আওয়ামী লীগে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজের স্থান নেই: সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের


প্রকাশিত : December 13, 2017 ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগে কোন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির স্থান হবে না। নেতাকর্মীদের সংশোধন হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, দল ক্ষমতায় যখন ক্ষমতায় থাকবে না তখন ৫ হাজার পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়েও তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে না।
ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক প্রতিনিধি সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় একথা বলেন। এসময় তিনি আওয়ামী লীগের নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে। কোন অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটেই নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিলবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট দেখিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ মুনসুর আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি সভায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হলো আওয়ামী লীগ নেতারা তখন কোথায় ছিলেন। তাদেরকে জনগণের কাছে যাওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, দলের নিবেদিত প্রয়াত নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধা করুন এবং শারিরীকভাবে অসুস্থ নেতাকর্মীদের সহায়তায় এগিয়ে আসুন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহানুভূতি জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার শোকার্ত মা খালেদা জিয়া তাকে সেই সুযোগ দেননি। এভাবেই খালেদা জিয়া সংলাপের পথ রুদ্ধ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে সংলাপ হলে এখনও সেই সুযোগ থাকতে পারতো। তিনি আরও বলেন, বিএনপি বিভিন্ন দেশে ৫০০ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের সাথে জড়িত বলে খোদ আমেরিকা জানিয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশে এই টাকা পাচার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা দৃশ্যমান পদ্মা সেতুকে তুলে ধরতে পারবো। কিন্তু বিএনপি কি তুলতে পারবে এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তাদের গায়ে রয়েছে দুর্নীতির দুর্গন্ধ। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলামের উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাইনি’। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনারা ব্যক্তির পক্ষে নয়, আওয়ামী লীগ ও নৌকার পক্ষে প্রচার অভিযান শুরু করুন। এই প্রচারাভিযানের পর নেত্রী কাকে মনোনয়ন দেবেন সেটা তিনি বুঝে নেবেন। যিনি জনমত তৈরীতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন হবে জনমতের ভিত্তিতে। বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, মরহুম জিয়াউর রহমান মৃত্যুকালে ভাঙা স্যুটকেস ও ছেড়া গেঞ্জি রেখে গিয়েছিলেন বলে তারা প্রচার করে। প্রকৃত পক্ষে এয়ারপোর্টের মাধ্যমে ৩০০ স্যুটকেসভর্তি টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে। তিনি প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থীদের হাতে ১ জানুয়ারি বিনামূল্যে কে বই দিয়েছে, পদ্মা সেতু কে তৈরী করেছে, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৪ কোটির হাতে মোবাইল কে তুলে দিয়েছে, ৮ কোটি মানুষের কাছে ইন্টারনেট এনেছে কে। এসবের উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা। এখন মন্ত্রণালয়ের সচিব নারী, বিমানের পাইলট নারী, সেনাবাহিনীর জেনারেল নারী, ডিসি নারী, এসপি নারী। এসবই শেখ হাসিনার অবদান উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, শিশুদের সার্টিফিকেটে এখন শুধু বাবার নাম নয়, মা য়ের নামও থাকে। তিনি আরও বলেন, হাতে হাতে ফেসবুক, টুইটার, ভিডিও কনফারেন্স, ডিজিটাল পাসপোর্ট, ইউনিয়নে ডিজিটাল ল্যাব, মুক্তিযোদ্ধা বয়স্ক বিধবাদের ভাতা এবং মাতৃত্ব কালীন ছুটি এসবই শেখ হাসিনার অবদান। তিনি বলেন, অচিরেই পদ্মা সেতুর মত মেট্রো রেলও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যখন অসুস্থ তখন নেতারা চলে যান ঢাকায়। তারা মনোনয়নের জন্য ঢাকায় ঘুরঘুর করেন। এতে লাভ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মনোনয়ন পেতে হলে জনগণের কাছে যান, জনগনকে নিয়ে কাজ করুন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি মঞ্চ থেকে নেতাকর্মীদের নামিয়ে দিয়ে বলেন, যত সমস্যা এই মঞ্চে, জনগনের মধ্যে কোন সমস্যা নেই। তাদেরকে ভাল হবার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকালে আমি বহু নিরীহ নেতাকর্মীর কাছ থেকে টেলিফোন পেয়েছি। আপনারা সেসব চেহারা চেনেন। তিনি ঢাকায় যেয়ে চেহারা দেখানোর চেয়ে জনগণের কাছে যেয়ে চেহারা দেখাবার পরামর্শ দেন। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, অসৎ নেতৃত্ব দিয়ে দল চলবে না। এসব অসৎ নেতৃত্ব দলের শত্রু মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা ঘরে থাকলে বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হবে না। তিনি সৎ নেতৃত্ব দিয়ে সংগঠনের কাজ চালাবার আহবান জানান। নির্বাচনে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে তাদের পক্ষেই কাজ করতে হবে এমন পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে অনেক আগাছা পরগাছা রয়েছে। দলে এইসব আগাছা পরগাছার দরকার নেই। তিনি বলেন, দল ভারী ও পকেট ভারী করার জন্য অসাধু নেতাকর্মীকে দলে টানবেন না। তোরণ, গেট, ব্যানার, বিলবোর্ডে নাম ও ছবি ঝুলিয়ে এমনকি ৫ হাজার মোটরসাইকেল নিয়ে মিছিল করেও মনোনয়ন পাওয়া যাবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কাগজে লেখা নাম মুছে যাবে, পাথরে লেখা নাম মুখে যাবে, হৃদয়ে লেখা নাম রয়ে যাবে’। তিনি জনগণের হৃদয় জয় করার আহবান জানান।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের পুরনো ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তারা দেশকে ভালবেসেছেন। তাই মৃত্যুকে তারা আলিঙ্গন করেছেন। পূর্বপুরুষদের এই সমস্ত বীরত্ব ও ত্যাগের প্রতি গভীর সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একইভাবে আত্মহূতি দিয়েছেন। তিনি মৃত নেতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার আহবান জানান। সুসময়ে খবর নেন, অসময়ে খবর নেন না এমন মানসিকতা ত্যাগ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, নিজ স্বার্থরক্ষার রাজনীতি শেখ হাসিনা করেন না, আওয়ামী লীগও সে রাজনীতি করে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, অস্বচ্ছল নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখুন এবং তাদের বাড়িঘরে যেয়ে সাহায্য করুন। তিনি বলেন, যেসব নেতাকর্মী এখনও অসুস্থ তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রস্তুত রয়েছে। সুন্দরবন পাদদেশের এই জেলা সাতক্ষীরা গণতান্ত্রিক চর্চায় ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনেক অগ্রসর এমন মন্তব্য করে তিনি প্রয়াত নেতা সৈয়দ কামাল বখত সাকি, মমতাজ আহমেদ, এড. এএফএম এন্তাজ আলী, স. ম আলাউদ্দিন, আবু নাসিম ময়না প্রমুখ প্রয়াত নেতাকর্মীর নাম উচ্চারণ করে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি আত্মদানকারী নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে প্রাচীনকালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ও সন্ন্যাস বিদ্রোহ সহ নানা ইতিহাস তুলে ধরেন।
প্রতিনিধি সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক, সংসদ সদস্য মীর মোশতাক আহমেদ রবি, সংসদ সদস্য জগলুল হায়দর, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য এসএম কামাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আবু আহমেদ প্রমুখ।
সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ. ফ. ম রুহুল হক এমপি বলেন, আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে হলে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আবারো রক্তাক্ত হবে বাংলাদেশ। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে আবারো পিতৃ হারা হতে হবে, আবরো সন্তান হারা হতে হবে আমাদের। দুর্নীতি আর লুটপাটের বাংলাদেশ বানাবে তারা। তাই দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও শান্তির জন্য আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ বলেন, জেলার আশাশুনি সড়ক, ঘোলা সড়ক, ঝাউডাঙ্গা সড়কসহ বিভিন্ন সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। এসব সড়কের সংস্কারে ইতোমধ্যে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আগামী নির্বাচনের আগে জেলার প্রত্যেকটি সড়ক সংস্কার হবে বলে জানান তিনি। শুধু তাই নয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলার বেড়িবাধ সংস্কারের কথাও বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি বলেন, জঙ্গি এলাকাকে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যারা শান্তি স্থাপন করেছে তাদের সেই রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। আগামী নির্বাচনে দেশ ও জাতির বৃহত্তর উন্নয়নের স্বার্থে সকল দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দার বলেন, যারা ২০১৩ সালে সাতক্ষীরাসহ সারা দেশকে রক্তাক্ত করেছিল সেই আগুণ সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করে আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয়কে নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন, অগ্রগতি ও গণতন্ত্র রক্ষায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামীর এক সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বেকারমুক্ত, জঙ্গিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত শান্তির বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনা মনোনীত নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করতে হবে। এজন্য দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। অসহায় নির্যাতীত মানুষের পাশে থাকতে হবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা কর্মীকে খোজ খবর নিতে হবে। যে সমস্ত মানুষ বিএনপি-জামায়াতের হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অসচ্ছল নেতাকর্মীদের পাশে থেকে শক্তি ও সাহস যোগাতে হবে। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।