ফাগুন ও বসন্ত নিয়ে কিছু কথা


প্রকাশিত : March 2, 2018 ||

 

পঞ্চানন মল্লিক

সূর্যটা বুঝি আবার তেজ ফিরে পেল, পরিক্রমার চাবি খুলে দিল দখিনা মলয় ঝাঁপি, গানে গানে গুনগুন রবে বসন্ত এল ধরায়। শীতের জবুথবু অসাড় প্রাণে রঙ এলো, রস এলো বিধবা বৃক্ষের নিরস শাখায় নব পল্লবের জাগরণে। বাস্তুচ্যূত মেঘের ছিটেফোটা আনাগোনা শুষ্কপ্রায় নদীর বুকে কিঞ্চিত সজিবতা যোগাতে। যদিও উধাও আজ হলুদ সরষে ক্ষেত, তবু বাসন্তী রং শাড়ি পরা নববধূর চোখের কোনায় জমে থাকে হলুদ স্বপ্নের সমাবেশ। এই মহুয়ার গন্ধ ভরা দিনে বুঝি প্রিয় আসবে তার ঘুচাতে বিরহের ক্ষণ, বেদনা বিধুর। হরিতের নবীন ছোঁয়া বন-বনানী-অরন্যে। দখলকৃত কাকের বাসায় কোকিলের মৌসুম। মুখোরিত কুহুকুহু রবে। বিতানে ফুল সমাহারে অলির চঞ্চল পদচারনায় গুঞ্জরিত চারিপাশ। আম্র মঞ্জুরিতে ন্যূয়ে পড়া শাখা। অলি কুঞ্জে প্রস্ফুটিত ফুলদলে বিচিত্র রঙের ছড়াছড়ি। মুলত রঙের বৈচিত্র-ই বসন্তকে করেছে ‘ঋতু শ্রেষ্ঠ’। কমন-আন কমন নামের হরেক রকম ফুল। পলাশ, নাগেশ্বর, বেলি, ঝুনঝুনি, ভেন্না, লাল লজ্জাবতী, লঙ্কা জবা, জুঁই, জংলা বেগুন, বিলম্ব, জারুল, কামিনী, ভূঁইওকড়া, বেগুনী হুড়হুড়ে, আকন্দ, ল্যান্টনা, চুকুর, কৃষ্ণচূড়া, কনকচাঁপা, নয়নতারা, খেঁজুরের ফুল, ঘাসফুল, কুমড়ো ফুল, মোরগ ফুল, কলমি ফুল, মহুয়া ইত্যাদি ফুলের নাম বলে শেষ করা যাবেনা। বসন্তে ফুলের গহনায় সাজে বঙ্গ ললনা। জিপসি, জারবেরার তৈরি ফুলের ক্রাউন, হাতে গাঁদা ফুলের মালা, খোঁপায় গ্ল্যাডিওলাস কিম্বা চন্দ্র মল্লিকা গুঁজে বাসন্তী শাড়িতে বাহারি সাজসজ্জা। পুরুষেরা সাজে হলুদ কিম্বা বাসন্তী রং পাঞ্জাবিতে। নারীর চোখে কাজল, কপালে লাল টিপ।

বাংলাদেশে বসন্ত উৎসব উদযাপন চালু হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে। তখন বিদেশি ফুলের সমাহার হীন, যে কোন রঙিন ফুল খোঁপায় ও কানে গুঁজে, গাঁদা ফুলের মালা গলে, হলুদ, কমলা, লাল কিম্বা বাসন্তী রং শাড়ি পরে মেয়েরা এবং ফতুয়া-পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে যেতেন ছেলেরা। বসন্তকে নিজের মধ্যে ধারন করতেন সবাই। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ চারু কলার বকুল তলায় প্রতি বছর এ উৎসবের আয়োজন করে আসছেন।

ফাল্গুন-চৈত্র দুই মাস নিয়ে বসন্ত পৃথক ঋতু হলেও থেকে যায় কিছুটা শীতের আমেজতা। প্রকৃতি পার করে নাতিষীতোষ্ণ সময়। বাতাসে ফুলের গন্ধ। নাগরিক জীবনে পড়ে প্রশান্তির ছায়া। বসন্ত শুধু পাতা জাগার দিন নয়, দ্রোহ ও বিপ্লবের চেতনায়ও ভাস্মর। এই মাসেই ঘটেছিল ৫২’র মহান ভাষা আন্দোলন। সালাম, রফিক, বরকতের সোপার্জিত প্রাণে অর্জিত ভাষা; লাল পলাশ আর এক সাগর রক্ত একাকার হয়ে।

ফাল্গুন তথা বসন্তকে নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে হাজারো গান, কবিতা, কাহিনী। ‘পুরুষের বসন্ত কালে হাতে মোহন বাঁশি, নারীরও বসন্ত কালে মুখে মধুর হাসি’ এক সময়কার একটি জনপ্রিয় গান। বসন্তকে নিয়ে রবীন্দ্র নাথ লিখেছেন ‘আহা আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোঁটে, কত পাখি গায়, আহা আজি এ বসন্তে’। কবি ফররুখ আহম্মেদ লিখেছেন’ ফাল্গুনে শুরু হয় গুনগুনানী, ভোমরাটা গায় গান ঘুম ভাঙানী। এক ঝাাঁক পাখি এসে ভোর বিহানে, এক সাথে গায় গান ঐকতানে।’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত’ কবিতায় বসন্ত বন্দনা করেছেন এভাবে ‘বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে, চঞ্চল তরুণ দুরন্ত। বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর পরজ বসন্তের সুর, পান্ত-কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে রাঙা হল ধুসর দিগন্ত।কিশলয়ে-পর্ণে অশান্ত ওড়ে তা’র অঞ্চল প্রান্ত। পলাশ-কলিতে তা’র ফুল-ধনু লঘু-ভার, ফুলে ফুলে হাসি অফুরন্ত। এলোমেলো দখিনা মলয় রে প্রলাপ বকিছে বনময় রে। অকারণ মন মাঝে বিরহের বেনু বাজে। জেগে ওঠে বেদনা ঘুমন্ত।’ এমনি করে গল্প, কবিতায়, গানে ফুটে উঠেছে বাংলার বসন্তে রূপ, বৈচিত্র, মর্মবাণী। বসন্ত যুগে যুগে প্রভাব ফেলেছে বাঙালির দ্রোহে, প্রেমে, চেতনে। কখনো পুড়িয়েছে বিরহের অনলে। বসন্তে নব প্রাণে জাগে বাঙালির সত্ত্বা। বাঙালি মাত্রই তাই বসন্তের প্রারম্ভে গুনগুন ফাগুনে যেন মেতে ওঠে নতুন আমেজে। লেখক: কলামিস্ট ও গীতিকার