আত্মসমর্পণের পর কারাগারে বগুড়ার বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা মতিন সরকার


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭ ||

 

বগুড়া শহর যুবলীগের বহিষ্কৃত যুগ্ম-সম্পাদক আবদুল মতিন সরকার একটি হত্যা মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে। দীর্ঘ ৯ বছর পর বুধবার দুপুরে তিনি প্রথম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মতিন শহরের চকসুত্রাপুর এলাকায় আবু নাসের উজ্জ্বল হত্যা মামলায় জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজির হননি। তিনি বগুড়ায় এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও মাসহ তাকে নির্যাতনের আলোচিত ঘটনায় অভিযুক্ত তুফান সরকারের ভাই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবদুল মতিন ১৮-২০ বছর আগে যুবলীগের একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন। পরবর্তীতে অস্ত্রধারী ক্যাডার হয়ে যান। ২০০০ সালের দিকে শহরের নুরানী মোড় এলাকায় সদর ফাঁড়ির টিএসআই তাকে গুলিভর্তি একটি নাইন এমএম পিস্তলসহ গ্রেফতার করেন। ২০০৪ সালের দিকে ওই মামলায় তার ২৭ বছর কারাদণ্ড হয়। কিছুদিন জেলে থাকার পর উচ্চ আদালতে মামলাটি স্থগিত হলে তিনি বেরিয়ে আসেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মতিন রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর সংগঠনকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ভোট ডাকাতি, জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। খুব অল্প সময়ে কোটিপতি হয়ে যান মতিন। নাম পরিবর্তন করে ‘আবদুল মতিন সরকার’ ব্যবহার করতে শুরু করেন।

গত ১ আগস্ট তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বগুড়া জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ডাবলু তখন বলেন, ‘ছাত্রী ধর্ষণ ও মাসহ তাকে ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় মতিনের পরিবারের সদস্যদের নাম আসায় যুবলীগের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই শহর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মতিন সরকারকে সংগঠন থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।’

পুলিশ ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, মতিনের নামে তিন-চারটি হত্যা মামলা রয়েছে। ১৯৯৮ সালের দিকে শহরের নুরানী মোড় এলাকায় গোলাম রসুল, ২০০১ সালে চকসুত্রাপুরে আবু নাসের উজ্জ্বল, ২০১১ সালে মাটিডালি বাণিজ্য মেলায় শফিক চৌধুরী এবং ২০১৫ সালে চকসুত্রাপুরে এমরান হত্যার অভিযোগ উঠে। ২০১২ সালে র‌্যাব-১২ বগুড়া কোম্পানির সদস্যরা তাকে বিপুল পরিমাণ মাদক ও নগদ টাকাসহ গ্রেফতার করে। উজ্জ্বল হত্যা মামলা (৩০২/০৯) প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং এমরান হত্যা মামলা (৩৫/১৫) দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

গত ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর বিকালে শহরের চকসুত্রাপুর এলাকায় আবু নাসের উজ্জ্বল নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তার বাবা আবদুস সালাম সদর থানায় আবদুল মতিন, আবু তালহা ঠান্ডু (পরে নিহত) ও শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ মতিনকে গ্রেফতার করলেও কয়েকদিন পর জামিনে ছাড়া পান। প্রথমে সদর থানা, ডিবি পুলিশ ও সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে। তিন কর্মকর্তা তাকে পলাতক দেখিয়ে তিনবার আদালতে চার্জশিট দেন। ২০০৮ সালের ৬ ডিসেম্বর শেষ চার্জশিটে মতিনের নাম থাকে। ওই বছরের ২৯ জুলাই তার জামিন বাতিল ও ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়। হাজির না হওয়ায় পলাতক আসামি হিসেবে গত ২০১২ সালের ২৫ জুন তার পক্ষে অ্যাডভোকেট তাজ উদ্দিনকে স্টেটডিফেন্স নিয়োগ করা হয়। গত পাঁচ বছর তিনি সরকারি খরচে মতিনের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন।

বগুড়ার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এপিপি রেজাউল হক বলেন, ‘উজ্জ্বল হত্যা মামলায় (নং-৩০২/০৯ দায়রা) আগামী ১৫ অক্টোবর ধার্য তারিখ রয়েছে। বুধবার দুপুরে চার্জশিটভুক্ত আসামি আবদুল মতিন আত্মসমর্পণ করেন। তার পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম এহসানুল হক বাবু জামিন চেয়ে শুনানিতে অংশ নেন। বিচারক মো. ইমদাদুল হক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’

তিনি আরও জানান, আরজিতে উল্লেখ ছিল, নিহত উজ্জ্বলের মা সালেহা বিবি, বড় ভাই আবুল কাশেম মুকুল, ছোট ভাই আবু তৈয়ব ও ভাবী শিউলী আদালতে এফিডেভিট দাখিল করে উল্লেখ করেছেন, মতিনের বিরুদ্ধে তাদের কোনও অভিযোগ নেই। পরে পুলিশ হ্যান্ডকাফ ছাড়াই তাকে হাজতে পাঠায়।

জেলার রফিকুল ইসলাম জানান, বেলা ১টার দিকে মতিনকে হাজতে আনা হয়েছে। বিকালে এ খবর পাঠানো পর্যন্ত তাকে অন্য কোনও জেলে পাঠানোর ব্যাপারে নির্দেশনা আসেনি।

এদিকে দুদক বগুড়া সমন্বিত কার্যালয় যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা আবদুল মতিন সরকার ও তার ভাই নারী ধর্ষক তুফান সরকারের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে।