্যাম্পাসে ফুলের সমারোহ
নয়নাভিরাম তার কক্ষ,
২০১৭ সনে কলেজ পর্যায়ের নির্বাচনে
নির্বাচিত হলেন সাতক্ষীরার শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ।
সভাসমিতি, অনুষ্ঠানাদিতে
গুলির মতো তার বাক,
মাঝে মাঝে তার মুখের বদন
লাগায় মোদের তাক।
শ্রেষ্ঠ কলেজের শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ
বিধাতারই প্রতিদান,
সীমান্ত আদর্শ কলেজে তাঁর কর্ম প্রচেষ্টা
চলবে অনির্বাণ।
কিশোরযুবক সকলেই মোরা
জনাব আজিজুর রহমানকে শ্রদ্ধা করি,
গুণী মানুষের কদর করে
আপন ভূবণ গড়ি

শুক্রগ্রহ

শুক্রগ্রহ
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,

 

পশ্চিম গগণে ঝিলিমিলি হাসে
উজ্জ্বল দেখায় সাঁজে,
সন্ধ্যা তারারই অবস্থান
লক্ষ তারার মাঝে।
জ্বল জ্বল করে পূর্ব গগণে
উজ্জ্বল দেখায় প্রাতে,
অবস্থান করে শুকতারা
শেষ রাতে।
সন্ধ্যা রাণীর আবির্ভাবে
বলি যারে সন্ধ্যা তারা,
নিশির শেষে প্রাত:কাল পূর্বে
বলি তারে শুকতারা।
শুকতারা বা সন্ধ্যা তারা
শুক্রগ্রহ তার নাম,
যার নিজ অক্ষের চারদিকে
আবর্তন গতি খুব কম।
বছরে দুইবার শুক্রের আকাশে
সূর্যের উদয় হয়,
কার্বন ডাই অক্রাইডের প্রাদুর্ভাব
এসিড বৃষ্টি ঘটায়।
সূর্যের পরিবারে সৌরজগতে
শুক্র ধরণীয় নিকটতম দ্বিতীয় গ্রহ,
শুক্র গ্রহের রহস্য জানার
আছে মানবের আগ্রহ

বিদ্যুৎ বিনা প্রযুক্তি অচল

বিদ্যু বিনা প্রযুক্তি অচল
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

বিদ্যু বিনা প্রযুক্তি অচল
প্রযুক্তির চাকা দাঁড়ায় থমকে,
বিদ্যুতের অবদানে সমৃদ্ধির চুড়ায় বিশ্ব
দিয়েছে মানবকে চমকে।
বিদ্যু বিনা ত্রিভূবণ ছিলো
নানান সুবিধা বঞ্চিত,
বিদ্যু আবিষ্কারে বিজ্ঞান পূর্ণতা পেল
বিশ্ব হলো আলোকিত।
আকাশের বিদ্যুৎকে আপন করায়ত্তে
যেদিন মানব নিয়ে এলো,
আলোকের যুগইতিহাসে
বিরল অধ্যায়ের সুচনা হলো।
যাতায়াতযোগাযোগ, বিনোদন, রান্নায়
এসেছে চমক ইতিহাসে,
বিশাল বিশাল সব যন্ত্রদানব
হয়েছে পরিণত মানবের কৃতদাসে।
ঘরে বসে দূরদূরান্তের বিশ্বকে
প্রত্যক্ষ করি সহজে,
যে কোন মুহুর্তে, যে কোন প্রান্তে
করতেই পারি যোগাযোগ অনায়াসে
শস্য মাড়াই, ধান ভাঙানো
করছে বিদ্যু চালিত কল,
বীজ ৎপাদন সংরক্ষণে
ব্যবহৃত হচ্ছে বিদ্যু বল।
সরিয়ে নিশির ঘোর আঁধার
করছে বিদ্যু আলোকিত,
গ্রীষ্মের নিদারুন অস্বস্তি অবসানে
হচ্ছে বিশ্ব শান্ত।
রেফ্রিজারেটর ব্যবহারে মানব
করছে খাদ্য সংরক্ষণ,
টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিডি, স্যাটেলাইটে
গড়ছে আনন্দের ভূবণ

 

বিদ্যু ঘাটতি অর্থনীতিতে
বিরূপ প্রভাব ফেলছে,
বিদ্যু বিভ্রাট মাঝে মধ্যে
যেন মিসকল মারছে।
ছোটবড় সকলেই মোরা
বিদ্যু অপচয় রোধ করি,
রীতিমতো বিদ্যু ব্যবহারে
সমৃদ্ধ দেশ গড়ি

 

গ্রাম্য মেলা

গ্রাম্য মেলা
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

ধূসর নিরানন্দ, নিস্তরঙ্গ জীবনে
প্রাণ প্রবাহ সঞ্চারে,
ৎসব আয়োজনের বিস্তৃত পরিসর
গ্রাম্য মেলা দখল করে।
গ্রাম্য মেলা গণ মানুষের
সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ,
গ্রাম্য মেলার ঐতিহ্যের ছোঁয়ায়
ধন্য হয়েছে মোদের বঙ্গ।
আনন্দ উপভোগী গ্রাম্য মানুষ
সহজ, সরল নিরীহ,
গ্রামবাসীদের নিকট গ্রাম্য মেলা
হয়ে উঠেছে খুবই প্রিয়।
বাংলা নববর্ষের বৈশাখী মেলা,
পীরের মাজারে ওরস উপলক্ষ্যে মেলা,
নানান সময়ের নানান মেলা,
আয়োজনে সেগুলো যায় যে বেলা।
নানান পণ্যের পসরা নিয়ে
দোকানীরা দোকানপাট সাজায়,
শিশুকিশোর নানান খেলনা কেনে
ভেঁপু বাঁশি তারা বাঁজায়।
বাহারী ডিজাইনের বাহারী পোষাকে
মেলাগামী জনতা সাজে,
দুরদূরান্ত হতে আগত দোকানীরা
ব্যস্ত থাকে নানান কাজে।
মনোমুগ্ধকর যতো পণ্য সামগ্রী
লোভনীয় মিষ্টিমিষ্টান্নের আয়োজন,
ভোজন বিলাসীদের সারাক্ষণ চলে
দোকানে দোকানে নানান খাদ্য ভোজন।
সামাজিক পরিচয়ের আবরণ খসিয়ে
করে একাকার সাংস্কৃতিক ভেদাভেদ,
গ্রামীণ মেলা মানুষের মিলনক্ষেত্র
থাকে নাকো জাতিধর্মবর্ণের ভেদ

