শহরতলীর দশ গ্রাম পানির নিচে


প্রকাশিত : আগস্ট ২২, ২০১৭ ||

পত্রদূত রিপোর্ট: জেলা সদরের মাছখোলা, দামারপোতা, জেয়ালা, নুরাসপুর, শাল্যে, পুরাতন সাতক্ষীরা, বদ্দিপুর কলোনি, রামচন্দ্রপুর, সদুরডাঙ্গি সহ আশেপাশের ১০টা গ্রাম ডুবে আছে পরিকল্পিত বন্যায়।
পুকুর ডুবেছে শতশত, রাস্তায় হাটু সমান পানি, রান্না করার জায়গা নেই, ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরণের সংক্রামক রোগ, অনেকেই গরু ছাগল এবং অন্যান্য গবাদি পশু বিক্রি করে ছেড়ে চলে যাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে। এই দৃশ্য প্রতি বছরের। এটা কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ নয়, এটা মানব সৃষ্ট দূর্যোগ- এমনটাই দাবি এলাকাবাসির।
সাতক্ষীরা জেলা শহর সহ আশপাশের ২টা ইউনিয়নের ১০টা গ্রাম ও পৌরসভার পানি নিস্কাশন হয় ডায়ের বিল দিয়ে। এই বিলের পানি বেতনা নদিতে ফেলার জন্য তৈরী হয়েছিল স্লুইস গেট। পলি জমার কারণে প্রতি বছর ভরে যায় গেটের দুপাশ। যার কারণে বরষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টি হলেই প্লাবিত হয় পার্শবর্তী অঞ্চল। গ্রামের সাধারণ মানুষ ছাড়াও এই ভোগান্তির শিকার স্থানীয় দুইটা ইটভাটা।
ভাটা মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বরষা মৌসুম আসার আগেই এই গেট পরিস্কার রাখতে পারলে পানিটা সহজে নদীতে চলে যাবে। এজন্য তারা গেটের দুইপাশের মাটি সরিয়ে গেট পলিমুক্ত রাখতে গেলে বাঁধা দেয় গ্রামের স্থানীয় প্রভাবশালি নেতারা এবং মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। যদি কোন বাঁধা না আসে তাহলে আমরা পরিস্কার করে রাখব গেটের দু’পাশ। আর এর জন্য কোন বাজেট করার প্রয়োজন নেই।
এ সম্পর্কে এলাকাবাসি হাবিবুর রহমান বলেন, সিডিউল অনুযায়ি গেটের দুই সাইড ক্লিয়ার করার কথা থাকলে ঠিকভাবে ক্লিয়ার করা হয়নি। একথা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বলতে গেলে উনি আমাদের উপর চড়াও হয় এবং খারাপ ভাষায় বলে আমার কাছে জানতে আসছেন কেন ? জানতে হলে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে যান। আপনার সাথে কথা বলার সময় আমার নেই।
মাছখোলা এলাকার মফিজুল ইসলাম বলেন, কয়েক এলকার পানি নিস্কাশন হওয়ার একটি মাত্র গেট এটি। বর্ষা মৌসুমে এলাকা ডুবিয়ে গেটের মাটি অপসারণের বজেটের জন্য এলাকার কিছু মানুষ গেটের সামনে জমে থাকা পলিমাটি কাটতে দেয় না। বর্ষার সময় এলাকা ডুবে গেলে কয়েক ঘন্টা স্কেবিটার দিয়ে মাটি কেটে এখন শ্রমিকদের দিয়ে হাত দিয়ে মাটি খনন চলছে। বড় অংকের বাজেট হলেও আংশিক কাজ করে দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাত করেছে কথিত কয়েজন প্রভাবশালী নেতা।
একই এলাকার মজনু সরদার জানান, আমাদের এই গেটে ব্লু-গোল্ড এর আওতায় কয়েক লাখ টাকা বাজেট হলেও নামমাত্র কিছু কাজ করে বাকি টাকাটা এলাকার কিছু লোকজন গায়েব করে ফেলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসি জানায়, উপর দিয়ে সামান্য কাজ হয়েছে। কিন্তু গভীর করা হয়নি। গেটের পাটা তুলে ঘেরের সুবিধার জন্য, জোয়ারের সময় নদী থেকে পানি উঠানো হয়। তিনি বলেন, পানির মধ্যে কাজ না করলেও কেউ বুুঝতে পারবে না কতটুকু কাজ হয়েছে।
এবিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি প্রকৌশলী অপূর্ব কুমার ভৌমিক বলেন, মাছখোলার স্লুইসটি শহর অঞ্চলের পানি যাওয়ার একমাত্র পথ। প্রতিবছরই এই স্লুইচের দুইপার্শে পলিমাটি জমে। এছাড়া ঘেরের বেড়িবাধ এবং নদীর তলা উচু হয়ে যাওয়ায় সার্বক্ষণিক পানি হয় বের করা সম্ভব হয় না। শুধু ভাটার সময় পানি বের করা সম্ভব হয়। পলি দ্রুত অপসারণের জন্য আমরা ব্লুগোল্ড এর আওতায় এবছর ১২ লাখ টাকা বাজেট করেছি। প্রকল্পটির কাজ চলছে। এখনো কিছুদিন চলবে। যার ফলে পানি এখন বের হচ্ছে। যদি আগের থেকে গেট পরিস্কার রাখা যায় তাহলে জনগনের দুর্ভোগ কম হবে।
ব্লু-গোল্ড এর কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার আমানুল্লাহ পত্রদূতকে বলেন, আমি গত দুই বছর ধরে দেখছি বর্ষার মৌসুমেই গেটটির দুইপার্শে পলি অপসারণ করা হয়। কিন্তু এলাকাবাসি যদি ভাটা মালিকদের পলি নিতে বাধা প্রদান না করে, গেটের মুখ পলিমুক্ত রাখে তাহলে কিছুটা হলেও গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
সময়ের এক ফোড়, অসময়ের দশ ফোড়। শুকনা মৌসুমে ঝুড়ি কোদাল দিয়ে মাটি না কাটতে দিয়ে, এখন বড় বাজেট করে ডুব দিয়ে মাটি পরিস্কারের তোড়জোড়। কার্যক্রম চলতে থাকবে পুরো বর্ষাকাল জুড়ে।
বর্ষা মৌসুমের পূর্বে যদি ডায়ের বিলের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা খাল দখলমুক্ত করে মাছখোলা ও বদ্দিপুর কলোনিতে দুটি নালা খাল তৈরী করে এবং গেটের দুই পাশ পলি মুক্ত রাখা যায় তাহলে আগামি কয়েক বছরের মধ্যে বর্ষা মৌসুমের স্বাভাবিক বৃষ্টিতে পানি বন্ধী হবে না এ অঞ্চলের মানুষ।