জাতির পিতার প্রতি কেন এই অসম্মান?


প্রকাশিত : মার্চ ১২, ২০১৮ ||

মিজানুর রহমান
আজ লেখাটা লেখার প্রয়োজন ছিল না। কারণ নির্মম সত্যটা লিখনে অনেকের ঘৃণার পাত্র হতে হয়। তবুও বিবেকের তাড়নায় এই লেখা। এই লেখাটা পড়ে হয়তো অনেকের গাত্রদাহ হবে। তবুও সত্য চিরদিন সত্যই থেকে যায়। শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম সৎ ও নিষ্ঠার সাথে দল গঠনের ফলশ্রুতিতে সফলতা পেয়েছিলেন, যে কোন সিদ্ধান্ত থেকে সরে না যাওয়ার কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এই যৌথ পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। বাংলার ভাগ্য নিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। তাই ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি প্রিয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠন করে একটি জাতিকে স্বাধীনভাবে বাঁচার পথ দেখিয়েছিলেন। বাংলার মেহনতি মানুষের জন্য তার অন্তর কাঁদতো। তিনি সব সময় চিন্তা করতেন একটি শোষণমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ। বাংলার মানুষের প্রতি ছিল তার গভীর ভালবাসা ও মমত্ববোধ। সেই ভালবাসা ছিল অকৃত্রিম। তিনি দিনের পর দিন বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছুটেছেন সংগঠনের জন্য, মানুষের জন্য। তিনি যেখানে যেতেন সেখানকার নেতাদের কর্মকান্ডে আবেগাপ্লুত বক্তৃতার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে বড় করে উর্দ্ধে তুলে ধরতেন। ইউনিয়ন, থানা, জেলা আওয়ামী লীগ নেতাকে কর্মকান্ডের বিচারে যাচাই-বাছাই করে জাতীয় নেতাদের রূপান্তরিত করে তিনি বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন। তার জীবন ও মৃত্যু একই সাথে চলতো। তিনি কোনটাই পরোয়া করতেন না। কঠিন অবস্থায়ও অবিচল ছিলেন তার সিদ্ধান্তে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী আগরতলা মামলা করে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ৬৯’এর গণ আন্দোলন যখন বাংলার জনগণ তার মুক্তির দাবিতে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, তখন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ঘৃণা ভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করে ছিলেন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ নির্বাচনে বিজয়, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ আন্দোলন, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয় লাভ করার পরও যখন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছিল তখন বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন। স্বাধীন বাংলার ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পতাকা উড়ালেন। এরপর শুরু হলো আরো ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। বাংলার মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইয়াহিয়া খান গণ হত্যার নির্দেশ দিলেন সেনাবাহিনীকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক বাংলার জনগণ অস্ত্র তুলে নিলো হাতে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হলো ২ লক্ষ বোন ইজ্জত দিলো। বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। বহু ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বাংলার জনগণের আন্দোলন ও বৈদেশিক চাপের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন। বঙ্গবন্ধুকে বাঙালির পিতা উপাধি দেওয়া হলো। পাকিস্তানের কারাগারে তাকে বহু চেষ্টা করা হয়েছে হত্যার জন্য। কিন্তু তিনি একবারও ভীত হননি। তিনি বুঝতেন যে বীজ তিনি বাঙালির অন্তরে বপন করেছেন সেই বাঙালি জাতি তাকে একদিন মুক্ত করে নিয়ে যাবেই।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলার নয়নের মনি, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি নন। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ, একটি আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তার একটি মহাকাব্য। জাতি নির্মাণের কারিগর, একটি ইতিহাস, বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা; জাতির উত্থান জনগণের বন্ধু, রাষ্ট্রের পিতা, স্বাধীনতার প্রতীক, ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা। জাতির পিতা ও ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে দেশের মানুষের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের পথভ্রষ্ট বাঙালিদের হাতে স্বপরিবারে জীবন দিয়েছেন। তবুও তিনি বাঙালি জাতির পিতা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কোন দলের নন, কোন প্রতিষ্ঠানের নন, কোন ব্যক্তির একক ব্যক্তি নন। তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির পিতা। বাংলাদেশের সকল বাঙালিকে, সকল রাজনৈতিক দলকে সকল প্রতিষ্ঠানের কর্ণধরকে জাতির পিতার সম্মান অক্ষুণœ রাখতে হবে। তার যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। যে নিজেকে বাঙালি দাবি করবে তাকে তার জাতির পিতাকে মানতে হবে। কারণ তার নেতৃত্বের কারণে তার ডাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, রাজনীতি করছি, জনগণের মঙ্গল করার ব্রত নিয়ে বিভিন্ন দল গঠন করে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি।
বড় দু:খের বিষয় আমরা জাতির পিতাকে কতটুকু সম্মান দিচ্ছি? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির পিতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বিদেশের (খুব সম্ভবত স্পেনে) বিমান বন্দরে যখন নিজের পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন, তখন সেই বিমান বন্দরের কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে না চিনে বলেছিল তোমরা বাঙালির কেমন জাতি? তোমরা তোমাদের জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করেছো? তোমরা ঘৃণিত জাতি। যেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন উত্তর দিতে পারেন নি। বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় দেখি কাগজে পোস্টারে, ব্যানার, হ্যান্ডবিল এর উপরে জাতির পিতার ছবি ছোট করে দিয়ে, সাথে জননেত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি একটু বড় করে তার পার্শ্বে জয় এর ছবি দিয়ে এই বার যে ব্যক্তি পোস্টার ছাপালেন তার ছবি বিশাল করে দেওয়া হয়। ঐ পোস্টার ব্যানারগুলো বিভিন্ন দেওয়ালে, দড়িতে টাঙিয়ে জানানো হয় আমি আওয়ামী লীগ করি। জাতির পিতা কোন দলের সম্পদ নয়। পৃথিবীর কোন দেশে জাতির পিতার পাশে কোন ব্যক্তির ছবি সংযোজন করা যায় কিনা আমি জানি না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধির ছবি ছাপাতে গেলে রাষ্ট্রের অনুমতি লাগে। অন্যথায় ছাপানো যায় না।
আমাদের জাতির পিতার ছবি যত্রতত্র ছাপানো হচ্ছে। ঐ সমস্ত পোস্টারগুলো দু’এক দিনের মধ্যে প্রাকৃতিক কারণে খুলে মাটিতে পড়ে যায়। টোকাইরা খুলে নিয়ে যায়। যেগুলো নষ্ট হয় লোকে পা দিয়ে মাড়ায় অথবা ঝাড়–দার এক সাথে করে ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। হ্যান্ডবিলগুলো রাস্তায় পড়ে থাকে। জনগণ সেই ডাস্টবিনে জাতির পিতার ছবি সম্বলিত পোস্টারে প্রসাব করছে, কেউ বাড়ির নোংরা আর্বজনা দিয়ে পোস্টারগুলো ঢেকে দিচ্ছে। কেউ বা ব্যানার পোস্টার আগুন দিয়ে পোড়াচ্ছে। জাতির পিতার ছবি থাকবে প্রতিটি দপ্তরে, প্রতিটি বাঙালির ঘরে, প্রতিটি অফিসে। জাতির পিতার ছবি ছাপায়ে আমরা কেন তার ছবিবে এভাবে অবমাননা করছি। জাতির পিতার ছবির সাথে আর কারও ছবি সংযোগ করা যায় বলে আমার জানা নেই। তাই সকল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তিদের কাছে বিনীত অনুরোধ জাতির ছবি পোস্টারে ছাপাবেন না বা জাতির পিতার ছবির সাথে কারো ছবি সংযোগ করবেন না। তা তিনি যত বড়ই নেতা বা নেত্রী হন না কেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তিনি জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিবসে প্রথমে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মান্যদান করেন, তারপর দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তারপর দলীয় প্রধান হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে মাল্য দান করেন। যেখানে আওয়ামী লীগের প্রধান বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সমগ্র পৃথিবীর বড় বড় নেতা, নেত্রীরা, রাষ্ট্র প্রধানরা আমাদের জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তার দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের সেরা ভাষণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। সেই জাতির পিতার প্রতি আমাদের কেন এত অশ্রদ্ধা। পৃথিবীর সব দেশের জাতির পিতার ছবি সর্বত্র ব্যবহার করা যায় না, তাই সকলকে অনুরোধ যদি সম্ভব হয় আওয়ামী লীগের প্রধানদের সাথে আলোচনা করে দেখুন জাতির পিতার ছবি পোস্টার, হ্যান্ডবিল, ব্যানার থেকে বাদ দিয়ে দলীয় সভানেত্রীর বা অন্যকারে ছবি সংযুক্ত করে পোস্টার হ্যান্ডবিল ব্যানার তৈরী করে ব্যবহার করলে কোন ক্ষতি হবে কি না? জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো প্রতিটি বাঙালির কর্তব্য বলে আমার মনে হয়। ভুল ক্রটি ক্ষমা করে দেবেন। মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান, ভারতীয় তালিকা নং- ৪৫৩৩২, সাতক্ষীরা জেলা