খেলাধূলা

 

 

 

 

খেলাধূলা
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

কর্মই করে মানবকে মহ
কর্মতৎপরতায় মানবের সাফল্য নির্ভরশীল,
শরীরকে সুস্থ রাখতে কর্মের পাশাপাশি
খেলাধুলাকে করতে হবে গতিশীল।
খেলাধুলা হলো শারিরীক ব্যায়াম
দেহমনের বিকাশ ঘটায়,
এক ঘেঁয়েমী জড়তা করে দূর
কর্মে ৎসাহ উদ্দীপনা যোগায়।
কর্মক্ষম প্রাণ প্রাচুর্যে
খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য,
খেলাধুলা চিত্তকে করে প্রফুল্ল
মানবকে দেয় মুক্তির আনন্দ অনিবার্য।
জীবনের গুরুভার কাজ করলেও
সদা অনবরত কর্মই নয়,
কাজের ফাঁকেফাঁকে তাই
বিনোদনের সুযোগ থাকতে হয়।
বলিষ্ঠ দেহ, আনন্দ উচ্ছল মন,
গৌরবদীপ্ত প্রাণকে করে তৃপ্ত,
তারুণ্য দীপ্ত জীবন নিয়মশৃঙ্খলা
খেলাধুলার সঙ্গে সস্পৃক্ত।
খেলাধুলা জীবনে আনে ধৈর্য্যশীলতা
আনে মনে আনন্দ ফুর্তি,
খেলা থেকে আসে সাহস
বাড়ে উপস্থিত বুদ্ধি।
পাড়ায়মহল্লায়, মাঠেঘাটে
এসো মিলে খেলা করি,
নিজের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে
মোরা উত্তরসুরি গড়ি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আপনাকে স্বাবলম্বী করি

আপনাকে স্বাবলম্বী করি
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করে
আপনাকে স্বাবলম্বী করি,
আপন মেধা, বুদ্ধি দিয়ে
দেশকে মোরা গড়ি।
বেকার ঘরে বসে না থেকে
আপন হাতকে কাজে লাগাই,
অর্থনৈতিক দূর্দশায় মুক্তি পেয়ে
আপনাকে কর্মে ফেরাই।
প্রকৃতির নিয়মে ভূবণে মোদের
পরষ্পরের দারস্ত হতে হয়,
এটা যেন না হয় ভিক্ষার সামিল
সেটা হবে মুখ্য বিষয়।
চাকুরী সেতো সোনার হরিণ
করো নাকো তার আশা,
আত্মকর্মসংস্থানে মোরা থাকবো টিকে
বাঁধবো বুকে তার বাসা।
হাঁসমুরগির খামার, পশু পালন
করো বুকে সদা লালন,
ছোটখাটো ব্যবসা আর কুটির শিল্পস্থাপন
করবে নাকো কেহ বারণ।
ভূমি জরিপ, দর্জি প্রশিক্ষণে
হয়ে উঠবে আত্মনির্ভর,
গ্রাম ডাক্তার, ওকালতি, কারিগরী প্রশিক্ষণে
আরো হয়ে উঠবে স্বনির্ভর।
দেশ জাতির জন্য যেমন
স্বনির্ভরতা আশীর্বাদ,
তেমনি করে মোদের জন্য
পরনির্ভরশীলতা অভিশাপ।
সম্মান নিয়ে বাঁচতে মোদের
অর্জিত হবে আত্মবিশ্বাস,
আত্মনির্ভরতা অর্জনে চলবে প্রচেষ্টা
যতক্ষণ থাকবে নিশ্বাস

সুহৃদের প্রয়োজনীয়তা

সুহৃদের প্রয়োজনীয়তা
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক
সীমান্ত আদর্শ কলেজ
মাহমুদপুর,সাতক্ষীরা

জীবনযাপনের গ্লানি দূর করতে
সুহৃদের প্রয়োজনীয়তা রয়,
জীবনকে সুন্দর স্বার্থক করতে
ৎসঙ্গ বিনা এক মুহুর্তও নয়।
নিঃসঙ্গতা পরিহারে জীবনের মুহুর্তগুলো
আনন্দমুখর করে তোলে,
পরোপকারী সহানুভূতিশীল সহচর প্রয়োজন
কথাটি যেন কেহ না ভোলে।
যাদেরকে উপকারী কল্যাণকামী
সহযোগিতাদানকারী হিসেবে ধরি,
তাদের সুপরামর্শ,কল্যাণ ধর্মিতার পরিচয়ে
তাদেরকে ৎসঙ্গ করি।
মানব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব
এককভাবে পরিপূর্ণ নয়,
বহু লোকের সাহায্য সহযোগিতায়
কর্ম প্রবাহ এগিয়ে যায়।
বাইরে থেকে সহায়তা এসে
সে প্রবাহকে পুষ্টে ভরে,
ৎসঙ্গ ব্যক্তির সদা সানিধ্যই
গন্তব্যে পৌঁছতে সহায়তা করে।
ভালমন্দ মিলে মানব জীবনে
নানা সঙ্গী জুটে যায়,
মন্দের অনিষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে
মন্দ সঙ্গী তাড়াতে হয়।
ৎসঙ্গী জীবনের ওষুধ ভেবে
জীবন তরী ভেড়াতে হবে,
তারই সুচিন্তিত নির্দেশনা মোতাবেক
জীবনের সংকট থেকে মুক্তি পাবে

