অর্গানিক সবজিতে স্বাবলম্বী গাইবান্ধার চাষিরা


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭ ||

 

মাঠজুড়ে সবজিক্ষেত। পটল, বেগুন, শিম, শসায় ভরপুর জমি। চাষিরা ব্যস্ত পরিচর্যায়। এ চিত্র গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার। সারা বছরই এখানে অর্গানিক পদ্ধতিতে নানান ধরনের সবজির আবাদ হচ্ছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর ও পরিবেশবান্ধব এ পদ্ধতিতে সবজি চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বলে খরচ কম, কিন্তু লাভ বেশি। আর তাই এভাবে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন চাষিরা। স্বচ্ছলতা ফিরছে তাদের পরিবারে।

সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বকশিগঞ্জ, বউবাজার, হিঙ্গারপাড়া, খামারপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠকে মাঠে ফলছে সবজি। এর মধ্যে রয়েছে পটল, বেগুন, শিম, শসা, ঝিঙ্গা, ঢেঁড়স, বরবটি, মাছ আলু (পুরআলু), মিষ্টি কুমড়া ও চাল-কুমড়া। এছাড়া এখানকার চাষিরা চাষ করছেন আদা, হলুদ ও মরিচ। চাষিরা জানান, এসব সবজি চাষে তারা জৈব সার ব্যবহার করেন। তবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, কেবল সাদুল্যাপুর নয়; এ চিত্র জেলার বাকি ছয় উপজেলারও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদরসহ ওই ছয় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আগে ধান, পাট, ভুট্টার চাষ হতো বেশি। তখন সামান্য কিছু জমিতে সবজি চাষ হতো। পরে লাভ বেশি হওয়ায় সবজি চাষে ঝুঁকে পড়েন চাষিরা। এখন উপজেলাগুলোর মাঠের পর মাঠ জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে। সম্প্রতি একই জমিতে একসঙ্গে তিন ধরনের সবজির আবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চাষিদের মধ্যে। আর ‘বিষমুক্ত সবজি’ বলে পরিচিত এসব সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

তবে এসব উপজেলার চাষিদেরই অভিযোগ, কিটনাশক ছাড়া সবজি চাষে সফলতা পেলেও কৃষি বিভাগ থেকে তারা কখনও কোনও পরামর্শ বা সহযোগিতা পাননি।

সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নানান সবজির আবাদ হয়েছে। পাশাপাশি একই জমিতে একইসঙ্গে হলুদ, মরিচ ও বেগুন চাষ করেছেন চাষিরা। এসব সবজি বেড়ে উঠায় চাষিরা এখন ব্যস্ত পরিচর্যায়। কেউ তার জমিতে নিড়ানি দিচ্ছেন, কেউ দিচ্ছেন বাঁশের ঝাংলা, কেউ আবার গাছগুলো তুলে দিচ্ছেন ঝাংলায়।

সাদুল্যাপুরের ধাপেরহাট ইউনিয়নের সাদিপাড়ার সবজি চাষি নজরুল ইসলাম জানান, মাটি উর্বর হওয়ায় কৃষকরা সবজির আবাদ বেশি করছেন। উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে তারা লাভের মুখও দেখছেন। তিনি বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আমি একই জমিতে হলুদ, মরিচ ও বেগুন চাষ করেছি। ইতোমধ্যে বেগুন ও মরিচ ধরতে শুরু করেছে। ১৫-২০ দিনের মধ্যে আমি জমি থেকে বেগুন ও মরিচ তুলে বাজারে বিক্রি শুরু করব। এছাড়া ৬০ দিনের মধ্যে হলুদও বিক্রি করতে পারব।’

একই কথা জানালেন ওই এলাকার চাষি বাদশা মিয়া, নয়া শেখ, আবদুর রহিম। তবে তাদের অভিযোগ, এলাকায় ব্যাপকভাবে সবজি উৎপাদিত হলে কৃষি বিভাগের কেউ কখনও তাদের কোনও পরামর্শ বা সহযোগিতা করেনি। তাদের বিশ্বাস, কৃষি বিভাগ পরামর্শ দিলে ও সহযোগিতা করলে সবজির চাষ ও উৎপাদন আরও অনেক বেড়ে যেতো।

জমি থেকে আগাম জাতের বেগুন তুলছিলেন আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘জমিতে বেগুন ভালো হয়েছে। বাজারে বিক্রি করে দামও ভালো পাচ্ছি। বার মাসেই আমি জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করি। সবজি বিক্রির টাকায় সংসার চলে। এই টাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছি।’ তিনি জানান, তার গ্রাম সাদিপাড়ার অনেকেই সবজি চাষে সফলতার মুখ দেখেছেন। স্বচ্ছলতা ফিরেছে তাদের সংসারে।

সাদিপাড়ার সবজি চাষি সোবহান উদ্দিন, ফয়জার রহমান ও আনারুল ইসলাম জানান, জমিতে চাষ করা নানা জাতের সবজির ফলন ভালো হয়েছে। আর দুই-তিন সপ্তাহ পর সবজি হাট-বাজারে বিক্রি শুরু হবে।

সবজি ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এলাকার সবজির চাহিদা ব্যাপক। এখানকার সবজি ধাপেরহাট বন্দরের আড়তে বিক্রি করেন কৃষকরা। পরে তা পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে।’

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আ.ক. মো. রুহুল আমীন বলেন, ‘জেলায় সবজির উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। জেলার সব সবজি চাষিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ সহযোগিতা করা হবে। কৃষি বিভাগে জনবল সংকট থাকায় প্রান্তিক কৃষকদের কাছে যাওয়া হয় না। তবে কৃষকদের সবসময় মোবাইল ফোনে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবারের মৌসুমে জেলার সদর উপজেলাসহ সাত উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আট হাজার হেক্টর জমিতে নানা জাতের সবজির চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাদুল্যাপুর উপজেলায় বেশি সবজির চাষ হয়েছে। এ বছর সাদুল্যাপুর উপজেলায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। এ উপজেলার মধ্যে ধাপেরহাট ইউনিয়নে সবজির আবাদের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।’