কৃষকনেতা শুকুর আলী’র তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে কুয়াদা বাজারে স্মরণসভা


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ ||

আগামী ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৮ রবিবার জেলা কোষাধ্যক্ষ শুকুর আলী’র তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে সকাল ১০টায় প্রয়াতে সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পন ও বিকাল ৩টায় কুয়াদা বাজারে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত কর্মসূচি সফল করার জন্য সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মিদের স্মরণসভায় যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

উল্লেখ্য, কৃষকনেতা শুকুর আলী গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বৃহস্পতিবার ভোর রাত আনুমানিক ৪ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ফুসফুসে ক্যান্সার, ডায়বেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ভূগছিলেন। কৃষকনেতা শুকুর আলী ১৯৫২ সালের ১০ এপ্রিল যশোর সদর থানার সিরাজ সিংহ গ্রামে এক নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৃত ছবেদ আলী বিশ্বাস ও মাতা মৃতা শহর বানু। তিনি ১৯৭২ সালে কুয়াদা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। মূলত কৃষি কাজের মাধ্যমে তিনি সংসার পরিচালনা করতেন। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়েসহ আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক সহযোগিসহ অসংখ্য শুনাগ্রাহি রেখে গেছেন।

কৃষকনেতা শুকুর আলী ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিব পরিবারকে স্বপরিবারে হত্যা করে মার্কিনের দালাল প্রথমে খন্দকার মোস্তাক এবং পরে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বৈরাচারী সরকার আমলে বিশ্বাসঘাতক মশিউর রহমান চক্রের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে রা করা এবং ১৯৭০ সালে স্থগিত হয়ে যাওয়া পূর্ব-পাকিস্তান কৃষক সমিতি পুনরাবির্ভাব হিসেবে কৃষক সংগ্রাম সমিতি গঠনে জনাব মাহমুদুল হক মনি পীরের সাথে উদ্যোগী-অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৯ সালে ১৭ই ডিসেম্বর কৃষকনেতা মাহমুদুল হক মনি পীরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১৯৮০ সালের ২৪ ও ২৫ জানুয়ারী কৃষক সংগ্রাম সমিতির কালীগঞ্জ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত থেকে ভূমিকা রেখেছেন। এ সময়ে সংশোধনবাদী তিন বিশ্ব তত্ত্বের প্রভাবে নুরুল হুদা কাদের বক্স-বিমল বিশ্বাস গং এদেশের প্রগতিশীল বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তিকে স্বমূলে উৎপাটিত করার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত তিন বিশ্ব তত্ত্বের পাবলম্বন করলে এর বিরুদ্ধে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি ও ধারাকে রা এবং অগ্রসর করার সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে শুকুর আলী কৃষক সংগ্রাম সমিতিকে এগিয়ে নিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন। এ প্রেক্ষিতে ১৯৮১ সালে ৪ঠা এপ্রিল যশোরের রাজঘাটে শ্রমিক অঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণীর অভূতপূর্ব সহযোগিতায় কৃষক সংগ্রাম সমিতির ২য় সম্মেলনে সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকে ব্যর্থ করে অগ্রসর হওয়ার জন্য নিষ্ঠার সাথে তৎপরতা চালান। এরপর ১৯৮৪ সালে বগুড়াতে, ১৯৮৭ সালে ঝিনাইদাহে, ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায়, ১৯৯১ সালের ঢাকাতে যথাক্রমে অনুষ্ঠিত ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম, ৯ম, ১০ম সম্মেলন সমূহে তিনি উপস্থিত থাকেন।

এ সময়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মরণফাঁদ ওয়াপদা বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ১৯৮৮’র ডহুরীর কৃষক অভ্যূত্থান, সুফলাকাটি খাল খনন, বিল খুকশী, ১৯৯৭ সালে বিল আগরহাটি-ভায়নার আন্দোলন, ১৯৯৯-২০০০ সালের ভৈরব নদের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের আন্দোলন, বিল হরিনার জলাবদ্ধতা নিরসনের আন্দোলন, আলমসাধু-নছিন-করিমন চালক শ্রমিক ঐক্য সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ২০১২ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও ও পরবর্তিতে আলমসাধু, নছিমন, করিমন শ্রমিক সংঘ গঠন, বিল কপালিয়ার অপরিকল্পিত টিআরএম প্রকল্প বাতিল করে সকল বিলের সাথে নদীর সংযোগ ঘটানো ও নদীসমূহকে অবাধ প্রবাহমান করার দাবিতে আন্দোলন ইত্যাদি কৃষক আন্দোলনসহ সর্বাত্মক কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা নেন। কৃষক আন্দোলনের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন অগ্রসর করার ক্ষেত্রে তাঁর থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্বৈরাচার বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন অগ্রসর করার ক্ষেত্রে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্রদের সমন্বিত প্রচেষ্টাকে মূর্ত সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৮৮ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলায় তিনি অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৯০-৯১ এর বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে যে প্রতিবিপ্লবী ঝড় সৃষ্টি করা হয়। সে সময়ে কৃষক সংগ্রাম সমিতির সভাপতি মোহাম্মাদ লোকমান কৃষক আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য স্ট্যালিনের বিরোধীতার নামে বস্তা পচা ট্রটস্কিবাদী বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে সামিল হন সাধারণ সম্পাদক জনাব মোছাব্বর আলী। লোকমান-মোছাব্বরের এই অপতৎপরতাকে ব্যর্থ করে কৃষক সংগ্রাম সমিতির অগ্রযাত্রায় কেন্দ্রীয় কমিটির ধারায় যশোর জেলা কমিটির নেতৃত্বে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি আমৃত্যু কৃষক সংগঠন ও আন্দোলনে নিয়োজিত থাকেন। কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালনের সময়ে কৃষকের জাতীয় ইস্যু এবং বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ইস্যু সমন্বিত করে সর্বাতœক কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা কার্যকরী করার ক্ষেত্রে কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতৃত্বে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রাজপথ-রেলপথ অবরোধের কর্মসূচী এবং শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি কুয়াদা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসহ এলাকার সামাজিক কাজে সব সময় অগ্রভাগে থাকতেন।

কৃষকনেতা শুকুর আলী যৌবনে যখন থেকে উপলব্ধি করেছিলেন যে জনগণের মুক্তির জন্য সমাজ বদলানো দরকার তখন থেকে সারা জীবন তিনি সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে অবিচল থেকে ধারাবাহিক দৃঢ় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী জনতার দাবী ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিচল থেকে প্রত্য ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক জীবনে সুবিধাবাদ ও আপোষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবেলা করার বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। শ্রমিক-কৃষক মেহনতী জনতার দরদি বন্ধু এবং কৃষক-জনতার এই আপোষহীন নেতা আমৃত্যু ভাববাদের বিরুদ্ধে বস্তুবাদী মতাদর্শকে আঁকড়ে ধরে নিজ জীবনসহ সামগ্রিকভাবে তা প্রতিষ্ঠায় অবিচল ছিলেন।