 

 

ছয় রূপসী

ছয় রূপসী
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক
সহকারি অধ্যাপক

ষড় ঋতুর রঙ্গশালায়
ছয় রূপসীর আগমন,
মোরা তো হই হতবাক
অপরূপ নৃত্যঅভিনয় চালিয়েকরে গমন।
ধুধু রুক্ষ রুদ্র তাপসের আবির্ভাবে
দুই নয়নে প্রখর অগ্নিদাহ,
গ্রীষ্ম রূপরঙ্গশালার আদি ঋতু
যোগায় সুস্বাদু লোভনীয় ফলের সমারোহ।
হঠা কালবৈশাখীর তাবলীলা
ঝড়ের দাপটে জীবন হয়ে ওঠে বিষময়,
আম,জাম,কাঁঠাল,আনারস,লিচু
গ্রীষ্মকে করে রসময়।
অসহ্য গরম ধুলিময় ধরণীকে
সিক্ত করে বর্ষা,
মেঘের বাদল বাঁজিয়ে, বিদ্যুতের নিশান উড়িয়ে
বজ্রের হুংকার ছাড়ে সহসা।
নিবিড় কালো মেঘদল
আকাশে ভেসে চলে,
অবিরাম বর্ষণে মাঠঘাট,খালবিল
ভরে ওঠে জলে।
নব অংকুরের জয় পতাকা
আসে পুষ্প বিকাশের লগ্ন,
রূপরসবর্ণশব্দগন্ধগীতে
বর্ষাকন্যা থাকে মগ্ন।
শেষ বর্ষণের পালাগানে পথে প্রান্তরে
কদম্ব কেশরের স্মৃতিচিহ্ন মুছে যায়,
পল্লী প্রকৃতিকে হাসিয়েকাঁদিয়ে
সুন্দরী বর্ষা কন্যা নেয় বিদায়।
বর্ষা শেষে ঋতুরাণী আসে
মনোমুগ্ধকর রূপ নিয়ে,
বাংলার প্রকৃতি হাসিয়ে তোলে
স্নিগ্ধ রৌদ্রের ঝলমল দিয়ে।
বর্ষণ ক্ষান্ত লঘুভার মেঘ
অলস মন্থর ছন্দে নিরুদ্দেশে ভাসে,
মেঘমুক্ত আকাশের সুনীল রূপ,
আলোছায়ার লুকোচুরিযেন হাসে।
রুপালি জ্যোৎস্নার অপরূপ রথে
যেন শারদ লক্ষ্মীর মর্ত্যাগমন,
চারদিকে সৌন্দর্যের দরজা খুলে
রূপলাবণ্য কানায় কানায় ভরে করে গমন

হিমেল ঘন ঘোমটায় মুখ ঢেকে
হিম কুয়াশার জালে হেমন্তের আগমন,
প্রকৃতি আপনরূপে মুগ্ধ হয়ে
নিশিকালে আনন্দাশ্রু করে বিসর্জন।
সোনালী ফসলে সারামাঠ ভরে
নতুন ধানে নবান্ন আনে,
রূপালি হেমন্ত মানবমনে
আনন্দ আনতে জানে।
জড়তাগ্রস্থ নির্মম বার্ধক্য
বিষাদময় প্রতিমূর্তিরূপে শীতের আগমন,
হিমশীতল রূপমূর্তির ধুসর মহিমা
প্রচ্ছন্ন তপস্যার কঠোর আত্মপীড়ন।
কনকনে শীতের তীব্রতায়
খেজুর রসের মিষ্টিমধুর আবেশে,
পিঠাপায়েস,মুড়িমোয়ার আনন্দে
সর্বত্যাগী হিমবুড়ি নীরবে যায় নিমিষে।
নতুন প্রাণ, নবউদ্দীপনায় অপরূপ সাজে
ঋতুরাজ বসন্ত আসে,
নানা ফুল ফোটে, আমকাঁঠাললিচু হয় মুকুলিত
ঋতুরাজ বসন্তে ধরণী যেন হাসে।
মৌমাছি দল গুন গুন রবে
ফুলে ফুলে ঘোরে,
কাননে কাননে কোকিলের কুহু কুহু ডাকে
প্রাণ চঞ্চল করে।
রূপসী বাংলার ছয় রূপসী
নানান বর্ণগন্ধগানে আবর্তিত,
রূপসাগরে ঢেউ লাগিয়ে বিদায় বার্তায়
প্রাণকে করে ব্যথিত

বর্ষণ মুখর দিন

বর্ষণ মুখর দিন
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক

ঘুম থেকে জেগেই দেখি
সারা আকাশ মেঘে কালো,
তাকাই যে দিকেই ঘোলাটে আঁধার
লাগে নাতো একটুও ভালো।
দূপুর গড়াতেই নামলো বৃষ্টি
বসলো নাকো পড়ায় মন,
বৃষ্টির ধারা চলতে লাগলো
যেন দিবারাত্রি সারাক্ষণ।
ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখি
শ্রাবণ মাসের তারিখ দুই,
গাছে গাছে ফোঁটে নানা ফুল
কেয়া, কামিনী, কদম, জুঁই।
সেই একটানা নূপুর নিক্কন
অবিরল ধারায় বৃষ্টি ঝরছে,
ঘরের ছাঁদে, টিনের চালে
যেন বর্ষাকন্যা নৃত্য করছে।
বর্ষার সাজে ব্যাকুল বয়ে
আচ্ছন্ন থাকতে না পারি,
সর্বকাজ ফেলে আপন মনে
বাইরে তাকিয়ে দেখি বারি।
মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন
গাছের ডালে বাতাসের ঝাঁপটা,
হঠা বাজ পড়ার প্রচন্ড শব্দে
গেল বুঝি মোর প্রাণটা।
জলপরীদের এমন নৃত্যে
প্রাণ যে গেল ভরি,
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে
মুই ঘুমের আয়োজন করি।
মনের মাঝে অনেক তত্ত্বকথা
সফল হবে নানা সাধনা,
প্রতিটি মুহুর্ত কাজে লাগাবো
আসে সদা এই ভাবনা

পরিচিত সেই খোকা

পরিচিত সেই খোকা
মোঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দীক,
সহকারি অধ্যাপক

অসহযোগ আন্দোলনসহ সকল সংগ্রামে
যিনি ছিলেন এক রোখা,
তিনি আর কেহ নন
টুঙ্গিপাড়ার পরিচিত সেই খোকা।
মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ
বিনাসুতায় মালা গাঁথা,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর শেখ মুজিব
যেন একই সুতায় বাঁধা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট
নয়তো রূপকথা, নয় উপহাস,
বাঙালী জাতির ললাটে রচিত হলো
জগতের নিষ্ঠুরতম নির্মম ইতিহাস।
দেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু
বিপদগামী কুখ্যাত সন্ত্রসীদের শিকার,
নিকটতম আত্মীয়, শিশু রাসেলসহ ষোলজনকে
খুনীরা করলেন খুন নির্বিচার।
তুমি এদেশের জন্য
সহ্য করেছো অনেক নির্যাতন,
খেটেছো জেল, দিয়েছো রক্ত,
দিয়েছো আত্মহুতি, নিজেকে বিসর্জন।
আজো কর্ণকুহরে বেঁজে ওঠে
বিগত দিনের সেই ডাক,
তাইতো বেতার, মাইক্রোফোনে শুনি
তোমার সুললিত বাণী, তোমার হাক।
যতদিন রবে এই বাংলাদেশে
স্বাধীনতার সুবাতাস প্রবাহমান ,
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান

 

 

কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু

কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু
মন্ময় মনির

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’Ñজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত দুই লাইনের এই কবিতাটি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মর্মবাণী বহন করে। ১২০৪ সালে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর ১৩৪১ সালে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন বাংলার নৃপতি হন। তারপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথিবীবাসীর কাছে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৪২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির জন্য পৃথিবীতে একটি স্বাধীন ঠিকানা নির্মাণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় দুর্বৃত্তের হাতে সপরিবারে শহীদ হন। শুধু বিদেশে অবস্থান করার কারণে প্রাণে রক্ষা পান জননেত্রী শেখ হাসিনা ও মহীয়সী শেখ রেহেনা। বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যে বক্তব্য, বিবৃতি দেন এবং নিবন্ধ লেখেন তা বাস্তব সম্মত, বাঙালির অধিকার আদায়ের দলিল। তাঁর সমগ্র লেখনীর বক্তব্য এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় ভরপুর। নির্যাতিত-অত্যাচারিত বাঙালির জন্য তিনি জীবনব্যাপী যে উচ্চারণ করেছেন তা বিশ্ববিবেকের কাছে নন্দিত এবং স্বীকৃত। তিনিই বাঙালিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছেনÑবাংলাদেশকে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর সমকালীন প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিক কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ছড়া, গান লিখেছেন। বিশেষ করে কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে অঙ্কিত করা হয়েছে তা পাঠকদের উদ্দেশ্যে স্বল্পবিস্তর তুলে ধরা হলো।
‘মুজিব আমার স্বপ্ন সাহস/মুজিব আমার পিতা/ মুজিব আমার রক্তে-বীর্যে/নন্দিত সংহিতা’Ñউপরের এই চরণগুলি রচনা করেছেন মাটি, মানুষ, প্রেম ও প্রকৃতির কবি মুহাম্মদ সামাদ। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন। তিনি বাঙালির স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে রক্তে-বীর্যে ধারণ করেছেন। তাঁর রচিত ‘মুজিব’ কবিতায় তিনি আরও লিখেছেন-‘মুজিব আমার স্বাধীনতার /অমর কাব্যের কবি/ মুজিব আমার হৃদয়পটে/চির সবুজ ছবি।’ সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই স্বাধীন সোনার বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে মুজিবকে পিতা বলেছেন। কবি মুহাম্মদ সামাদ বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছেন ‘শাপমুক্তি’ কবিতা।
কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ প্রভৃতি কবিতাগুলো। কবি লিখেছেন-‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/রবীন্দ্রনাথের মত দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/তখন পলকে দারুন ঝলকে/তরীতে উঠিল জল হৃদয়ে লাগিল দোলা/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা।/ কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি/শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি-/‘এবারের সংগ্রাম আমাদের সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ / সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’ কবি নির্মলেন্দু গুণ একজন সাহসী কবি। ১৯৭৫ সালের পর যখন অনেকেই খন্দকার মোশতাক-মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভয়ে কথা বলতে পারত না ঠিক তখন এই কবিতাটি বাংলা একাডেমিতে কবি সকণ্ঠে পাঠ করে শোনান। ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দেন। সে সময় রেসকোর্স ময়দানের রূপ কেমন ছিল সেটিও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা’ কীভাবে আসল তা নিখুঁতভাবে এই কবিতায় তুলে ধরেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের করুণ চিত্র বিধৃত হয়েছে কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘সেই রাত্রির কল্প-কাহিনী’ কবিতায়। সেই রাত্রে বঙ্গবন্ধুসহ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর তিন পুত্র, পুত্রবধূদ্বয়, আত্মীয়-স্বজনসহ অনেকের নিহত হওয়ার ঘটনা কবির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। কবিতায় তিনি শেখ মুজিবের কথা বলেছেন, কবি কারো রক্ত চাইতে আসেনি। কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও অনেক কবিতা রচনা করেছেন।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেনÑ‘সেই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/ যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান,/ তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-/চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।’ সৈয়দ শামসুল হক একজন সব্যসাচী লেখক ও কবি। তাঁর লেখায় মুক্তিযুদ্ধ, মানবতা ও আবহমান কাল থেকে বাঙালির ঐতিহ্য বিধৃত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে’ কবিতাখানি।
বঙ্গবন্ধু’র শাহাদাৎ বরণের পর শোকাহত কবি মহাদেব সাহা ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’ কবিতায় লিখেছেন,
‘তোমাকে কিভাবে বলবো তোমার নিষ্ঠুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে
প্রথমে জয়বাংলা, তারপরে একে একে ধর্ম নিরপেক্ষতা
একুশে ফেব্র“য়ারি ও বাংলা ভাষাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো তারা,
এমনকি একটি বাঙালি ফুল ও একটি বাঙালি পাখিও রক্ষা পেলো না।
এর বেশি আর কিছুই তুমি জানতে চাওনি বাংলার প্রিয় সন্তান শেখ মুজিব!
কিন্তু আমি তো জানি ১৫ আগস্টের সেই ভোর বেলা
প্রথমে এই বাংলার কাক শালিক ও খঞ্জনাই আকাশে উড়েছিলো।
তার আগে বিমান বাহিনীর একটি বিমানও ওড়েনি,
তোমার স্বপক্ষে একটি গুলিও বের হয়নি কোন কামান থেকে
বরং পদ্মা-মেঘনাসহ সেদিন বাংলার প্রকৃতিই একযোগে কলরোল করে উঠেছিলো।’
বাংলাদেশের আধুনিক কাব্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, নাগরিক নিসর্গের কবি, আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকগুলো কবিতা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ। স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান ‘যাঁর মাথায় ইতিহাসের জোতির্বলয়’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তখন ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে/কয়েকটি কর্কশ অমাবস্যা ঢুকে পড়ল। অকস্মাৎ/স্বপ্নার্দ্র হরিণের আর্তনাদে জেগে ওঠেন তিনি, প্রশস্ত বক্ষ,/দীর্ঘকায়, সুকান্ত পুরুষ, যাঁর মাথায় ইতিহাসের জ্যোতির্বলয়,/এসে দাঁড়ালেন, অসীম সাহসের প্রতিভূ।’ ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘ধন্য সেই পুরুষ নদী সাঁতরে পানি থেকে যে উঠে আসে/ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে;’। তিনি আরও লিখেছেন ‘ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা, /ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে/মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’ বঙ্গবন্ধুকে অতি নিকট থেকে তিনি দেখেছেন। বাঙালি জাতির কাণ্ডারী বঙ্গবন্ধুকে ধন্য পুরুষ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে তিনি কবিতাগুলো লিখেছেন।
আমাদের গ্রাম-বাংলার কবি, পল্লী কবিসম্রাট জসীম উদ্দীন তাঁর বঙ্গবন্ধু কবিতায় উচ্চারণ করেছেন, ‘মুজিবুর রহমান/ওই নাম যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নি উগারী বাণ।’ বঙ্গবন্ধুকে তিনি সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করে কবিতাখানি রচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালির অধিকারের কথা বলতেন। এই অধিকারের কথা বলতে যেয়ে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে, নির্যাতিত হতে হয়েছে পাকিস্তানিদের কাছে বারবার। তবু বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের চিত্র এই কবিতায় ফুঁটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অতি উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে এই কবিতা রচনা করেছেন কবি জসীম উদ্দীন।
বাংলার মহিয়সী মহিলা কবি সুফিয়া কামাল অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে কবিতা লিখেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় দুষ্কৃতিকারী, ক্ষমতালোভী নরপশু ঘাতক কর্তৃক বঙ্গবন্ধু হত্যায় কবি অত্যন্ত আহত হয়েছেন। কিছুতেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে হারাতে চান না-বাংলার বুক থেকে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে যারা খুন করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রার্থনা করে বঙ্গবন্ধুকে বাংলায় ফিরে আসার আহ্বান করে তিনি লিখেছেন ‘ডাকিছে তোমারে’ কবিতাটি। এই কবিতায় কবির উচ্চারণ, ‘এই বাংলার আকাশ বাতাস, সাগর গিরি ও নদী/ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি।’
কবি আসলাম সানী বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে লিখেছেন,
‘খুব সকালে পাখি ডাকে
মুজিব মুজিব বলে
তারই কথা মুক্ত আকাশ
বাতাস নদীর জলে,
মুজিব নামের সুধা আহা
কি যে মধুময়
মুজিব নামে ধ্বনিত হয়
জয় বাংলার জয়।’
কবি নিপু শাহাদাত এর কবিতায় বঙ্গবন্ধু অনন্য রূপে ভাস্বর। তিনি উচ্চারণ করেছেন,
‘সবকিছু আজ মূর্ত একই
লাল-সবুজে ঢেকে
আমার বাংলাদেশ এখানে
মহান ছবি এঁকে,
টুঙ্গিপাড়া তীর্থভূমি
তুমিই অন্তর
এইখানে সব জাগে, ঘুমোয়
মহান মুজিবর
তিনি তো ভাস্কর।’
কবি সৌহার্দ সিরাজ ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতায় লিখেছেন- ‘বঙ্গবন্ধু অবিনাশী এক বর্ণগুচ্ছের নাম’।
মাগুরার বিশিষ্ট কবি আমির হামজা বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত একটি গীতি কবিতায় লিখেছেন,
‘খুকুমণি শোনো, খোকামণি শোনো
তোমরা দেখো নাই যারা শোনো
এক বীর শিকারীর কথা
সেই শিকারী মারতো শুধু বাঘ
তার সারা গায়ে ভরা ছিলো বাঘের থাবার দাগ।’
‘তোমার তর্জনী উদ্যত কর’ কবিতায় কিশোরী মোহন সরকার উচ্চারণ করেছেনÑ
‘পিতা, তোমার পা ছুঁয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম
তা আমরা রক্ষা করেছি, অনুজের কানে দেয়া প্রত্যয় মন্ত্র
সেটিও বৃথা হয়নি, কিন্তু তোমার পাঞ্চজন্যে
যে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা ছিলো, যে রৌদ্রময় রূপকথা ছিলো
তা আজও ফুলে-ফসলে ভরে ওঠেনি,
আর মুক্তি! সে তো মরীচিকা।’
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির কবিতায় ফুটে উঠেছেন অনন্যরূপে।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও কবিতা লিখেছেন বেলাল চৌধুরী, রবিউল হুসাইন, বিমল গুহ, কামাল চৌধুরী, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শুভ্র আহমেদসহ আরও অনেকে। বাংলাদেশের কিংবদন্তীতুল্য আবৃত্তিশিল্পী ও অভিনেতা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীও বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত প্রায় সকল কবিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব। প্রত্যেক কবিকে বাঙালির অবিসংবাদিত মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মূল্যায়ন করা, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম অধ্যয়ন করা একান্ত অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।

