সুন্দরবন দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত করা হোক


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান
সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য। বাংলাদেশ সহ ভারতের প্রকৃতির স্বর্গ জীব বৈচিত্রে ভরপুর বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এই সুন্দরবন। সুন্দরবন বাংলার গর্ব, বিশ্বের গৌরব। জগৎসেরা ও জীব বৈচিত্রের আধার এই বন বাঙালী জাতির গর্ব। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই সুন্দরবন। জাতিসংঘের ইউনেস্কো কমিশন ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে ৭৯৮ তম বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা হিসাবে ঘোষনা করে। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতির পর থেকে এই সুন্দরবন নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী সহ বিশ্ববাসীর আগ্রহের শেষ নেই। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রাকৃতিক বন সুন্দরবন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০ হাজার ২ শত ৮০ বর্গ কিঃ মিঃ। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৬ হাজার ১৮ বর্গ কিঃ মিঃ। এ বনের প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী সহ রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতি গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতি শৈবল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড। সুন্দরবনে আছে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, বানর, শুকর, গুইসাপ সহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রানী, ৩ শত’র বেশী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং জালের মত বিছানো প্রায় ৪৫০টি ছোট-বড় নদী। কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন সহ ২৯১ প্রজাতির মাছ। সুন্দবন শুধু পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, বিশ্বে সুন্দরবনের মতো এত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আর কোন বনে নেই। এই জন্যই সুন্দরবনকে জীববৈচিত্র্যের জীবন্ত পাঠশালা বলা হয়। প্রানী ও বৃক্ষের বৈচিত্রের সমাহার এই বন বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ব ও প্রতœতাত্বিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বিশ্বে বিরল প্রজাতির বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই সুন্দরবনে। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ জুড়ে থাকা এ বনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূল্যবান প্রানীজ, জলজ ও বনজ সম্পদ মিলে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের আঁধার। এই সুন্দরবন শুধু জীব বৈচিত্রের উৎস নয়, একই সাথে বন সংলগ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকার উৎস হিসাবে অবদান রাখছে। কাঠ, মধু, মৎস, অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরনের মাধ্যমে ৫-৬ লাখ মানুষ প্রায় সারা বছর জীবিকার জন্য সরাসরি সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল।
১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস। সুন্দরবন মায়ের মতন। বিশ্ব ভালবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন। এই প্রতিপাদ্যের মধ্যে দিয়ে খুলনা ও সুন্দরবন সংলগ্ন জেলার উপজেলাগুলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারী আঞ্চলিক ভাবে সুন্দরবন দিবস পালিত হচ্ছে। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারী সুন্দরবন সংলগ্ন জেলা ও উপজেলাগুলোতে সুন্দরবন দিবস পালন করা হয়। সুন্দরবন সুরক্ষায় ২০০১ সালে সুন্দরবন একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সংগঠনটির কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে। এরপর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও যশোর সহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ঢাকাতে নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে সুন্দরবন বনবিভাগ, সুন্দরবন একাডেমীসহ বিভিন্ন সংগঠন সুন্দরবন দিবসটি পালন করছে।
উপকুল আঞ্চলে মানুষের জীবন প্রবাহের সাথে সুন্দরবন আবর্তিত। আবহমান কাল সুন্দরবনের সাথে মানুষের নিবীড় ঘনিষ্ঠতা। এই অর্থে সুন্দরবনের ভাল-মন্দ এ অঞ্চলের মানুষকে নাড়া দেয়। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন, ঝূর্ণিঘড়, জলচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপথকে আগলে রেখেছে ও রক্ষা করছে প্রাকৃতিক ভারসম্য। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৮ সালের ২৫ মে আইলা সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবন মায়ের মত উপকুলবাসীকে আগলে রেখেছে। এ কথা সত্য যে, সুন্দরবন যদি না থাকতো তাহলে সিডরের প্রচন্ডতায় উপকূলীয় অঞ্চল প্রাণহীন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হতো। সুন্দরবন এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সুন্দরবন দিবসে আলোচনায় অতিথিবৃন্দ, বিশেজ্ঞরা ও সুন্দরবনপ্রেমীদের জোরালো দাবি রাষ্ট্রীয়ভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হোক। এ কোন আবেগ নয়, বাস্তবতায় অত্যন্ত যৌক্তিক। এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষনে বন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে। পর্যটকদের সুন্দবন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ও সুন্দরবন ভ্রমণে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে খুলনায় ২০০১ সালে খুলনায় তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র খোলা হয়। তাই এই বনের জীববৈচিত্রকে সংরক্ষনের জন্য এখনই প্রয়োজন সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। তাহলে প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারনায় মুখরিত হবে সুন্দরবন। বিকশিত হবে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন শিল্প। ফলে একদিকে যেমন সুন্দরবন বিশ্বসেরা সম্পদ হিসাবে পরিচিতি হবে, তেমনি এ বনের সুরক্ষার কাজ হবে শক্তিশালী। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমন বাড়বে ও দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। উপকূলের অবহেলিত জনপদে প্রাণচাঞ্চল্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারিভাবে সুন্দরবন দিবস পালিত হলে সুন্দরবনের গুরুত্ব আরো বাড়বে। আর সেই সাথে সুন্দরবন সু-রক্ষায় সকলে সচেতন হবে। লেখক: সাংবাদিক