বসিরের বাঁশের বাশির ভূবণ মোহিনী সুরে মাতোয়ারা সবাই


প্রকাশিত : জানুয়ারি ৮, ২০১৮ ||

আসাদুজ্জামান সরদার: ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।….. আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহু….শেষ করা তো যায়না গেয়ে তোমার গুনগান… তুমি কাদের গফফার, তুমি জলিল জব্বার অনন্ত অসীম তুমি রহিম রহমান।…….কখনও আবার আমার সোনার ময়না পাখি, কোন দেশেতে গেলা উইড়া রে, দিয়া মোরে ফাঁকি রে, আমার সোনার ময়না পাখি।…আমি হয়ে গেছি তারা। এই জীবন ছিল নদীর মত গতিহারা… এই জীবন ছিল নদীর মত গতিহারা দিশাহারা ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে…..এসব জনপ্রিয় গানগুলো বাঁশের বাশির মোহিনী সুর আর হাতের আঙ্গুলের জাদুতে সুরের মোহনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন রাস্তার মানুষগুলোকে। কেউ খুশি হয়ে তার হাতে দিচ্ছেন ১০টাকা ২০ টাকার নোট। সবমিলিয়ে দিন শেষে তার অর্জন হয় ৪শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত।
এভাবেই দিনকাটে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী কুশখালী গ্রামের আফসার গাজীর ছেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি বসির আহমেদের (৩৩)। বসিরের উপর নির্বাহ হয় তার পরিবারের ছয় সদস্যের। শহর শহরতলী ছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামের জনবহুল হাটবাজার এলাকায় তার পরিচিত আর সুনাম মুখে মুখে।
জন্মান্ধ হয়েও প্রতিবন্ধিকতার কাছে হার মানলেও থেকে থাকেনি তার জীবন সংগ্রাম। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাব, ভাই নিয়ে তার পরিবার। তার পরিবারের কাছে সে একমাত্র সহায় সম্বল।
বসির আহম্মেদের সঙ্গে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে একান্ত আলাপ চারিতায় জানালেন তার না বলা অনেক কথা, জন্ম অন্ধ হয়ে জন্ম গ্রহণ করলেও তার কোন কষ্ঠ নেই। কারো কাছে হাত পাতা লাগে না তার বাঁশি বাজিয়ে টাকা উপার্জন করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন বিধাতার দান আর নিজের অকৃত্রিম চেষ্টায় বাঁশের বাশি তার আয়ত্বে এসেছে। বাঁশের বাশি এখন তার বশ মেনেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঁশের বাশি সঙ্গে থাকলে অভাব কোনদিন তাকে ছুঁতে পারবে না।
বসির আহম্মেদ আরো বলেন, তিনি ভিক্ষাবৃত্তি করেন না। তার একটি যোগাযোগের নাম্বার রয়েছে। অনেকেই মোবাইল ফোনে তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিম্বা পুতুল নাচে, আবার যাত্রাপালা কিম্বা কীর্তণগানের অনুষ্ঠানে তাকে আহবান জানায়। যাতায়াত খরচ ছাড়া একদিনের জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিলেই তিনি খুশি। সেখানে দর্শকরাও তাকে বকশিশ দেয়। সূরের মূর্ছনায় মানুষকে পাগল করে তাদের দেওয়া ভালবাসার অর্থেই তার ও পরিবারের সদস্যদের জীবন ও জীবিকা চলে। সপ্তাহে দু’দিন বাড়ীতে অবস্থান করলেও বাকি দিনগুলো খুলনা বিভাগের বিভিন্ন শহর, হাট ও বাজারে কাটে তার। এক কন্যা সন্তানের জনক তিনি। পরিবারের প্রতি রয়েছে তার আত্মার টান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধি হলেও অন্য দশজনের মত উপার্জন শেষে ঠিকই তার কুটিরে ফিরে যান। কে জানতো জন্মান্ধ হয়েও এভাবেই বাঁশির সুরে মানুষের সুখে দু:খের সাথী হয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করবেন বসির আহমেদ।