 

টুঙ্গি পাড়ার মুজিব

টুঙ্গি পাড়ার মুজিব
সুদয় কুমার মণ্ডল

ব্রিটিশ শাসন আমল ১৯২০। বিভিন্ন জাতি স্বরাজ্য ও স্বাধীকার লাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ নির্যাতন ভারতবাসীদের মনে প্রতিবাদের ও প্রতিরোধের আগুন জ্বেলে দেয়। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ব্রিটিশ সরকারকে কোণঠাসা করে তুলেছিল। সেই অস্থির মুহূর্তে ১৯২০ সাল ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুংগিপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত শেখ বংশে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়। পিতা লুৎফর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন। মুজিবুর রহমানের পিতা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরিরত একজন রাজস্ব কর্মকর্তা। জন্ম মাত্রই দিগপ্রান্ত উদ্ভাসিত, উল্লাসিত। মধুমতি নদী বক্ষে আনন্দের জোয়ার। গভীর সমুদ্রের অকৃপণ দান। নিবিড় অরণ্যে কুলায়ে পক্ষীকূল গাইছে বোধনের সুরে তন্দ্রাকাতর তরুঅঞ্চল জেগেছে নিরলস বিজনের আকুতির আহ্বানে। গাঢ় অন্ধকারী মেঘ এক ঝলক দেখে নেয় সেই নবজাতকের ভবাদৃশ্য ক্রন্দনরহিত রূপ। বসুমাতা বুঝে ফেলে সন্তানের গুণ ও মহত্ব প্রকাশের আগাম বার্তা। টুঙ্গিপাড়া গ্রাম মধুমতি নদীর তীরে। আর এই মধুমতি নদী ফরিদপুর ও খুলনাকে পৃথক করে রেখেছে। জানা যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ইংরেজ নীলকররা খুলনার আলাইপুরে নীলকুঠি স্থাপন করে নীল চাষ করত। মধুমতি নদীর টুঙ্গিপাড়া ঘাটে অসংখ্য নৌকা থাকত। ইংরেজরা ঐ নৌকা ভাড়া করে উৎপাদিত নীল নিয়ে কলকাতায় যেত। শেখ পরিবারেরও নৌকার ব্যবসা ছিল। তারা কলকাতায় ব্যবসা করত। এই সুবাদে শেখ মুজিবের পূর্বসুরীরা কলকাতার জানবাজারে অনেক জমি কিনেছিল। শেখ বংশের পাশে কাজী বংশ বাস করত। তারা অনেকেই শেখদের আত্মীয় ছিল। তথাপিও এই দুই বংশের মধ্যে সম্পর্ক সন্তোষজনক ছিল না। কাজীরা সবসময়ই শেখদের ক্ষয়ক্ষতি ও নানা রকমের বিরোধিতা করে এসেছে। শেখ বংশের তুলনায় কাজী বংশের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকলেও তাদের ছিল লাঠি-বল বেশি। তাই সবসময় উভয় বংশের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকত। শেখ মুজিবের পূর্বপুরুষদের কলকাতার জানবাজারে রাণী রাসমনির জমির পাশে যে জমি ছিল কাজী বংশের লোকেরা রাসমনির সহযোগিতায় এবং রাসমনি ইংরেজদের সহায়তায় সেই জমি জবর দখল করে নেয়।
১৯৩৬ সালে শেখ মুজিব সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তখন তার চোখে মারাত্মক অসুখ (গ্লুকোমা) হয়। মুজিবের পিতা লুৎফর রহমান তাকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে চোখে চশমা ও কিছু দিনের জন্য পড়া বন্ধের নির্দেশ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে তিনি ম্যাটিকুলেশান পরীক্ষা দেন। সেই থেকে বা তার আগে থেকে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ছাত্র থাকাবস্থায় এক সময় তিনি মুসলিমলীগের নেতা হন। তিনি যা বলতেন তারা সকলে তার ভাবাদর্শে মুগ্ধ হয়ে তাই শুনতেন। তিনি স্বজ্ঞানে রাজনীতির বৃত্তায়নে বৃটিশ আন্দোলন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই সময় তিনি বহু তুখোড় বাজনৈতিক প্রবক্তার সান্নিধ্য ও আনুকল্য লাভ করেছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রবসু স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানের প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনৈতিক মনোভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকে আর্শিবাদ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে যখন ডোমিনিয়ন ভাগ হয় তখন মুজিবুর রহমানের বয়স ২৭ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তখন বি.এ পাশ করেছেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আইন বিভাগে ভর্তি হলেন। ছাত্র রাজনীতিতে হয়ে ওঠেন অত্যন্ত দক্ষ-আর সেই সময় তিনি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। যৌবনের প্রশান্ত গতিকে তিনি স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক অঙ্গনে, বাংলার মেহনতি মানুষের কল্যাণে নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিঃস্বার্থ বিবেকের বিশাল জোয়ারে।
এক ঝাক বিদেশী সভ্যতার কালো পাখি উড়ে এসে যখন জুড়ে নিল রূপসী বাংলার শ্যামল প্রান্তর, মেহনতি মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত ফসল গ্রাস করতে চেয়েছিল সীমাহীন বুভুক্ষতায় হনন করতে চেয়েছিল বাঙালির প্রাণ সত্বাকে। নানা বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার শাসনের নামে শোষণ নিপীড়নের মাধ্যমে করতে চেয়েছিল বাঙালির মৌলিক অধিকার হরণ ও দাসত্বে পরিণত। এমনিতর পরিস্থিতিতে আধুনিক সভ্যতার বুক চিরে বেরিয়ে আসে রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে সামাজিক রঙ্গমঞ্চে উৎচ্ছিষ্টতার নগ্ন চিত্র। মহাকালের বিপর্যয়ের রণবাদ্য যেন হঠাৎ প্রতিবাদ ও প্রতিকারের বিন্যস্ত স্পর্শে থমকে যায়।
আবার অন্যায় অত্যাচারের, অবিচারের অশুভ আলোক বর্তিকা নিদানিক তেজে জ্বলে ওঠে স্বার্থের প্রহরে প্রহেলিকার বিভৎস্যতানে। বাতাসে বয়ে আনে লালসার ঈস্পিত ঝড়। সবুজ বনানী, তরু কূল করে দেয় খান খান। কেড়ে নেয় সম্ভ্রম অসহায় মাতৃজাতি। নারী নির্যাতনের ছোবলের বিষাক্ত জারক দেহাভ্যন্তরে ছুঁয়ে দেয়। রক্ত কণিকায় উপবিষ্ট সম্ভাবনাময় জীবনী সত্বা। প্রাণশক্তির আঁধাররূপী সেই বিপন্ন জীবন সত্ত্বা সংগ্রামী হয়ে অজস্র শ্বেত-লোহিত কণিকার ধাবমান গতিকে প্রবল করে তোলে। জীবকোষের বিভাজন ও চলমান গতি যেমন জীবের উত্থান ঘটায় তদ্রুপ বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিপন্ন মুহূর্তে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান স্বদেশ ও স্বজাতির দুর্দশায় যার মহিয়ান অন্তর ডুকরে কেঁদে ওঠে সেই স্বদেশ প্রেমিক মানব হিতৈষী পূর্ব নির্ধারিত ঐশ্বরিক আশীষপুষ্ট নির্ভিক কাণ্ডারী, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর গর্জে উঠে তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ নীল সাগরে পাল তুললেন।
