আশাশুনির উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে হাইকোর্ট তলব ২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ স্থগিত


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৭, ২০১৭ ||

আব্দুস সামাদ: অবশেষে আশাশুনি উপজেলার ২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ স্থগিত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুন্নাহারকে হাইকোর্ট তলব করা হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর আদালতে স্ব-শরীরে হাজির হয়ে অনিয়োমের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ’র হাইকোর্ট বেঞ্চ অন্তর্বর্তীকালীন এ আদেশসহ রুল জারি করেন। যার নং ১৪২৩৪/১৭।
রিটের বিবাদীরা হচ্ছেন- শিক্ষা সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, খুলনার প্রাথমিক শিক্ষার ডিভিশনাল ডেপুটি ডাইরেক্টর, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
এর আগে আশাশুনিতে ৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগে প্রার্থীদের কাছ থেকে দুয়ে ছেন্দে টাকা নেওয়ার অভিযোগে “দৈনিক পত্রদূত” পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের নজরে আসলে তিনি এ নিয়োগ পরিক্ষা স্থগিতের জন্য নির্দেশ দেন। নিদের্শ মোতাবেক কিছু দিন নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ থাকার পর আবারও জেলা প্রশাসনের নিদের্শে সকল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
নিয়োগ বোর্ডের প্রধান উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুষমা সুলতানা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ডিসি স্যারের নিদের্শে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ ছিলো, আবার স্যারে নিদের্শেই পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। কতজন প্রার্থীকে নিয়োগ পত্র দেওয়া হয়েছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৭ জন বাদে বাকিদের নিয়োগ পত্র দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, আশাশুনি উপজেলার ৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ পরীক্ষা কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। পাশাপাশি ৩৬টি স্কুলের মধ্যে ২৯ স্কুলের দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন আদালত। নিয়োগে অনিয়োমের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে রিট আবেদনটি দায়ের করেন দুটি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও একজন চাকরি প্রার্থী। উক্ত রিট আবেদনের প্রেক্ষিকে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে।
পরে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী সাজ্জাদ-উল-ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ৩৬টি বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষার দিনই (৬ সেপ্টেম্বর) পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর কারণে নিয়োগ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী হাজির হয়েছিলো মাত্র একজন করে। এমনকি অনেক স্কুলের চাকরি প্রার্থী ছিলেন ম্যানেজিং কমিটির আত্মীয়। এসব বিষয় আইনের লংঘন। এটি নিয়ে পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়।
তিনি বলেন, আদালত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তলব করে ২৯ স্কুলে দেওয়া নিয়োগ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে রুল জারি করেছেন। রুলে ৩৬ স্কুলের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে কেন পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আশাশুনিতে ৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগে প্রার্থীদের কাছ থেকে দুয়ে ছেন্দে টাকা নেওয়ার অভিযোগে ওঠে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে নিয়োগের বিপরীতে প্রার্থীদের কাছ থেকে মাথা প্রতি ছয় লাখ টাকা থেকে আট লাখ টাকা আদায় করা হয়। এই হিসাবে কম ছে কম ৩ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
অভিযোগে জানাযায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর বুধবার উপজেলার ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পর্যায়ক্রমে ৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ও ৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার অবশিষ্ট ২৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগ পরীক্ষার হওয়ার কথা ছিল। ৬ সেপ্টেম্বর বুধবার অনুষ্ঠিত ৯টি স্কুলের মৌখিক পরীক্ষায় পূর্বেই টাকার বিনিময়ে প্রার্থী চুড়ান্ত করার খবর ছড়িয়ে পড়ায় কমপক্ষে ৫টি স্কুলে টাকা প্রদানকারী প্রার্থী ছাড়া আবেদনকারী অন্য কেউ মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেননি। জানাযায়, নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসাদুল ইসলাম, পাইথলি সরকারি প্রাথমিকে গোপাল চন্দ্র গুহ, উত্তর চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাইফুল্লাহ গাজি, মধ্যম চাপড়ায় আবদুর রাজ্জাক, হাজিপুর সরকারি প্রাথমিকে সেলিম বৈদ্যকে নিয়োগ দানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব প্রার্থীর কাছ থেকে আগাম টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণকারী অন্য পরীক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যায়।
হাজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরির জন্য আবেদনকারী হাজিপুর গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তিনিসহ পাঁচজন প্রার্থী পরীক্ষায় হাজির হন। অথচ তারা নিশ্চিত হন যে আগেই অন্যতম প্রার্থী সেলিম বৈদ্যের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নিয়ে তার নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর বুধবার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় লাউতাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শীতলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাইথলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ পাঁচটি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন করে প্রার্থী হাজির হন। এসব প্রার্থী আগাম টাকা দিয়ে আগে থেকেই নিশ্চিত হন যে চাকরি তারই হবে। ফলে পরীক্ষায় অন্য প্রার্থীরা হাজির হননি।
এরই মধ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়োগের কথা বলে নির্ধারিত পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে আগাম টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একজন প্রার্থী হাবিবুল্লাহ গাজি জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর আবেদন করেন। একই সাথে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। এতে তিনি নিয়োগে চরম দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরেন। পরে জেলা প্রশাসকের নিদের্শে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়।
উক্ত নিয়োগ বোর্ডের প্রধান উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুষমা সুলতানা। এই বোর্ডের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. শামসুন্নাহার খাতুন। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. আফম রুহুল হক ও আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিমের প্রতিনিধি যথাক্রমে শম্ভুজিত মন্ডল ও বুদ্ধদেব সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কমিটির সদস্য।
স্মরণযোগ্য যে, এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শিক্ষা অফিসার শামসুন্নাহার ঘুষের টাকাসহ গ্রেপ্তার হন। তখন তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন।