কি মাংস খাচ্ছি আমরা!


প্রকাশিত : এপ্রিল ১, ২০১৮ ||

আব্দুস সামাদ: প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পশু জবাই ও মাংস পরীক্ষা’ নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘জবাইখানায় পশু রাখার শেড থাকতে হবে। সেই শেড শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে এবং ঝুলিয়ে গরুর চামড়া ছাড়াতে হবে যাতে মাটি স্পর্শ করতে না পারে। কমপক্ষে তিন দিন পশু রেখে ডাক্তারি পরীক্ষায় সার্টিফিকেট মিললেই জবাইয়ের জন্য নেওয়া হবে। চাকু দিয়ে চামড়া তোলা যাবে না, পুলিং চেইন ব্যবহার করতে হবে। জবাই করার পর মাংস কুলিং অবস্থায় আট থেকে ২৪ ঘণ্টা রাখতে হবে যাতে মাংসের ওপর চর্বির কোটিং পড়ে। এতে মাংস জীবাণুমুক্ত থাকবে। প্রসেসিং রুমে প্যাকেটিং করার আগে ভেটেরিনারি সার্জন পয়জন ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য পরীক্ষার পর সার্টিফিকেট দেবেন এটা বাজারজাত হবে কি না। বাজারজাতের উপযুক্ত হলে সিলম্যান গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার জন্য আলাদা আলাদা সিল দেবেন।
সরকারি চার্জ হিসেবে গরুর জন্য ১০০ টাকা, মহিষের জন্য ১৫০ টাকা, ছাগল/ভেড়ার জন্য ৫০ টাকা করে দিতে হবে। প্রত্যেক জবাইখানায় আট ঘণ্টা হিসেবে প্রতি শিফটে একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার, হুজুর, পরিদর্শক, সিলম্যান এবং ক্লিনার থাকবে। এভাবে পশু জবাই হলেই কেবল স্বাস্থ্যসম্মত মাংস পাওয়া যাবে।
এ নীতিমালার শর্ত মেনেই জবাই স্ল্যাবের ইজারাদার ইজারা নেন। সরকার অনুমোদিত জবাইখানার বাইরে এবং সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পশু জবাই করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিধান রেখে ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ বিল’ ২০১১ পাস হয়েছে।
এ বিলে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করতে পারবে না। আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯ অনুসারে বিচার হবে। বিচারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে অনূর্ধ্ব এক বছর বিনা শ্রম কারাদন্ড অথবা ন্যূনতম পাঁচ হাজার এবং অনূর্ধ্ব ২৫ হাজার টাকা আর্থিক দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতক্ষীরা বড় বাজারে পৌরসভার একটি মাত্র কসাই খানা আছে। এর অধীনে পৌর এলাকায় প্রায় ২৫টি মাংসের দোকান রয়েছে। প্রতিদিন এসব দোকনের প্রায় ১০ থেকে ১২ টা খোলা হয়। আর শুক্রবারে খোলা হয় প্রায় ২০টি দোকান। প্রতি বছর সরকারি নীতিমালা মেনে পৌরসভা থেকে কসাইখানা ইজারা প্রদান করা হয়। চলতি বছওে সাতক্ষীরা পৌরসভার একমাত্র কসাইখানা ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন মাংস ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি আব্দুল কাদের হাজী। নীতিমালা মেনে ইজানা নিলেও পৌরসভার এ কসাইখানায় তার কোন তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছা মত পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানে আট ঘণ্টা হিসেবে প্রতি শিফটে একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার, হুজুর, পরিদর্শক, সিলম্যান এবং ক্লিনার থাকার কথা থাকলেও তা দেখা যায় না। পশু জবাই করার পর মাংসের ওপর চর্বির কোটিং ফেলতে কুলিং অবস্থায় আট থেকে ২৪ ঘণ্টা রাখার কথা তারতো কোন বালাই নেই। আবার কসাইখানায় পশু বিশ্রানের জন্য রাখার কথা তাও দেখা যায় না সাতক্ষীরা পৌরসভার কসাই খানায়। প্রতিটি ব্যবসায়ী তাদের নিজেদের ইচ্ছা মত পশু জবাই করে কোন প্রকার পরীক্ষা ছাড়া নিজেরাই সিল মেরে মাংস বিক্রয় করেন। আবার বিক্রয়ের সময় দেখা যায় নানা প্রতারণা। অসুস্থ ও দুর্বল পশুর মাংশ বিক্রয় করা, ওজনে কম দেওয়া, খাওয়ার অনুপোযোগী অংশ গোপনে দিয়ে দেওয়া, ক্রেতা ভেদে দাম বেশি নেওয়া ও ময়লা যুক্ত মাংস বিক্রয় করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যায়।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, প্রতিটি দোকানে ওয়েট মেশিং রাখা হয় একটু পিছনের দিকে। তার উপর কোন পাত্র তুলে তাতে মাংস ওজন বিক্রয় করা হয়। অনেক সময় পাশে আর একটি পাত্রে মাংসের উচ্ছৃষ্ট রেখে ক্রেতার চোখ ফাঁকি মাংসের সাথে দিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় আবার ওয়েট মেশিং এর পাশে পুরাতন কাপড় জাতীয় কিছু একটা রেখে তার মধ্যে রাখা হয় মাংসের উচ্ছৃষ্ট সেটিও ক্রেতার চোখ ফাকি দিয়ে ওজনের সাথে দিয়ে দেওয়া হয়। মহিলা ক্রেতাদের ক্ষেত্রে এ প্রতারণার মাত্রা আরও বেশি। তবে ওজনে কম দেওয়ার প্রবণতাটা বেশি লক্ষ করা যায়।
সাতক্ষীরা বড়বাজারের মাংস ক্রেতা গোলাম সরোয়ার দৈনিক পত্রদূত’র এ প্রতিনিধিকে বলেন, মাংসের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ বালাই ছড়াই। অথচ সেই বাজার দেখা শুনায় কর্তৃপক্ষ বরাবরই উদাসিন।
তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ দেখাশুনায় উদাসিন হলে কি হবে, প্রতিমাসে কর্মকর্তারা এসে ঠিকই এখান থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকেন। তাই তারাও কিছু বলেন না। আর ব্যবসায়িরা এই সুযোগে দুর্বল অসুস্থ পশু জবাই করে পরীক্ষা-নিরিক্ষা ছাড়াই লোক দেখানো সীল মেরে মাংস বিক্রয় করছে। আমরাও কোন কিছু না দেখে সেই মাংস কিনে খাচ্ছি। কি আর করা যাবে।
সুলতানপুর বড়বাজারের মাংস ক্রেতা হাসিনা খাতুন দৈনিক পত্রদূত’র এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমি বাজার থেকে মাংস কিনেছি ভাল দেখে। কিন্তু বাসায় এসে দেখি তার মধ্যে অর্ধেক মাংস খারাপ। সাদা সাদা ময়লা যুক্ত যা খাওয়ার অনুপযোগী। মাংস কিনার সময় কিন্তু আমি এগুলো দেখিনি। দাম দিয়ে মাংস কিনে বাসায় এসে অর্ধেক ফেলে দিতে হয়েছে। কি আর করবো। কিছু বলতে গেলে উল্টে কথা শুনিয়ে দেয়া।
এসব অভিযোগের অনেক কিছুই স্বীকার করে সাতক্ষীরা বড়বাজার মাংস ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি হাজী আব্দুল কাদের দৈনিক পত্রদূত’র এ প্রতিনিধিকে বলেন, পৌরসভা থেকে ইজারা নিয়ে কসাই খানা পরিচালনা করছি। কিন্তু যেসব নিয়োম মেনে কসাইখানা পরিচালনা করতে হয় তার অনেকটাই মানতে পরছি না। এর জন্য আমরা এককভাবে দায়ি না। কারণ বর্তমানে যে কসাইখানা আছে তার জায়গা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই ছোট। সেখানে মাত্র ৬টি গরু রাখা যায়। তাছাড়া কসাই খানার ভেটেরিনারি ডাক্তারের জন্য কর্তৃপক্ষকে বার বার বলা হলেও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাই আমরা ও অসহায় হয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আগে মাঝে মধ্যে ডাক্তার বা অন্যান্যরা আসত কিন্তু গত তিন মাস মোটেই আসছে না। এটি নিয়ে আমরা খুবই সমস্যায় আছি। এছাড়া সিলম্যান সিল মারতে না আসায় নিরুপায় হয়ে আমার নিজেরাই সিল মেরে নিচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ওজনে কম বা খাপার মাংশ দেয়াসহ যদি মাংস বিক্রেতারা কোন সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে তবে সিট গুরুত্বের সাথে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও জানান, বড়বাজারের বাইরে পৌর এলাকার অনেক মাংস ব্যবসায়ি আছে তারা এখানে গরু আনে না। বিশেষ করে খুলনা রোড মোড়ে জনি বিফ হাউজ। তারা নিজেদের মত করে গরু জবাই করে মাংস বিক্রয় করে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পৌরসভার সেনেটারী ইন্সপেক্টর মো. রবিউল আলম দৈনিক পত্রদূত’র এ প্রতিনিধিকে বলেন, এগুলো আমারই দেখার কথা। কিন্তু সব সময় দেখা হয় না। তবে মূল কাজটা আমার নয়। মূল কাজটা একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারের। তিনি পরীক্ষা করে পশুর সুস্থতা নিশ্চিত করবেন। তবেই পশু জবাই করা যাবে। এছাড়াও আরও কিছু নিয়োম নীতি আছে পশু জবাই করার। সেগুলো মেনে পশু জবাই দেশের কোথাও হয় না।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভার যে কসাই খানা আছে সেটি মূলত ইজারা দিয়ে পরিচালনা করা হয়। জিনি ইজারা নেন তিনি তার মত করে পরিচালনা করেন। আমরা মাঝে মাঝে গিয়ে খোজ নেই।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার সমরেশ চন্দ্র দাস দৈনিক পত্রদূত’র এ প্রতিনিধিকে বলেন, পশু জবাই করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করেত হবে। পরীক্ষায় কোন প্রকার রোগ ধরা না পড়লে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পশু জবাই করার জন্য অনুমতি প্রদান করবেন। সেই পশু জবাই করে যে মাংষ পাওয়া যাবে তা স্বাস্থ্য সম্মত হবে। কিন্তু সাতক্ষীরায় সেটি লক্ষ করা যায় না। তাছাড়া সরকারের যে সব নিয়োম নীতি আছে তাও অনুসরণকরতে দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য সম্মত পশু জবাই করার বিষয়টি মূলত দেখার কথা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের। তারা পরীক্ষার জন্য আমাদের কাছে আবেদন করলে সকল নিয়োম মেনে সরকারি ফি নিয়ে আমরা পরীক্ষা করে দিতে পারী। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে আমাদের কোন কিছুই জানায় না। তাই আমাদেরও কিছু করার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, পশু পরীক্ষা না করে জবাই করলে মাংসে যদি কোন জীবানু থাকলে তা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাটা জরুরী বলে তিনি জানান।