অগ্নিদগ্ধ ১২ ছাত্রলীগকর্মী: দুর্ঘটনা নাকি হামলা


প্রকাশিত : জানুয়ারি ৭, ২০১৮ ||

 

 

অগ্নিদগ্ধ হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের উত্তরা পশ্চিম থানা ইউনিটের কয়েকজন কর্মী (ছবি: সংগৃহীত)
ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় যোগ দিতে এসে বাসের ভেতর আগুনে পুড়ে আহত হয়েছেন সংগঠনটির ১২ জন কর্মী। কারও দাবি, আগুন লেগেছে বাসের ভেতরে থাকা গ্যাস বেলুন থেকে। আবার কেউ দাবি করছেন, ওইসব বেলুনে গ্যাস ছিল না। বেশিরভাগের অভিযোগ, বিরোধী পক্ষ বোমা জাতীয় বা দাহ্য কিছু ছুড়ে মারার কারণে আগুন ধরেছে বাসে।

অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে চার জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। তারা হলেন— জুয়েল (১৮), কামরুজ্জামান (১৫), সাব্বির (১৫) ও মধু (১৭)। এছাড়া বাকি ৮ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন। তারা হলেন— রিফাত (১৬), রানা (১৩), রওশন (১৮), মেহেদী হাসান (২১), সৌরভ (১৮), কাব্য (২১), আকাশ (১৮) ও সাম্য (১৮)। তারা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের উত্তরা পশ্চিম থানা ইউনিটের কর্মী।

আগুনে দগ্ধরা জানান, তারা রাইদা পরিবহনের দুটি বাসে চড়ে উত্তরা ১১ নম্বর থেকে রওনা দিয়েছিলেন। তাদের গন্তব্য ছিল শাহবাগ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে আসার পর তারা স্লোগান ধরেন। শনিবার (৬ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফার্মগেট আল-রাজী হাসপাতালের একটু আগে ফুট ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় পেছনে থাকা বাসের ভেতর মাঝারি একটি শব্দ হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাসের ভেতরে আগুন ধরে যায়। এ সময় আগুনে পুড়ে আহত হন ১২ জন কর্মী।

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বাসের ভেতর বেশকিছু গ্যাস বেলুন ছিল। বাসে কেউ সিগারেট ধরানোর কারণে আগুনের ঘটনা হয়ে থাকতে পারে। তবে অন্য কোনও কারণেও আগুন লাগতে পারে। পুরো বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমরা খতিয়ে দেখছি।’

 

এদিকে অগ্নিদগ্ধদের ভাষ্য, ‘আমরা তখন সবাই স্লোগান দিচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি শব্দ হয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের গায়ে আগুন লেগে যায়। সবাই দ্রুত নেমে আসি। ততক্ষণে অনেকের গায়ে আগুন ধরে গিয়েছিল।’

কী কারণে বাসের ভেতর আগুন লেগেছিল, এমন প্রশ্নে আগুনে শরীরের চার শতাংশ দগ্ধ সৌরভ মৌমিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ছিলাম বাসের সামনের দিকে। একটা শব্দ হওয়ার সঙ্গে মুহূর্তেই আগুন লেগে যায়। বেলুন থেকে আগুন লাগার আশঙ্কা কম। কারণ এগুলো গ্যাস বেলুন ছিল না। হাতে পাম্পার দিয়ে ফুলানো বেলুন। বাইরে থেকে কেউ হয়তো কিছু ছুড়ে মেরেছে। এ কারণে আগুন ধরেছে।’

একই কথা বললেন শরীরের ৪ শতাংশ দগ্ধ হওয়া মেহেদী হাসান। তার ভাষ্য, ‘আমাদের সঙ্গে ১৫-১৬টি বেলুন ছিল। কিন্তু সেগুলো গ্যাস বেলুন নয়। মনে হচ্ছে বাইরে থেকে বাসের ভেতর কিছু ছুড়ে মারা হয়েছিল।’

তবে কাউকে ওই বাস লক্ষ্য করে কিছু ছুড়ে মারতে দেখেননি বলেও জানান মেহেদী। তার বক্তব্য, ‘আমি কাউকে দেখিনি। তবে এমন কিছু হতে পারে। বিরোধী পক্ষ এই হামলা চালাতে পারে। তারা হয়তো কিছু ছুড়ে পাশের গলি দিয়ে পালিয়ে গেছে। তবে আমরা বাস থেকে নেমে এমন কাউকে পাইনি।’

এ ঘটনায় ছাত্রলীগ বিরোধীদের হাত রয়েছে বলে মনে করেন উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি জাফরুল হাসান রনি। হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ কর্মীদের দেখতে এসে বাংলা ট্রিবিউনকে এ কথা বলেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘আমি একসঙ্গে আসা দুটি বাসের প্রথমটিতে ছিলাম। আগুন ধরার পর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। তখন আমাদের বাস থামিয়ে দেখি বেশ কয়েকজনের গায়ে আগুন লেগেছে। আমরা জানতে পেরেছি, ভেতর থেকে আগুন লাগেনি। কোনও দাহ্য পদার্থ বাইরে থেকে বিরোধীরা ছুড়ে মেরেছে। এ কারণেই আগুনে পুড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আমরা এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাই।’

বাইরে থেকে বাসের ভেতর কোনও ধরনের দাহ্য পদার্থ ছোড়া হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার রাসেল শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন ধরার খবরে একটি ইউনিট পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা পৌঁছার আগেই উপস্থিত লোকজন আগুন নিভিয়ে ফেলে। কী কারণে আগুন লেগেছিল তা ঠিক স্পষ্ট নয়। আমরা বাসের ভেতর কোনও দাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব পাইনি।’

এদিকে বার্ন ইউনিটে রোগীদের তত্ত্বাবধানে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহানা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অগ্নিদগ্ধরা একেক সময় একেক কথা বলছে। কিভাবে আগুন লেগেছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।’

অগ্নিদগ্ধদের শরীরে বার্নের পরিমাণ খুব বেশি বা মারাত্বক নয় বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি জানান, তাদের বার্নের পরিমাণ ৩ থেকে ৬ শতাংশ। কয়েকজন চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছে। বাকিরা চিকিৎসাধীন আছেন।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি ছাত্রলীগ কর্মীদের চিকিৎসার খোঁজ নিতে শনিবার সন্ধ্যায় ঢামেকে যান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।