ফেসবুকে ঘোঁট পাকিয়ে পরিকল্পিত হামলা হয় ঠাকুরপাড়ায়


প্রকাশিত : নভেম্বর ১৩, ২০১৭ ||

 

রংপুরের হিন্দু অধ্যুষিত ঠাকুরপাড়ায় পরিকল্পিতভাবে তাণ্ডব চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমডি টিটু নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত হলেও মূল পোস্টটি তার অ্যাকাউন্টের নয়। রাকেশ মণ্ডল নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টটি সিলেটে বসবাসরত মাওলানা আসাদুল্লাহ হামিদী নামের এক ব্যক্তি শেয়ার করার পর সেটি শেয়ার করা হয় এমডি টিটু অ্যাকাউন্ট থেকে। আর এরপরই টিটুর শাস্তির দাবি ও বিক্ষোভের আহ্বান জানায় মোসাদ্দেকুর রহমান নামে এক ব্যক্তি।তিনি শুক্রবার (১০ নভেম্বর) হামলার সময় একাধিক পোস্ট দিয়ে উত্তেজনাও তৈরির চেষ্টা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে টিটুর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট শেয়ার করার জন্য এই হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেই অ্যাকাউন্টটি ফেক। পুরো ঘটনাটিই পরিকল্পিত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে শুক্রবার রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের আটটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। পরে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে শটগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হন। পরে এ মামলায় জামায়াত নেতাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত রাকেশ মণ্ডলের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি স্ক্রিনশট দিয়ে, যেখানে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেই পোস্ট শেয়ার করে রাকেশের শাস্তি দাবি করেন সিলেটের আসাদুল্লাহ হামিদী। তিনি ১৮ অক্টোবর সকালে তার ফেসবুক ওয়ালে বলেন, ‘রাকেশ যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি জেল-জরিমানা নয়। আমরা গণআন্দোলনের মাধ্যমে তার ফাঁসি চাই।’

 

সেই পোস্ট পরে শেয়ার হয় এমডি টিটু নামের একটি আইডি থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আইডির অ্যাক্টিভিটি বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে, এটি ফেক বা ভুয়া আইডি। এই আইডি থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বারবার এই পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে, যেন এটা নজরে পড়ে। সেই পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতেই টিটুর ফাঁসি দাবি করে বাদ জুম্মা বিক্ষোভের ডাক দিয়ে ফেসবুকে ইভেন্ট খোলেন রংপুরের মোসাদ্দেকুর রহমান। ‘তিস্তা স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠন’ নামের একটি সংগঠনের ফেসবুক গ্রুপের নামে ওই ইভেন্ট খোলা হয়। ঠাকুরপাড়ায় যখন তাণ্ডব চলছিল, তখনও বারবার এই আইডি থেকে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন মোসাদ্দেকুর। যদিও পরে এসব পোস্ট তিনি ডিলিট করে দেন।

টিটুর বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের ডাক ও ইভেন্ট খোলার বিষয়ে মোসাদ্দেকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টিটুর ওই পোস্টটি প্রিন্ট করে এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সেটি কারা করেছে, আমি বলতে পারবো না। তবে সেই পোস্ট দেখে স্থানীয়রা শুক্রবার বাদ জুম্মা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।’ ইভেন্টের মাধ্যমেই তাদের সবাইকে এক হয়ে বিক্ষোভ করার ডাক দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ইভেন্ট খুলেছি ফেসবুকে। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে এর একটি বিচারের জন্য ইভেন্ট খুলেছি। কারণ এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত ছিল।’

মূল পোস্টটি টিটুর না, বরং তিনি শেয়ার করেছেন— বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরেছেন কিনা এবং বুঝেও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মোসাদ্দেকুর বলেন, ‘পরে বুঝতে পেরেছি এবং ইভেন্ট ক্যানসেলও করে দিয়েছি।’ তবে ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত সময়ের পরে সেই ইভেন্ট ক্যানসেল করা হয়। টিটুকে চেনেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

এমডি টিটুর অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা মওঃ আসাদুল্লাহ হামিদীর পোস্ট
টিটুর শেয়ার দেওয়া স্ট্যাটাসটি এসেছে মাও. আসাদুল্লাহ হামিদীর পোস্ট থেকে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো তাকে চিনি না। রাকেশ নামে এক ব্যক্তির এই পোস্টটি আমি শেয়ার করেছি একজনের কাছে খবর পেয়ে। পোস্টটি যেকোনও ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করবে, আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমি সেটি শেয়ার করেছি। কিন্তু এর জন্য টিটুকে কেন আঘাত করা হবে, এটি আমি বুঝতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিটুর ওপর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল কিনা কিংবা মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলার মতো বাড়তি কিছু সে লিখেছে কিনা, তা আমি বলতে পারবো না। আমি বিষয়টি শুনেছি। আমার ওপর আক্রমণ হলো না, টিটুর ওপর কেন হলো, তা আমার বোধগম্য না।’

(বাঁয়ে) এমটি টিটু অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা রাকেশ মণ্ডলের স্ট্যাটাস, (ডানে) এই সংগঠনের নামে টিটু রায়ের বিরুদ্ধে ইভেন্ট খোলেন মোসাদ্দেকুর
জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণারত অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নির্ঝর মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে মনে হয়, ঘটনাটি পরিকল্পিত। এমন একটি ঘটনা ঘটানোর জন্য কিছু টেক্সট সবার নজরে আসুক— কেউ যেন সেটা চাচ্ছিল।’ তিনি আরও বলেন,‘মূল যে পোস্টটা সবাই শেয়ার করছে, ফেসবুকে সেই রাকেশ মণ্ডলের কোনও অস্তিত্বই দেখা যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই পোস্টটি কিভাবে এলো, সেটাও বেশ বিভ্রান্তিকর।’ এর আগে নাসিরনগর, রামুর সাম্প্রদায়িক হামলার ধরনও একইরকম ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ছবি চুরি করে আনাড়ি হাতে বানানো এমডি টিটুর ফেক প্রোফাইল। সেটা যারা বানিয়েছে তারা প্রচুর ক্লু ছেড়ে গেছে।’

ঠাকুরপাড়ার ঘটনাকে রামু ও নাসিরনগরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি উল্লেখ করে রামু সহিংসতার মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে একের পর এক ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। একটা মিথ্যা রটনা দিয়ে সংখ্যালঘুর ওপর এই হামলার কোনও বিচার বা সঠিক তদন্ত না হওয়ায় বারবারই ঘটনাগুলো ঘটছে।’