সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বধ্যভূমিগুলি সংরক্ষণ হবে?


প্রকাশিত : এপ্রিল ৮, ২০১৮ ||

মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাত্রে যখন পাক হানাদার বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ভারি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখনই বাঙালি জাতির জনকের নির্দেশে জনগণ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য। শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ। সারা দেশের ন্যায় খুলনা বিভাগ থেকে নিরীহ মানুষ সর্বস্ব ফেলে ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাঁচার জন্য পালাচ্ছে। তখনই ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ৯৬ গ্রাম ও তালার একদল মানুষ পালিয়ে যাওয়ার জন্য সাতক্ষীরা শহরে আসে। বিকাল থেকে হালকা বৃষ্টির কারণে ৫০০-৬০০ জন পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা শিশু আশ্রয় নেয় বর্তমান সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয়ে। মনে করেছিল সকালে আবার ভারতে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু ঐ দিন সন্ধ্যায় পাকসেনারা সাতক্ষীরায় প্রবেশ করে। প্রথমেই তারা সরকারি বালক বিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে থাকে। নারীদের ধর্ষণ করে খুন করে। পুরুষদের হত্যা করে। বাচ্চাদের আছাড় মেরে ফেলে উত্তর পার্শ্বের পুকুরে ছুড়ে ফেলে দেয়। কিছু লোক আহত হয়েও পালাতে পেরেছিল। এরপর পাকসেনারা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের উত্তর পার্শ্বে দীনেশ কর্মকারের বাড়ির মধ্যে সমস্ত মৃত দেহগুলো নিয়ে দীনেশ কর্মকারের বাড়ির মাটির প্রাচির ভেঙ্গেও মাটির ঘরে দেওয়াল ভেঙ্গে লাশগুলি মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। ৩০০-৪০০ জন মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২২ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়ের বাজার থেকে পশ্চিম দিকে কাকডাংগা বর্ডার পর্যন্ত যে মাটির রাস্তা চলে গিয়েছিল (বর্তমানে পাকা রাস্তা) সেই রাস্তা দিয়ে কয়েক হাজার মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে যাচ্ছিল। এ সংবাদ পেয়ে পাক সেনাদের দোসর খালেক মাওলানা, আব্দুল্লাহ হেল বাকী, রোকনুজ্জামানসহ আরো কয়েকজন পাক সেনাদের সঙ্গে নিয়ে মেশিনগান সজ্জিত গাড়ীর বহরসহ ঝাউডাঙ্গা পৌঁছায়, কাকডাংগা যাওয়া রাস্তার উপর নিরীহ শরণার্থীদের উপর মেশিনগান নিয়ে গুলি করে কয়েকশত মানুষকে খুন করে। লাশগুলো সৎকার করার মত কাউকে পাওয়া যায়নি। অনেক লাশ রাস্তায়, বিলে পড়ে ছিলো। কুকুর, শিয়াল, শকুনে ছিড়ে খেয়েছিল সে লাশ।
এরপর পাকসেনারা সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলিপুর ইউনিয়নের মাহামুদপুর স্কুলে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প করে সেখানে কসাইখানা বানালো। জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার পরিবারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারীদের পাকসেনাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, দালালদের সহযোগিতায় ধরে এনে জবাই করে, গুলি করে মারা হলো, শতশত মানুষকে খুন করে লাশ গর্তের মধ্যে ফেলা হতো। এই লাশ ফেলার জন্য বিশাল গর্ত করে রাখা হয়েছিল তাতে লাশগুলো ফেলতো, যাকে ধরে মাহমুদপুর স্কুলে নেওয়া হতো সে আর কোন দিন ফিরে আসতো না। তাছাড়া বাঁকাল ব্রীজ এর নিচে নদীতে নামিয়ে অনেক মানুষকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
দেশ স্বাধীন হলো। সরকারি বালক বিদ্যালয়ের উত্তর পার্শ্বে দীনেশ কর্মকারের বাড়ির ভিতর থেকে মরদেহ’র কংকাল, মাথার খুলি পুকুর থেকে শিশুদের দেহাবশেষ তোলা হলো। ঢাকা থেকে আসা প্রতিনিধি দল সেগুলো নিয়ে গিয়েছিল। মাহমুদপুর স্কুলের কসাইখানা থেকে তোলা মরদেহ, কঙ্কাল, মাথা, শরীরে অংশগুলোও নিয়ে গেলেন, ঝাউডাঙ্গা হতে কাকডাংগা রাস্তার পার্শ্বে মরদেহের যে যে অংশগুলো পাওয়া গেল সেগুলো ও ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠন হওয়ার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাতক্ষীরার মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের সকল মানুষ বারবার সরকারের কাছে আবেদন করেছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বধ্যভূমিগুলো সীমানা চিহ্নিত করে বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। কিন্তু কোন ফল হয়নি। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় গঠন হওয়ার পর থেকে বহুবার মুক্তিযোদ্ধারা লিখিতভাবে, মৌখিকভাবে, সমাবেশ করে, টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন, নিবেদন করেছে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের জন্য। কোন ফল হয়নি। দিনের পরদিন শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কাজ কিছুই হয়নি। বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
দীর্ঘ ৪৭ বছর পার হয়েছে। দিনে দিনে বধ্যভূমিগুলো ব্যক্তি মালিকানা জমিতে হওয়ার কারণে জমিগুলো হাত বদল হতে, হতে বধ্যভূমির চিহ্ন মুছে যেতে বসেছে। সরকারি বালক বিদ্যালয়ের পিছনে দীনেশ কর্মকারের বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। জমির মালিক বধ্যভূমির উপর বিল্ডিং নির্মাণ করেছে। মাহমুদপুর স্কুলের কসাইখানা ওপর স্কুল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন পর নতুন বিল্ডিং নির্মাণ করেছে। ঝাউডাঙ্গা থেকে কাকডাংগা রাস্তা পাকা হয়েছে। রাস্তার পার্শ্বের জমিতে ঘরবাড়ি, দোকান নির্মাণ করেছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বধ্যভূমিগুলো। জানি না দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বধ্যভূমিগুলিকে কেন প্রশাসন, মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সংরক্ষণ করা হয়নি? বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরও কেন কর্তাদের সহানুভূতি হলো না। তবে কি কালের আবর্তে এক দিন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুলে যাবে সাতক্ষীরায় বৃহত্তর বধ্যভূমির কথা?
বর্তমান সরকার সারা দেশব্যাপি বধ্যভূমি, গণকবরগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু চুকনগর বধ্যভূমির সমতুল্য সাতক্ষীরার তিনটি বড় বধ্যভূমি সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ কেন নেওয়া হয় না? আমরা জানি না। তাই স্বাধীনতার স্বপক্ষের সকল শক্তি, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তানসহ সকলকে একত্রিক হয়ে দাবি তুলতে হবে। সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে। সাতক্ষীরার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে হবে। যেসমস্ত বধ্যভূমির জায়গা ব্যক্তি মালিকানায় দখল রয়েছে সেই জমিগুলো পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা সরকারকে করার জন্য সাতক্ষীরাবাসিকে একত্রিত হতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাতক্ষীরাবাসির কাছে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কি জবাব দেবে? সবাই সংঘবদ্ধ হলে নিশ্চয়ই বধ্যভূমি উদ্ধার হবে। স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হবে। সাতক্ষীরার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে এই দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য শতশত মানুষ জীবন দিয়েছিলো। মৃতদের আত্মাও শান্তি পাবে। তাদের স্মৃতি আমরা সংরক্ষণ করতে পেরেছি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবি হোক। লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, ভারতীয় তালিকা নং-৪৫৩৩২, সাতক্ষীরা।