‘জাতিগত সংঘাত’ নয়, জেনোসাইড


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ||

রাহমান নাসির উদ্দিন::
গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাঠ, এবং অমানবিক নির্যাতন হচ্ছে, তা দেশের প্রায় সবগুলো মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমারে যে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চলছে, সেটাকে বাংলাদেশে গণহারে ‘জাতিগত সংঘাত’ হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মিডিয়া, জনপরিসর, একাডেমিয়া, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে পাইকারী হারে মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞকে একটি ‘জাতিগত সংঘাত’ হিসাবে উপস্থাপনের রীতি চালু হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, জাতিগত সংঘাত বললে মিয়ানমারে সংগঠিত ঘটনার তীব্রতাকেই বরঞ্চ খাটো করা হয় এবং পুরো ঘটনাকে একটি ভিন্ন অর্থ দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এখানে বিষয়টা দু’টি জাতির মধ্যে সংঘটিত সংঘাত হিসাবে দেখার কোনও অবকাশ নাই কেননা এখানে রাষ্ট্রীয় পলিসির অংশ হিসাবে রাষ্ট্রের স্বশস্ত্র ও সুসজ্জিত বাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গা সিভিলিয়ানদের হত্যা করছে। পেনি গ্রিন এবং টনি ওয়ার্ড এ ধরনের ঘটনাকে বলেছেন ‘State Crime’। তারা বলেছেন, ‘রাষ্ট্র যখন রাষ্ট্রের একটি সুপরিকল্পিত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তখন তাকে রাষ্ট্রীয় অপরাধ বা স্টেট ক্রাইম বলা হয়’ (দেখুন: State Crime: Governments, Violence and Corruption. London: Pluto Press, 2004)। আর জেনোসাইড হচ্ছে একটা বিশেষ ধরনের স্টেই ক্রাইম। এছাড়াও পেনি গ্রিন এবং টনি ওয়ার্ড তাদের বইয়ে নানান লিগ্যাল সংজ্ঞার বাইরে জেনোসাইডের ১৩ টি সমাজতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক সংজ্ঞার কথা বলেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হিসাবে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, Chalk and Jonassohn (1990) এবং Levene (1994)’এর সংজ্ঞার। তিনজনের সংজ্ঞাকে তারা একত্রে প্রকাশ করেছেন এভাবে : Genocide is the systematic, one-sided mass killing of persons selected on the basis of their perceived membership of an ethnic or communal group, with the aim either of eliminating the group in its entirety, or of eliminating whatever threat it is perceived to pose. (দেখুন:State Crime: Governments, Violence and Corruption. London: Pluto Press, 2004, পৃষ্ঠা: ১৬৬)। অর্থাৎ যদি ধীরে ধীরে একেবারে একপাক্ষিকভাবে কোনও জাতি বা তার সদস্য/সদস্যাদেরকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সমূলে নির্মূল করার জন্য হত্যা করা হয়, তখন তাকে জেনোসাইড বলে। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে মিয়ানমার রাষ্ট্র যখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে নির্বিচার হত্যা, নির্যাতনের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করছে, তখন তাকে আমরা জেনোসাইড কেন বলবো না! নারী-শিশু-বৃদ্ধ-যুবক কোনও ধরনের বাচবিচার না-করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, পুরো গ্রাম কর্ডন করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন নির্বিচারের গণহারে মানুষ হত্যা করে তখন তাকে কোনোভাবেই জাতিগত সংঘাত বলা যাবে না। এটা একটি নির্ভেজাল জেনোসাইড।

এমনকি আন্তর্জাতিক বিধিবিধান বিবেচনা করলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের ঘটনা একটা জেনোসাইড হিসাবে বিবেচিত হতে বাধ্য। যেমন, ‘The UN Genocide Convention 1948 Ges এবং Rome Statute 1998-এর সংজ্ঞানুযায়ী, ‘Genocide is defined as killing, causing serious bodily or mental harm, inflicting conditions of life calculated to bring about physical destruction, imposing measures to prevent births or forcibly transferring children of a national, ethnic, racial or religious group with the intention of destroying the group in whole or in part’। এর বাংলা ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়: কোনও জাতিগোষ্ঠীর লোকজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা, চূড়ান্ত শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতি সাধন, শারীরিকভাবে নির্মূল করার জন্য একটা ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করা, ওই জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করা, এবং কোনও জাতি বা তার অংশ বিশেষকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য নতুন প্রজন্মের সন্তানদেরকে জাতিগত, ধর্মগত, এবং বর্ণগত রূপান্তরে বাধ্য করাকে জেনোসাইড বলে। যদি তাই হয়, তাহলে মিয়ানমারে যা ঘটছে তা নিঃসন্দেহে একটি জেনোসাইড। গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে রাখাইনরাজ্যে হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৬০% গ্রামকে পুড়িয়ে এবং জ্বালিয়ে খালি করে ফেলা হয়েছে। তরুণ এবং যুবকদের অকাতরে গুলি করে মারা হয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে এবং অনেককে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছে। গর্ভবতী নারীদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আবার পালিয়ে আসার সময় পুঁতে রাখা ল্যান্ড-মাইনের বোমায় নারী-শিশু-বৃদ্ধদের অনেককে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত অবস্থায় চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পথে। পুরো দৃশ্যটি একবার কল্পনা করলে সহজে উপলব্ধি করা যায় যে, কী ভয়াবহ তাণ্ডব লীলা চালানো হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর তা সহজেই অনুমেয়। তাই, এটাকে সরাসরি জেনোসাইড হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে ধীরে ধীরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করছে।

