শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ নয়: প্রয়োজন দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন


প্রকাশিত : নভেম্বর ২৯, ২০১৭ ||

 

এম কামরুজ্জামান

দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে ইন্টারনেট সেবা। চোখের সামনে অনলাইনে খুলে যাচ্ছে অজানা বিস্ময়, না-দেখা নতুন জগৎ। আবার এর অপব্যবহারও হচ্ছে। সেটিও ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের শিশুরা এ অপব্যবহারের প্রধান শিকার। কারণ সীমাহীন কৌতূহল নিয়ে নতুন কিছু জানার আগ্রহে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে। এর অনিরাপদ ব্যবহার তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অনেক শিশু-কিশোরই অনলাইনে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। নির্যাতিত এ শিশুদের আইনি সেবা গ্রহণে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। আবার আইন থাকলেও নেই এর সঠিক প্রয়োগ। তাই এ জাতীয় অপরাধ বাড়ছে। এ কারণে অনলাইনে শিশু যৌন হয়রানিসহ নানা ধরণের অপরাধপ্রবণতাও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেটের সদ্ব্যবহারের ফলে মানুষের যেমন উপকার হচ্ছে, অন্যদিকে এক শ্রেণির অপব্যবহারকারীদের হাতে ইন্টারনেটের মারাত্মক অপব্যবহার হচ্ছে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে সমাজে সহিংসতা, যৌন অপকর্ম, যৌন নির্যাতন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু-কিশোর-কিশোরীরা ইন্টারনেটের অপব্যবহারের প্রধান শিকার। তাদের হাতে সহজে ইন্টারনেট ব্যবহারের উপকরণ পৌঁছানোর ফলে এ অপব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের শিশু, কিশোর-কিশোরীরা তাদের জ্ঞানভান্ডারকে ঋদ্ধ করার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের দিকনির্দেশনা শিক্ষক, পিতা-মাতা কারো কাছ থেকেই পাচ্ছে না। সত্যি কথা বলতে, বর্তমান সরকার প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কম্পিউটার ও ল্যাপটপ পৌঁছে দেওয়ায় ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরাও। রাজধানীসহ বড় বড় শহরের মুষ্টিমেয় স্কুল-কলেজ ছাড়া ইন্টারনেট সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান ছাত্রীছাত্রীদের কতটা দেওয়া হচ্ছে তা অনুসন্ধান করে দেখা উচিত। প্রকৃতপক্ষে, স্কুল-কলেজ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সঠিক নির্দেশনা পেয়ে শিশু, কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনের অপব্যহার করছে বলে জানা যায়। অনিরাপদ ব্যবহার তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অনেক শিশু-কিশোরই অনলাইনে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। ক্যাসপারস্কি ল্যাবের পক্ষ থকে ১০০০ শিশুর উপর গবেষণা চালিয়ে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড মিরর পত্রিকায় তথ্য দিয়েছে, উন্নত দেশে ১০ বছর বয়সী শিশুরা সক্রিয়ভাবে মা-বাবার কাছে তাদের অনলাইন কার্যক্রম লুকানোর চেষ্টা করছে। দেখা গেছে, ১০ বছর বয়সী ৫১ শতাংশ শিশুর নিজের ট্যাবলেট এবং ৩৩ শতাংশের স্মার্টফোন রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ শিশু এমন যারা বিশ্বাস করে তারা অনলাইনে কী করছে, সেটি মা-বাবার কাছ থেকে লুকানোর মতো জ্ঞান এবং দক্ষতা তাদের রয়েছে।