তার বিপ্লবী আহ্বানে বাংলার ভয়ার্ত আকাশ-বাতাস শংকা ও মুক্তির আলো দেখতে পায়। বাঙালি উদ্দীপনায় সাড়া জাগে। নতুন আলোর দীপ্ত তেজে দূরাশায় মোহনা শুষে নিয়ে কাঙ্খিত ফল ছিনিয়ে নেবে। সেই অভিষ্ঠ স্বপ্ন পূরণে জাতীয়তাবাদ মন্ত্রে দিক্ষিত বাঙালি জাতি নিদ্রাকাতরতার জড়তা ঝেড়ে ব্যস্ততম গতিতে জেগে উঠল। অসহায় পঙ্গু জাতির প্রাণ পুরুষ বঙ্গের বন্ধু-এর নিঃশর্ত মুক্তির আহবান বাঙালি জাতিসত্ত্বার চিরশ্রদ্ধার আসন পায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রত্যয় দীপ্ত অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাস্তবতার উন্মেষ ঘটে। জাতীয়তাবাদের মন্ত্রপুত সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে রাজপথে নামে। মুক্তিকামী বাঙালি জাতি দুর্গম রাজপথের দুর্ভেদ্য শৃঙ্খল তুচ্ছ করে স্বদর্পে শত্র“র রক্ত চক্ষু ও লালসার মসনদ দু’পায়ে মাড়িয়ে বজ্রকঠিন দীপ্ত চেতনায় তছনছ করে দেওয়ার দৃঢ় শপথ নেয়।
শুরু হয় আন্দোলন। নেমে আসে বিপ্লব। বেজে ওঠে রণবাদ্য। লক্ষ্যে অলক্ষ্যে বিধ্বংসী চাকা ঘোরে অনবরত। রক্ত রঞ্জিত রাজপথ। বঙ্গবন্ধুর তীব্র প্রতিবাদ কঠোর কর্মসূচী। দিশেহারা শোষন চক্র। মুছে যায় নীল নকশা। কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধু, নেতা কর্মী। ছয়া সংগী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুও দলের নেতা কর্মীদের সর্বদা যুগিয়েছে প্রত্যয়ী মনোবল ও আর্থিক সুবিধা। যে কারণে রাজনৈতিক বলয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার দল বহুলাংশে উপকৃত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান জন্মের পর থেকে বাঙালি জনতার মনে চাপা অসন্তোষ ও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে পাকিস্তান স্বৈরশাসকদের অত্যাচারে ফেঁটে পড়ে, বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বৈরাচারী সরকারের সংক্ষিপ্ত ফিচার তুলে ধরা হল। ১৯৫০ সাল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক রাষ্ট্র ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দু করার সিদ্ধান্ত। ১৯৫১ সালে ৩০ডিসেম্বর খাজা নাজিম উদ্দীন একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ছাত্র সমাজের ডাকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিণতকরার জন্য ধর্মঘট। স্বৈরাচারী সরকারের ১৪৪ ধারা জারি। ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ছাত্র সমাজ প্রকাশ্য রাজপথে মিছিল বের করে। মিছিলে গুলিÑসালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফি ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। শফিউদ্দীনের পিতা শহীদ মিনার প্রথম নির্মাণ করেন। খান সেনারা সেটা ভেঙে দেয়।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং নিরঙ্কুশ বিজয় যুক্তফ্রন্টের। ক্ষমতাসীন দল শোচনীয় পরাজয় বরণ করা সত্ত্বেও নানা তাল বাহানায় নির্বাচনী ফল বানচাল করে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচী। ১৯৫৮ সালে সারাদেশে সামরিক শাসন জারি, ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগে ৬ দফা কর্মসূচী। ১৯৬৮ সালে শ্বায়ত্বশাসন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালে শরণার্থী ভারতে প্রবেশ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘ ৯ মাস এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে মিত্র শক্তি সহায়তায় বাঙালি জাতি ছিনিয়ে নিল তাদের চিরকাঙ্খিত স্বপ্নের স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পশ্চিম পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে কারাগার হতে রাষ্ট্র সংঘের চাপে মুক্তি দেয়। দেশে ফিরে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন । তারপর সংসদীয় প্রথায় তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। আবার ১৯৭৫ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের স্বপরিবারে ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে প্রাণ দিতে হলো। বাঙালি জাতিকে চির শোকের মাঝে রেখে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের কারিগর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে চিরবিদায় হল। যা বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। তাই আগস্ট মাস বাঙালি জাতির বিশেষত বাংলাদেশের মানুষের শোকের মাস। এই আগস্ট মাসে পাকিস্তানের জন্মÑআবার এই আগস্ট মাসে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কারিগরের স্ববংশে নিধন।
সেদিনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘাতকরা হয়ত টুঙ্গিপাড়ার মুজিব পরিবার হত্যা করেছিল। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছিল টুঙ্গিপাড়ার সেই মুজিব, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ক্ষমতায় আসীন রাষ্ট্রপ্রধান। বিশ্ব জননন্দিত যার অসীম ত্যাগ তিতীক্ষায় ও কারাভোগের অশেষ নির্যাতন নিরবে সহ্য করেও অকৃতজ্ঞ জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছিলেন, যাহা পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। এটা বাঙালি জাতির চিরস্থায়ী আদরের গৌরব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কিছু হিংসুটে, বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান, দেশোদ্রোহী, ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানী মদদপুষ্ট দোসর এই বিজয়ের গৌরব মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেনি, তাই বুঝি অকালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে সরিয়ে দিলেন। ইতিহাস কলঙ্কিত মীর জাফরের দল। এ কথা মীর জাফরদের আশা কখনো পূরণ হয় না। কালক্ষেপন হলেও তাদের বিচার একদিন হবেই।

যার রক্তিম আভায়

যার রক্তিম আভায়
সুদয় কুমার মণ্ডল

সূর্যের হাসিটা একখণ্ড কালো মেঘ অকালে
কেড়ে নিল ঘোমটার আড়ালে
সে কি সাগর বক্ষের রজনিচর
না-পাজর নিঙড়ানো জলধর?

যার রক্তিম আভায় দিকপ্রান্ত
দুর্যোগের ঘণঘটা করে অতিক্রান্ত
সে মহতি কৃতি নিবিড় অন্তর মাঝে
অলস দুপুরে কান্তারে প্রান্তরে সে সুর বাজে
অলিকূল গেয়ে যায় স্বাধীনতার গান
সে গান শুনে বাংলা মায়ের জুড়ায় প্রাণ।
এখনও বাঙালির প্রতি ঘরে ঘরে,
যার অবদানে মা, মাটি মুক্ত সোনার ফসল ভরে।

সবকিছু দেখেছে দূর আকাশের নিহারিকা
মেঘ নয়! সে যে বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক বিঘাতি বিভীষিকা।
সাগর মন্থন করে যে করেছে সুধাভান্ড দান
কত মহান, সে যে রতœ গর্ভজাত টুঙ্গিপাড়ার সন্তান
এখনও আমার মানস পটে সেই সমুজ্জ্বল স্মৃতি
প্রতি নিভৃত অবসরে উথলিত বিষাদি উপস্থিতি।