নগরে বেওয়ারিশ কুকুর: বন্ধ্যা হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার!


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ||

 

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রায় ৭৫ হাজারের মতো বেওয়ারিশ কুকুর। এসব কুকুরের মধ্যে চলতি বছর মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়া হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তবে কুকুর নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংস্থাটির এক কর্মী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের ওই কর্মী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বলছে- কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়া হচ্ছে। বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়া হলে কুকুরের গলায় চিহ্ন হিসেবে একটি বেল্ট লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রাস্তা-ঘাটের কয়টা কুকুরের গলায় এমন চিহ্ন দেখা যায়?’
সিটি করপোরেশন সূত্রে আরও জানা যায়,নগর দাপিয়ে বেড়ানো কুকুরের মধ্যে মাদি কুকুরের সংখ্যাই বেশি। একটি সুস্থ ও সবল মাদি কুকুর বছরে কমপক্ষে তিন থেকে চারটি বাচ্চা দেয়। ফলে প্রতিবছর কমপক্ষে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি বেওয়ারিশ কুকুর জন্মানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ কারণে কুকুরের দৌরাত্ম্যরোধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকাকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করে বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদানের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এখন পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে ডিএসসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (ডা.) শেখ সালাহ্উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমরা মেয়রের দফতরে একটি ফাইল পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে।’

তিনি আরও জানান,‘অতীতে একটি সংস্থার মাধ্যমে বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে সিটি করপোরেশন সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এজন্য আর ওই সংস্থার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়নি।’
এ ব্যাপারে উত্তর সিটি করপোরেশনের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. মো. লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কুকুরের উৎপাত থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে ‘‘অভয়ারণ্য’’ নামক একটি এনজিও’র সঙ্গে চুক্তি করেছে ডিএনসিসি। চুক্তির পর সংস্থাটি তাদের নিজস্ব কর্মী দিয়ে কুকুরের সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য জরিপ করেছে। জরিপে দেখা গেছে, ডিএনসিসি এলাকায় ২৪ হাজার তিনশ’ ৮৫টি বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে। এর মধ্যে অঞ্চল-১ এ দুই হাজার ছয়শ’ ৪টি, অঞ্চল-২ এ চার হাজার নয়শ’ ২টি, অঞ্চল-৩ এ পাঁচ হাজার চারশ’ ১৫টি, অঞ্চল-৪ এ ছয় হাজার একশ’ ৬৩টি এবং অঞ্চল-৫ এ পাঁচ হাজার তিনশ’ ১টি কুকুর আছে।’
ডা. মো. লুৎফর রহমান আরও বলেন,‘এরই মধ্যে অঞ্চল-৩ এলাকার পাঁচ হাজারের মতো কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে। চলতি মাসেই এ অঞ্চলের বাকি কাজ পুরোপুরি শেষ হবে।’ বাকি অঞ্চলগুলো নিয়ে কী করা যায় তা ডিএনসিসি চিন্তাভাবনা করছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে অক্টোবর মাস থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কুকুর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসি’র ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. মো. আজমত আলী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী মাস থেকে আমরা কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদানের কাজ শুরু করবো। প্রথম অবস্থায় এটি ধূপখোলা এলাকায় পরিচালিত হবে। এ জন্য পুরান ঢাকার সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে একটি ক্লিনিক স্থাপন করা হবে। সেখানে প্রতি মাসে চারশ’ কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও আটশ ’ কুকুরকে টিকা দেওয়া হবে।’

ডিএসসিসি এলাকার কুকুর ধরে আনার জন্য দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত আট জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।তবে মাত্র আট জন কর্মী দ্বারা প্রতি মাসে বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়ার জন্য এক হাজার দুইশ’ কুকুর ধরে নিয়ে আসা সম্ভব কিনা এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি। এছাড়া নগরীর অন্যান্য এলাকায় এ কাজ পরিচালনা করা হবে কিনা, যদি হয় তাহলে কবে নাগাদ হতে পারে সে বিষয়েও তিনি কিছু বলেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদানের বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগের কথা বলে আসলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। উল্টো বেড়েই চলেছে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অফিস আদালতেও এসব কুকুর দলবেঁধে ঢুকে পড়ছে। ফলে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কুকুরের কামড় ও আঁচড়ের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। বিশেষ করে ভোরে মসজিদগামী মুসল্লি, স্কুলগামী শিশু ও রাতের পথচারীরা বেশি বিপদে পড়ছেন।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়,এক সময় সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে কুকুর নিধনের মাধ্যমে নগরবাসীকে বেওয়ারিশ কুকুরের কবল থেকে মুক্ত রাখতো। এজন্য অবিভক্ত সিটি করপোরেশনে কুকুর নিধন নামে একটি শাখাও ছিল। এই শাখার মাধ্যমে প্রতিদিন ৪৫টির মতো কুকুর নিধন করা হতো। কিন্তু বিষয়টি অমানবিক বিবেচনা করে কুকুর নিধন বন্ধ করে বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করার নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। ফলে ২০১২ সাল থেকে কুকুর নিধন বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে টিকাদানের মাধ্যমে বেওয়ারিশ কুকুর বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প হাতে নেয় দুই সিটি করপোরেশন। দীর্ঘদিন ধরে ‘অভয়ারণ্য’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ চলছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ঠিক মতো কাজ না করে সিটি করপোরেশন থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর ডিএসসিসি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আর চুক্তি নবায়ন করেনি। অপরদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করে তার পাঁচটি অঞ্চলের মধ্যে মাত্র একটি অঞ্চলে কাজ চলমান রেখেছে। চলতি মাস ‘অভয়ারণ্যে’র সঙ্গে সেই চুক্তির মেয়াদও শেষ হবে।