২০১২ সালে, ২০১৬ সালে এবং ২০১৭ সালে যা হয়েছে এবং যে মাত্রার হত্যাযজ্ঞ এবং নিযাতন হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই দু’টি এথনিক কমিউনিটির (ethnic community) মধ্যে সংঘটিত এথনিক কনফ্লিক্ট (ethnic conflict) বা জাতিগত সংঘাত হিসাবে বিবেচনা করা যাবে না, কেননা এখানে সরাসরি সরকারি বাহিনী এ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেছে। তাই এটা একটি নির্ভেজাল জেনোসাইড। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও মিয়ামনারের ঘটনাকে জেনোসাইড হিসাবে সনাক্ত করছে। যেমন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ১৪ সেপ্টেম্বরে এটাকে জেনোসাইড হিসাবে উল্লেখ করেছে; আল জাজিরা শুরু থেকেই জেনোসাইড শব্দটি ব্যবহার করছে; নিউজউইক ১২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞকে বলছে অবশ্যই জেনোসাইড; দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ জেনোসাইড শব্দ দিয়ে তাদের নিউজ আরম্ভ করে; সিএনএন সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখ জেনোসাইড শব্দটি ব্যবহার করে; এবিসি নিউজে জেনোসাইড শব্দটি ব্যবহার করে সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ; দ্য টেলিগ্রাফ জেনোসাইড হিসাবে নিউজ করে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ। এরকম পৃথিবীর প্রথম শ্রেণির প্রায় সব মিডিয়া যখন মিয়ানমারের ঘটনাকে জেনোসাইড হিসাবে উপস্থাপন করছে, তখন আমরা কেন এটাকে এখনও জাতিগত সংঘাত, বা জাতিগত নিধন হিসাবে চিহ্নিত করছি এবং সে মোতাবেক শব্দ ব্যবহার করেছি? অনেকে মিয়ানমারের এ হতাযজ্ঞকে গণহত্যা (mass killing) এবং এথনিক ক্লিনজিং (ethnic cleansing) বা জাতিগত নির্মূল হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এ ধরনের চেষ্টার মধ্যে অপরাধের কিছু নাই কেননা এধরনের প্রত্যায়ন যে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়, সেটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু এ নির্মম হত্যাযজ্ঞকে কেবল গণহত্যা এবং এথনিক ক্লিনজিং বললে ঘটনার তীব্রতাকে অস্বীকার করা হয়। এখানে আরো একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি যে, বাংলাভাষায় জেনোসাইড শব্দের অর্থ গণহত্যা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, The UN Genocide Convention 1948 এবং The Rome Statute 1998-এ গণহত্যার (mass killing) বিষয়টি উল্লেখ নাই। সেখানে কেবল জেনোসাইডের (Genocide) কথাই উল্লেখিত আছে।

সুতরাং আমরা যখন আন্তর্জাতিক নানান বিধি-বিধানের কথা বলি এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞকে বিচারের আওতায় এনে এ সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী সমাধানের চিন্তা করছি, তখন মিয়ানমারের এ হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে এবং সে মোতাবেক উপস্থাপন করতে হবে। ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর টেক্সটবুক উদাহারণ হিসাবে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূলের ধারণাও মিয়ানমারের এবারের হত্যাযজ্ঞকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে না। মালয়েশিয়াতে সদস্য অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণ-আদালতের যোগ দেওয়া একজন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. মং জার্নি আদালতের অনুমতি নিয়ে এথনিক ক্লিনজিং (ethnic cleansing) শব্দটার একটি ব্যাখ্যা। তিনি বলেন, ‘এ শব্দ [এথনিক ক্লিনজিং] রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা আত্মঘাতি। কারণ সার্বিয়ার যুদ্ধাপরাধী প্রেসিডেন্ট মিলোসভিচ তার বিরুদ্ধে আনা জোনোসাইডের অভিযোগ থেকে বাঁচতে এথনিক ক্লিনজিং শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। রোম সংবিধিসহ আন্তর্জাতিক আইনের যত বিধিবিধান আছে, তাতে কোথাও এথনিক ক্লিনজিং কথাটা নাই’। সুতরাং আমরা যখন মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞকে জাতিগত নির্মূল বলছি, তখন আমরা মিয়ানমারের অপরাধের মাত্রা ও তীব্রতা আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের কাঠামোতে হালকা করে দিচ্ছি। তাই মিয়ানমারকে যদি আন্তর্জাতিক আদালতে এ ঘটনার জন্য দোষী প্রমাণ করতে হয়, তাহলে এটাকে জেনোসাইড (Genocide) এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes against Humanity) হিসাবে প্রমাণ করতে হবে। মিয়ানমারকে সে অপরাধ থেকে বাঁচানোর জন্য এটাকে জাতিগত সংঘাত (এথনিক কনফ্লিক্ট) বা জাতিগত নির্মূল (এথনিক ক্লিনিজং) হিসাবে উপস্থাপনা করা হচ্ছে যাতে জেনোসাইডের অপরাধ থেকে তারা বেঁচে যায়। তাহলে আমরা কেন সে ফাঁদে পা দিচ্ছি? মিয়ানমারকে গালাগাল করতে গিয়ে প্রকারান্তরে মিয়ানমারকেই জেনোসাইডের মতো ঘৃণ্য অপরাধে অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছি। অতএব মিয়ানমারের ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এবং রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি সংবেদনশীল হতে গিয়ে আমরা যেন অতি আবেগতাড়িত না-হই, সেটা মনে রাখতে হবে। পাশাপাশি, শব্দ ব্যবহারে এবং ঘটনার প্রত্যায়নের আমাদের আরও একটু দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। কেননা, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আমাদেরকে আন্তর্জাতিক ঘরানা এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের কাঠামোতেই করতে হবে। এটা কোনোভাবেই বাই-ল্যাটারাল বিষয় নাই।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।