একুশের উত্তাপ পাকিস্তানেও


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮ ||

যে রাষ্ট্র একদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অধিকারকে রক্তাক্ত করেছিল, সেই পাকিস্তানেও লেগেছে একুশের উত্তাপ। বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবসকে বিশ্বের আর সব দেশের মতো করেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে তারাও। সেখানেও আওয়াজ উঠেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সব মানুষের মাতৃভাষাকে সুরক্ষিত করার। পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর থেকে জানা গেছে, শিশুর বিকাশে মাতৃভাষার গুরুত্বের কথা এদিন সামনে এসেছে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা প্রসারের আন্দোলনে রূপান্তরের তাগিদ বোধ করছেন তারা।

স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আজকের বাংলাদেশের মানুষ প্রথম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল ভাষার প্রশ্নে। ‘বাংলা’কে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। ইতিহাসের এই অনন্য নজির ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। ওই বছরের নভেম্বরে ইউনেস্কোর সাধারণ সভায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রতিবছর ভাষাবিদ্যা, ভাষার বহুত্ব এবং সাংস্কৃতিক বহুমুখিতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করা হচ্ছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনকে সামনে রেখে আগের দিন মঙ্গলবার পাকিস্তানের আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি)-এর কেন্দ্রীয় মহাসচিব মিঞা ইফতিখার হুসেইন একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘একটি জাতির উন্নয়নে মাতৃভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাচীন ও আধুনিক ধারার শিক্ষা গবেষক, দার্শনিক এবং বুদ্ধিজীবীরা এ ব্যাপারে একমত শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ একে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নের গোপন রহস্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি দিবসটিকে মাতৃভাষা প্রসারের মুভমেন্টে পরিণত করার তাগিদ দেন ইফতিখার। প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত করার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। পাশাপাশি মাতৃভাষা দিবসকে কেবল দিবসেই সীমাবদ্ধ না রেখে একে দেশজুড়ে মাতৃভাষা নিয়ে সচেতনতার আন্দোলনে রূপান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন মিঞা ইফতিখার।

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহবাজ শরিফ বলেছেন, মাতৃভাষার সুরক্ষার প্রশ্নটি সমষ্টিগত সামাজিক দায়িত্ব। তার মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া হলে শিশুদের মেধার বিকাশে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। শাহবাজ বলেন, ‘এ আধুনিক যুগে মাতৃভাষার গুরুত্বকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভাষা কেবল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ আর যোগাযোগের উপকরণ নয়। ভাষার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতিকেও চিহ্নিত করা যায়। কারণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচিতির চিহ্ন হিসেবে মাতৃভাষাকে শনাক্ত করা হয়ে থাকে।‘

সোমবার পাঞ্জাবে ‘কারওয়ান ই উর্দু’ নামে একটি মিছিল হয়েছে তেহরিক ই উর্দু’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে। মিছিল থেকে উর্দুকে সরকারি ভাষা করার দাবি জানানো হয়। মসজিদ সুহুদা থেকে পাঞ্জাব গণপরিষদে যাত্রা করে মিছিলটি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
মিছিল শেষের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তেহরিক ই উর্দুর প্রেসিডেন্ট আজিজ জাফর আজাদ অবিলম্বে উর্দুকে সেখানকার সরকারি ভাষা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘প্রাদেশিক ও ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে আমি দাবি জানাচ্ছি, পাকিস্তানের সংবিধান ও আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উর্দুকে সরকারি ভাষা করতে হবে।‘ উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উর্দুকে সরকারি ভাষা করার জন্য ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারকে আদেশ দেওয়া হয়। আইনজীবী কোকাব ইকবালের দায়ের করা পিটিশনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট এ রায় দেয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কমস্যাটস ইউনিভার্সিটি, গভর্নমেন্ট পোস্টগ্রাজুয়েট কলেজ, পাঞ্জাব লোক সুজাগ, আওয়াজ সোসাইিট, আর্ট কাউন্সিল এবং সাহিওয়াল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে চলছে একুশের সাত দিনের আয়োজন। সেখানেও মাতৃভাষার সুরক্ষার প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবের স্বল্পদৈর্ঘ কাহিনি লেখক মাকসুদ সাকিব বলেন: ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা অর্থনীতি এবং জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিপীড়নের প্রকৃতি বুঝতে পারব না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা পাঞ্জাবি ভাষাকে মাতৃভাষা করার প্রশ্ন ও দাবিটি বুঝতে পারব না।’ বালদিয়া হলে আয়োজিত ‘মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ‘পাঞ্জাবের মানুষের নিজের ভাষায় কথা বলা এবং তা ধারণ করা উচিত। কারণ, এর আদি ভিত্তি রয়েছে।’ মাকসুদ সাকিব আক্ষেপ করে বলেন, পাকিস্তানের সংবিধানে আঞ্চলিক ভাষাকে জনপ্রিয়তা ও অগ্রগতি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ অধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০৭ সালের ১৬ মে তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এ/আরইএস/৬১/২৬৬ নম্বর নথি অনুসারে, সকল সদস্য দেশের উদ্দেশে, ‘বিশ্বের সকল ভাষার সংরক্ষণ এবং সুরক্ষার বিষয়টি’ প্রচার করতে বলা হয়। একই নথিতে ভাষাসমূহের মধ্যে বহুভাষা এবং বহু সংস্কৃতির মধ্যে বহুমুখিতার ঐক্যবদ্ধতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৮ সালকে ‘ভাষাসমূহের আন্তর্জাতিক বছর’ বলে ঘোষণা করা হয়।