আজ সেই ভয়াল ২৮ ফেব্রুয়ারি


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৮ ||

 

মনিরুল ইসলাম মনি: জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই দিনে জামায়াত শিবিরের সহিংসতায়  আইন প্রয়োগকারি সংস্থার সদস্য ও সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ৫০ জন জখম হয়। হত্যা করা হয় সাতক্ষীরা সিটি কলেজের প্রভাষক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবিএম মামুন হোসেনকে। জেলাজুড়ে ৮০টি আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও মূল আসামীরা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পরবর্তীতে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে সড়ক পথে সাতক্ষীরাকে সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে আসামীদের গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষগণ আজো ভুলতে পারেনি সেই দিনকার স্মৃতি।

সাতক্ষীরা সদরের আওয়ামী লীগ নেতা আনারুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম জানান, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন ধার্য করার ফলে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত শিবির দেশব্যাপি হরতালের ডাক দেয়। সে অনুযায়ি ওইদিন সকাল সাড়ে আটটায় জামায়াত নেতারা সাতক্ষীরা শহরতলীর কদমতলায় হরতাল বিরোধী সশস্ত্র সমাবেশ করে। রায় যাই হোক না কেন ওই দিন বিকেল তিনটায়  কদমতলায় সকল নেতা কর্মী ও সমর্থকদের সশস্ত্র অবস্থায় জড়ো হওয়ার জন্য ঘোষণা দেন জামায়াত নেতা ফিংড়ি ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, জেলা জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারী জেনারেল আজিজুর রহমান, জামায়াতের প্রচার সম্পাদক ও দৈনিক আলোর পরশের তৎকালিন সম্পাদক আলতাফ হোসাইনসহ সদর উপজেলা জামায়তের আমীর রফিকুল ইসলাম, সদর পশ্চিম থানা আমীর মাওলানা শাহাদাৎ হোসেন, কাশেমপুর হাজামপাড়া জামে সমজিদের ইমাম মোহাম্মদ আলী ও কাশেমপুর গ্রামের মাওলানা ঈমান আলীসহ জেলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। কাছে থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন জেলা জামায়াতের আমীর যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী অধ্যক্ষ খালেক ম-ল। তারা আরো জানান, দুপুর একটা ৪০ মিনিটে দেলাওয়ার হোসাইনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে জামায়াতের ১০হাজারের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু কদমতলা তিন রাস্তা মোড়ে সমবেত হয়। মিছিল থেকে সাতক্ষীরা শহর ঘেরাও করার ডাক দেওয়া হয়।  সশস্ত্র মিছিলটি সাতক্ষীরা শহর অভিমুখে রওনা হওয়ার আগেই কতর্ব্যরত গোয়েন্দা (ডিএসবি) পুলিশের সদস্য রিয়াজউদ্দিন, সাংবাদিক আহাদ হোসেনসহ কয়েকজনকে পিটিয়ে জখম করা হয়। ভাঙচুর করা হয় কদমতলা বাজারের ২০টির বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মিছিলটি শুরু হওয়ার পর সার্কিট হাউজ মোড়ে পৌঁছানোর আগেই রাস্তার দু’ধারের কমপক্ষে ৩০টি বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়। সার্কিট হাউজ মোড়ে পুলিশ ও বিজিবি’র বাধা পেয়ে তারা সার্কিট হাউজ ভাঙচুর করার চেষ্টা করলে বিজিবি’র গুলিতে সাতজন মারা যায়। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে পাঁচজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়। সাতজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলার সকল উপজেলায় হামলা শুরু করে জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীরা। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কাশেমপুরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবিএম মামুন হোসেনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীরা। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা অ্যাড.মুস্তাফা লুৎফুল¬াহ, শ্রমিক লীগ নেতা সাইফুল করিম সাবু, সৈনিক লীগ নেতা আমজাদ হোসেন শোভনসহ কয়েকজন মামুনকে বাড়ি থেকে তুলে এনে হাসপাতালে ভর্তি করে বাঁচানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সন্ধ্যার পরপরই সাতক্ষীরা সদর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগরে ৩০টির বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান , বাড়ি, ক্লাব ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশ ও বিজিবির উপর হামলা চালানো হয়। দিনভর সহিংসতায় জেলা জুড়ে কমপক্ষে ৫০ জন জখম হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে নয়টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ১৪ হাজার জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এসব মামলার এজাহার নামীয় আসামীদের অধিকাংশ রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত শিবির জেলা জুড়ে সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এমনকি অনেক আসামীদের সঙ্গে পুলিশ, আওয়ামী ও যুবলীগের নেতা কর্মীদের সখ্যতা থাকায় তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।  ওইসব আসামীদের জামিন করাতে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা মোটা অংকের টাকা নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে প্রত্যয়ন দিয়ে সহায়তা করেছেন। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করার আগে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে অনেকেই পার পেয়ে গেছেন। কৌশলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ম্যানেজ করে কর্মী সমর্থক হয়ে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশও নিয়েছেন কয়েকজন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, ১৬টি হত্যা মামলার মধ্যে কেবলমাত্র ছাত্রলীগ নেতা মামুন হত্যা মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কালিগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম আলী হত্যা মামলাটি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ -২য় আদালতে রিভিশন শুনানী শেষে মঙ্গলবার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে শুনানী হয়েছে। তবে বিচারক এমএ জাহিদের আদেশ জানা যায়নি। অন্য ১৪টি মামলা নারাজির বেড়াজালে থেকে জজ আদালতে বা বিচারিক হাকিম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ২০০২ সালের ৩০ আগষ্ট কলারোয়ায় শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা মামলার কার্যক্রম গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সাক্ষী চলাকালিন হাইকোর্টে স্থগিত হলে সাধারণ মানুষের বিচার কোন পর্যায়ে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের পিপি এড. ওসমান গণি মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা থেকে মোবাইল ফোনে জানান, এবিএম মামুনসহ ১৬টি হত্যা মামলার সবক’টিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। সব ক’টি মামলায় জজ কোর্টে ও হাইকোর্টে আসামীদের জামিন প্রক্রিয়া অব্যহত থাকায় আজো অভিযোগ গঠণ করা সম্ভব হয়নি।