১৩ বছর বয়স থেকে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। ক্যাসপারস্কি আরো জানায় ১০ শতাংশ শিশু তারা অনলাইনে কী করছে সেটি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে না। জরিপে আরো দেখা গেছে, যে সকল শিশুর ওপর ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম করে রাখা হয়েছে তার ২৭ শতাংশ বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। শিশুদের গোপনে ইন্টারনেটের ব্যবহারের ফলে ৪২ শতাংশ শিশু বাজে ভাষা এবং ২৮ শতাংশ হিংস্রতা শিখছে। এছাড়াও ১১ শতাংশ শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। ক্যাসপারস্কি ল্যাবের প্রধান নিরাপত্তা গবেষক ডেভিড এম বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে প্রথম ডিজিটাল প্রজন্ম হিসেবে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটের অন্ধকার দিকটাও প্রবেশ করাটা  সহজ।’ ১০ বছর বয়সী শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় এমন ডিভাইস ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। কিন্তু মা-বাবা তাদের এ বিষয়টি উপেক্ষা করেন, যেটি তাদেরকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে ১০ বছর বয়সী পাঁচজন শিশুর একজন অনলাইনের কারো দ্বারা মর্মাহত হলে তার সম্পর্কে নোংরা কিছু পোস্ট করতে দু’বার চিন্তা করে না। শিশুদেরকে অনলাইন থেকে সুরক্ষিত রাখতে মা-বাবাকে আগে থেকেই তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। আমাদের দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার চালু হওয়ায় এ ভীতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের ফলে উদ্ভূত এ নতুন সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে প্রয়োজন দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন। বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও ইন্টারনেট সেবাদাতাসহ সমাজের সবার সচেতনতাই অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইন্টারনেটের বিস্তৃতি রুদ্ধ করা যাবে না। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারও বন্ধ করা ঠিক হবে না। তবে ইন্টারনেটে যৌন কনটেন্টের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে এর অপব্যবহার কমবে। কমবে অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রর এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ‘দ্রুত বিস্তৃতির কারণে ইন্টারনেটের প্রতি শিশুদের আসক্তিও অতিমাত্রায় বাড়ছে। ইন্টারনেটের খরচ জোগাতে মাদক বহন ও চুরির মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে তারা।’ গবেষণায় বলা হয়, ‘খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া, প্রযুক্তিপণ্যের সহজলভ্যতার কারণে শিশুরা ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকছে। নির্যাতিতরা লজ্জা ও ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। আবার কেউ আইনি সহায়তা নিতে চাইলেও অনেক থানা এসব অপরাধের মামলা সহজে নিতে চায় না।’ বর্তমান সরকার ইন্টারনেট সেবা সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। পর্নোসাইটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেও সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। সরকার এ ধরনের সাইট বন্ধ করার এবং এসব সাইটে প্রবেশের পথ কঠিন করে তোলার লক্ষ্যেও পদক্ষেপ নিয়েছে। শিশুদের প্রতি কঠোর না হয়ে তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। তাদের ইন্টারনেটের সুফল-কুফল সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে কাজ করতে হবে। পারিবারিক নিবিড়তা বাড়াতে হবে। ইন্টারনেটের অপব্যবহার বন্ধে বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা বাঞ্ছনীয় নয়। এর ব্যবহার অবারিত রাখতে হবে। তবে ফিল্টারিং ব্যবস্থা কাজে লাগাতে হবে। ইন্টারনেটের  অপব্যবহার রোধে স্বল্পনিয়ন্ত্রণ সফলতা দেবে। সামাজিক মিডিয়ার উৎপাত রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাইবার অপরাধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো আরও আধুনিক করতে হবে। এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ বন্ধে আইন হচ্ছে। তবে এর বিচারের জন্য পর্যাপ্ত আদালত নেই। এর সংখ্যা বাড়াতে হবে। যৌন নির্যাতিতদের জেরা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার তুলে ধরতে হবে। শিশুর স্বাভাবিক ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বর্তমানে মাদকাসক্তির মতো ইন্টারনেট আসক্তিও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের সঠিকভাবে শিক্ষিত না করেই তাদের হাতে ইন্টারনেট তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো এত সহজলভ্য যে, তারা সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছে। বিষয়টিকে সার্বিকভাবে দেখতে হবে। বাবা-মার ভূমিকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম কোন দিকে যাচ্ছে, কেন পর্নো ব্যবসায়ীদের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারছে না, কেন নির্যাতিতদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে এর অপব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। বরং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সন্তানদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। তার বিপথগামী হওয়ার কারণ অভিভাবকদের কাছ থেকে সময় না পাওয়া, অভিভাবকদের সঙ্গে বন্ধুত্বমূলক ও সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক না থাকা। সেই সময় দিতে হবে, সেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অনলাইনে শিশুদের বিচরণের মতো ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক কনটেন্টের অভাব রয়েছে। তাই শিশুরা অন্যদিকে ঝুঁকছে। এ ধরনের কনটেন্ট নির্মাণ করতে হবে। আইনগতভাবে কিংবা প্রযুক্তিগতভাবে ইন্টারনেটের অপব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ, কোনো সাইট বন্ধ করলেও তা বিকল্প উপায়ে ব্যবহার করা যায়। তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যারা প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তাদের বিজ্ঞাপনের একটা অংশ ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কিত হতে হবে। সর্বোপরি সাইবার অপরাধ রোধে আšতর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। ইন্টারনেট সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। পর্নো সাইটগুলোর ব্রাউজের তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। শিশুদের সচেতন করতে হবে, যাতে তারা অনলাইনে সহজে নিজের পরিচয় ও তথ্য কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে না দেয়। শিশু পর্নোগ্রাফি বন্ধ করতে আরও কঠোর আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। বিটিআরসির মাধ্যমে ইন্টারনেটে পর্নোর ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।অনেক সময় সাইবার অপরাধগুলোর পক্ষে আদালতে উপযুক্ত প্রমাণ হাজির করা সম্ভব হয় না। এ জন্য একটি কাঠামো প্রয়োজন, যাতে ইন্টারনেটে হয়রানির শিকার শিশু-কিশোররা সহজে তথ্য বা অভিযোগ জানাতে পারে। এ বিষয়ে অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুর সবুর বিশ্বাসের বলেন, “প্রতিদিন ইন্টারনেটের মাধ্যমেই বিকৃত যৌন নির্যাতন এবং যৌন বাসনার শিকার হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অগনিত শৈশব। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা বুঝে উঠতে পারছেনা, বলে উঠতে পারছে না তাদের সেইসব অমানবিক নির্যাতনের কথা। তাই শিশুদের প্রতি বিকৃত যৌন আসক্তি মানুষগুলো থেকে যাচ্ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। এজন্য আগাম সর্তক হতে হবে পরিবার এবং স্কুলগুলোকে। এধরণের ঘটনাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা দরকার। সরকারকে নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহারবিধি পাঠ্যপু¯তকে সংযুক্ত করতে হবে এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। এভাবেই আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে শিশুর নিরাপদ শৈশব।” আমাদের দেশে ইন্টারনেট সেবাকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করার জন্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, হতে হবে সচেতন। তাহলেই আমরা আমাদের শিশুর সুরক্ষিত ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারবো। আসুন সকলে মিলে আমরা ইন্টারনেটের অপব্যবহাররোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম, নিজস্ব প্রতিনিধি, এটিএন বাংলা ও দৈনিক সমকাল, সাতক্ষীরা