বাঘের হামলায় পঙ্গু বনজীবী মোতালেব আজ পথের ভিক্ষারী


প্রকাশিত : আগস্ট ২২, ২০১৭ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): সুন্দরবনে বাঘের সাথে লড়াই করে জীবন বাঁচাতে পারলেও একটি পা হারিয়ে বনজীবী মোতালেব গাজী পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। বাঘের মুখ থেকে রক্ষা পেতে একাই লড়াই করে প্রাণ ফিরে পেলেও বাঁচাতে পারেনি একটি পা। পা হারিয়ে পঙ্গু মোতালেব আজ অসহায়। অন্যের করুণায় তার জীবন চলে। বাঘে খোড়া অপদাব, অপয়া, সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, প্রতারণা আর অবহেলার স্বীকার, বাঘের আক্রমনে পঙ্গুত্ব বরণ করা মোতালেব গাজীর জীবনের চাকা ঘুরছে ভিক্ষা করে।
মোতালবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোতালেব গাজী প্রায় ৩০ বছর আগে সুন্দরবনে গরানকাঠ কাঁটতে অন্যান্য বনজীবীদের সঙ্গে বনে যায়। দিনের কাজ শেষে বনের মধ্যে খালে অবস্থানরত নৌকায় প্রতিদিনের মত ঘুমিয়ে ছিল। রাত প্রায় দেড় টার দিকে পানি সাতার দিয়ে বাঘ নৌকায় ঘুমান্ত মোতালেব গাজীর উপর হামলা করে। এ সময় নৌকে থাকা অন্যান্য বনজীবীরা প্রাণ বাঁচাতে মোতালেবকে ফেলে চলে যায়। ঘুমান্ত মোতালেব বাঘের হামলায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঘ তার বাম পায়ের হাঁটুর উপর কামরিয়ে ধরে। এ সময় মোতালেব বাঘের মুখে চড়-কিল ও পা দিয়ে লাথি মারতে থাকে। মাথার কাছে থাকা কুড়াল হাতে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাঘ তাকে টান দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় সে একটি লাঠি দিয়ে বাঘের মুখে আঘাত করতে থাকে। এ সময় বাঘ মোতালেব গাজীর মুখের উপর থাবা মারলে রক্তাত্ব যখম হয়। এরপরও মোতালেব গাজী প্রাণ বাঁচাতে বাঘের সাথে প্রাণপণ লড়াই করতে থাকে। এক পর্যায়ে বাঘ মোতালেব গাজীর হাঁটু কামড়িয়ে বাঘ নদীতে ঝাপ দিলে তার হাটু ছিড়ে যায়। মোতালেব বাঁচলেও, বাঁচাতে পারেনি তার বাম পা। সেই থেকে মোতালেব পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। পায়নি কোন সরকারী অনুদান বা কোন সহযোগিতা। পেয়েছে শুধু লাঞ্চনা, বাঘে খোড়া অপবাদ আর অপয়া গালি। মোতালেব আশাশুনি উপজেলার খাজরা গ্রামের মৃত কলম গাজীর ছেলে। খাজরায় তার বসত-ভিটা ছাড়া অন্য কোন জমি নাই। সরকারি অনুদানের জন্য খাজরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সহ বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধির নিকট আবেদন করলেও পায়নি কোন সহায়তা। তবে তার ওয়ার্ডের মেম্বর তার জন্য একাধিকবার চেষ্টার পর মোতালেবের জন্য ১০ কেজির ১টি ভিজিডি’র কার্ড করে দেয়। তবে ঐ ইউনিয়নের এক গ্রাম পুলিশের পিতার নাম মোতালেবের পিতার নামে কলম গাজী মিল থাকায় ঐ গ্রাম পুলিশ প্রতারণা করে চাউল উঠিয়ে নেয়। এতে মোতালেব গাজী ক্ষোভে দুঃখে এলাকা ছেড়ে প্রায় ১০ বছর আগে পাইকগাছা পৌরসভায় ২শ টাকা ভাড়া দিয়ে বসবাস করছে। তার ১ ছেলে ও ২ মেয়ে। তাদেরকে অর্থের অভাবে লেখাপড়া ও ভরণ-পোষন করতে হিমশিম খাচ্ছে। মোতালেব পাইকগাছা পৌর সদর সহ গদাইপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাট-বাজার ও বিভিন্ন বাড়ীতে ভিক্ষা করে যা সংগ্রহ করতে পারে তা দিয়ে তার সংসার চলে। মোতালেবের বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর। এই বয়সে জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন তাকে ক্রাসে ভর করে ভিক্ষা করতে বের হতে হয়। মোতালেব জানান, নিজের ইউনিয়ন থেকে কোন দিন কোন সহযোগিতা পায়নি, পেয়েছে শুধু লাঞ্জনা আর মানুষের অবহেলা। তবে পাইকগাছায় আশার পর থেকে ভিক্ষা করে কোন রকম খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। আমি এ এলাকার ভোটার না হওয়ায় আমি কোন জনপ্রতিনিধির নিকট কোন কিছু দাবী করতে পারি না ঠিক, তবে এ এলাকার মানুষ আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করছে।
বাঘের মুখ থেকে বেঁচে আশা সহজ কাজ নয়। প্রাণ বাঁচাতে মরণপণ লড়াই করে বেঁচে এসেছে বনজীবী মোতালেব গাজী। তারপরও সমাজের কাছে তারা অবহেলিত, উপেক্ষিত এর পাশাপাশি অপবাদ শুনে বাঁচতে হচ্ছে। বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আশা বীর সন্তানদের মতই সম্মানের। তাদেরকে সম্মানের আসনে বসিয়ে সব রকম সুযোগ সুবিধা ও সহযোগিতার হাত বাড়ানোর মানসিকতা তৈরী করা বড়ই প্রয়োজন। বর্তমানে সরকার বন্য প্রাণীর হামলায় আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। তবে ইতোপূর্বে যে সকল বনজীবীরা বন্য প্রাণীর আক্রমনে নিহত ও আহত হয়েছে তাদের তালিকা তৈরী করে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর জন্য সরকার সুদৃষ্টি কামনা করেছে সচেতন মহল। তাহলে বাঘে খোড়া বা বাঘ বিধোবাদের অপবাদ, লাঞ্চনা, গঞ্জনা অনেকাংশে লাগোভ হবে এবং সমাজে তারা অন্য দশ জনের মত স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে।