প্রসঙ্গ: কোচিং ও প্রশ্ন ফাঁস


প্রকাশিত : এপ্রিল ২, ২০১৮ ||

 

মো. জাবের হোসেন

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কোচিং কেন্দ্রিকে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড হলেও আমরা সেটা থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি। আমরা প্রকৃত মেধাবী হারাচ্ছি। দেশের প্রায় প্রতিটি জায়গায় কোচিং বাণিজ্য চলছে। এমনকি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরাও এখন কোচিং বাণিজ্য শুরু করেছেন। অভিভাবকরা ভাবে তাদের সন্তানদের শিক্ষকদের কাছে কোচিংয়ে না দিলে পরীক্ষায় হয়তো নম্বর কম পাবে, অথবা শিক্ষকরা ভালো নজরে দেখবে না। এই সুযোগটাও কাজে লাগাচ্ছে শিক্ষকরা। সেই সাথে আছে বাইরের কোচিং সেন্টার। দেশে স্কুল-কলেজের তুলনায় কোচিং সেন্টার এখন বেশি। এত কোচিং সেন্টার আগে ছিলোনা, তাহলে এখন কেনো? তাহলে কি বুঝতে হবে আগের থেকে শিক্ষার মান কমে গেছে। না কি শিক্ষকদের পড়ানোর ধরণ বদলিয়েছে? শিক্ষকরা যদি ক্লাসে ঠিক মত পড়ান তাহলে কোচিং প্রয়োজন কেনো? এত কিছু করার পরও কি আমরা সুষ্ঠু শিক্ষা পাচ্ছি ? এ বছরের শুরুতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। তার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সকল প্রকার কোচিং সেন্টার বন্ধের ঘোষণা দেন এবং সেই সাথে প্রশ্ন ফাঁস রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রশ্ন ফাঁস প্রমাণিত হলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে। পরীক্ষা শুরুর ত্রিশ মিনিট আগে পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। যদি কোনো কারণে দেরি হয়ে যায় তাহলে পরীক্ষার কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হবেনা এবং পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবেনা। কোনো প্রকার সমস্যা এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবেনা। কিন্তু কথা থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের কারো না কারোর তো সমস্যার কারণে কোনো একদিন এক দুই মিনিট বা তার বেশি দেরি হতে পারে। তাহলে এটা তার অপরাধ?

তথাপি পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে থাকে। আগামী মাস থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে। ২৭ মার্চের এক পরিপত্রের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ২৯ মার্চ থেকে দেশের সকল কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিবার পরীক্ষার আগে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি কোচিং সেন্টারগুলে বন্ধ থাকে ? সরকারি নির্দেশ অমান্য করে হরহামেশাই কোচিং সেন্টার চালু রাখে। বিশেষ করে গ্রামের কোচিং সেন্টারগুলো একেবারেই বন্ধ করা হয়না। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা বিশেষ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনা। তাহলে কি কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ শুধুমাত্র লোক দেখানো?

আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে কোনটা ? পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, না কি কোচিং সেন্টার বন্ধ। কোচিং সেন্টার শিক্ষায় কি কোনো গুরুত্ব রাখে ? যদি না রাখে তাহলে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীরা কেনো যায় ? না কি কোচিং সেন্টারে যাওয়াটা একটা রীতি হয়ে গেছে। যদি কোচিং সেন্টারগুলে শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাহলে কেনো বন্ধ করতে হবে। আর যদি কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কারণ হয় তাহলে স্থায়ী ভাবে কেনো বন্ধ করা হচ্ছেনা ? শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় কোনো বন্ধ রাখার জন্য বলা হচ্ছে।

মেধাবীরা পড়ে ভালে ফলাফল করছে। আপরপক্ষে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সারা বছর না পড়েই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল পাচ্ছে। মেধাবীরাতো শুধু ভালো ফলাফল লাভ করছেনা, সেই সাথে তারা জ্ঞান অর্জন করছে। তারা দেশের জন্য অবদান রাখছে। কিন্তু যারা প্রশ্ন ফাঁস করা প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করছে তারা কী শিখছে। তারা কী দেশের জন্য কোনো অবদান রাখতে পারছে। তাদের কাছ থেকে জাতি কী আশা করতে পারে। তারা নিজেরাও জানেনা তারা নিজেদের জন্য কী করছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে কারা জড়িত তা এখনো সরকার ধরতে পারেনি। যদিও কয়েকজনকে গত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে ধরেছিলো তথাপি শিক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেনি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা না গেলে জাতি মেধা শূন্য হয়ে পড়বে। আপরদিকে কোচিং বিমুখ করতে না পারলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার যথাযথ মান থেকে বিমুখ হবে। এজন্য উচিত দুটিই রোধ করা।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে সংসদে দাবি উঠেছিলো। শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করে থাকেন শিক্ষামন্ত্রী। আমাদের উচিত যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয় তার দিকে নজর দেওয়া। কীভাবে, কারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে বন্টন পর্যন্ত সব কাজ করে থাকে সরকারি লোক। তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে কারা জড়িত। সাধারণ জনগণ, না কি সরকারি কর্মকর্তা। আর সেটা কীভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছায়। পরীক্ষার আগে কীভাবে পায় শিক্ষার্থীরা। যেখানে পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রশ্নপত্র খোলা হয়না। কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এজন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোচিংসেন্টার যেনো শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সবার নজর দিতে হবে। লেখক: সাংবাদিক ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী