বাঙলার নববর্ষ


প্রকাশিত : এপ্রিল ১৪, ২০১৮ ||

 

সুদয় কুমার মন্ডল

বাঙালি কৃষ্টিমূলে বর্ষ পরিক্রমার মাস বৈশাখ। বাঙলা নববর্ষ বাংলা পঞ্জিকায় বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। এই বৈশাখ মাসে বৈশাখী মেলার উৎসবমুখর পরিবেশে বাঙলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও বাঙলার প্রকৃতি আনন্দে মুখরিত হয়। বাঙালি ঐতিহ্যে আজন্ম লালিত চিরাচরিত প্রথার দ্বান্দ্বিক, প্রতিদ্বান্দ্বিক ও সকল বৈরিতা ভেদাভেদ ভুলে বিগত দিনের জরাজীর্ণতার সকল বেড়াজাল ছিন্ন করে নববর্ষের মাঙ্গলিক তিলক এঁকে, সুখ সমৃদ্ধি ও জাগতিক কল্যাণে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রীতির ডোরে নববর্ষ বাঙালি চিত্তে স্বেচ্ছায় ও স্বশ্রদ্ধায় বরণ করে নেয় এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নানা উৎসব মুখর পরিবেশে দিনটি পালন করে। দিনটি রাষ্ট্রীয় ছুটি স্বীকৃত। শ্রদ্ধাভরে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়, যেমন নববধুর প্রথম শ্বশুরালয় গমনে বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমুখী আনুষ্ঠানিকতায় বরণ করে নেয়, তদ্রুপ নববর্ষ যেন বাঙালির নববধুরূপী শ্বশুরালয় গমন বরণ্যে হয়ে ওঠে। সদ্য পরিণতা অচেনা দম্পতি প্রথম লজ্জ্বা ভাঙে বাসরী রজনীর প্রথম প্রহরের ফুলশয্যায়। আর সেই ফুলশয্যা রাত্রের নির্দেশনায় দম্পতিযুগলকে যেনো ক্রমান্বয়ে ভালোবাসা, ¯েœহ, মায়া, মমতা ও পারস্পরিক ও ঘণিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। যাহা বিধাতার এক মহান দান। অত:পর হয়ে ওঠে দিনে দিনে ভরে ওঠে ভালোবাসার অনন্ত উৎস্য হৃদয়ের নিভৃততম স্থান। যা জুড়ে নেয় অন্তর দেহ ও মানবিকতার শীর্ষ স্থান। গড়ে ওঠে অনাবিল ভালোবাসার পবিত্র পীঠস্থান। জন্ম নেয় প্রজননশীল জীবের উপযুক্ত উত্তরাধিকারী দেশের ভবিষ্যত নাগরিক। উদীয়মান সূর্যের বর্ণিল আভায় আলোকিত করে দেয় চর্তুদিক। জীবন মেলার খেলায় নববর্ষ যেন হয়ে যায় সঙ্গীস্বরূপ। নববর্ষ বাঙালি ঐহিত্যকে লালন করে। ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করে। স্বতন্ত্র মহিমায় আপন সত্ত্বাকে জাগরিত করে শুভপদ ও কল্যাণকর পদযাত্রা শুরু করে। আর সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করে বাঙালির সংস্কৃতির ময়দান ভরে ওঠে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনযাত্রা প্রণালী যেন বর্ষবরণের ভাবগাম্ভির্যে অনুসৃত হয়। একটি দেশের সংবিধান যেমন দেশ পরিচালনার চাবিকাঠি বা রাষ্ট্রীয় দলিল, নববর্ষ তেমনি বাঙালির জীবনযাত্রা প্রণয়নের বা বাঙালির চিরাচরিত আচার আচরণের প্রকৃষ্ঠ প্রজ্ঞাপন। বাঙলা সংস্কৃতির গতিধারা যা বাঙালিরা চিরকাল স্মরণ, বরণ, পালন ও অনুসরণ করে আসছে। বর্ষবরণের অনুপম সুখ বাঙালি অন্তরকে হৃদয়বান ও মহৎ করে তোলে।

বাঙলা নববর্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি ব্যতিক্রমধর্মী জাতীয় অনুষ্ঠান। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘণিষ্ঠ। তাই বাঙলা নববর্ষকে বাঙালি জাতি পরম শ্রদ্ধায় প্রতিবছর সাদরে সাড়ম্বরে বরণ করে লয়। বিগত দিনের সুখ দু:খ এমনকি সকল হিংসা বিদ্বেষ ও কালিমার অবসান ঘটিয়ে নতুনত্বের উল্লাসে হৃদয় নিড়ানো আবেগ ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের অনুপম সুসম্পর্কের নিরুপম ছায়া নতুন দ্রাঘিমার বন্ধনে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে দিগন্ত পল্লবিত হাওয়ায় মানবিকতার সুস্থ বিবেক ফিরে পায়। জেগে ওঠে জাতীয় সত্ত্বার সুমহান আদর্শ। ‘ভুলে যাওয়া বেদনা’ ভুলে বাঙালির সাংস্কৃতিক অঙ্গন নতুন আলংকরিক সৌন্দর্যের অভিনবত্ব রূপে সৃজনশীলতার সন্ধান পায়। প্রকৃতির নন্দন কাননে বয়ে যায় সমৃদ্ধির সু-বাতাস, প্রগতির নান্দনিক ঈশারায়। জাতীয় স্বত্ত্বায় প্রাণের সবল স্পন্দন জাগে নববর্ষ আগমনী শান্তি বারির স্পর্শে শুদ্ধতার বিমল সলীলে। নববর্ষ বাঙালির আশির্বাদ। আর এই আশির্বাদে বাঙালি জাতি যেন পুনরুজ্জীবিত হয়ে নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। কামনার উচ্চ ফসল ফলায়। বিবেকের বিকাশ ঘটায়। সৌহার্দ্যরে বন্ধন সুদৃঢ় করে পরস্পরের দেখা সাক্ষাত পাওয়া মাত্রই নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ব্যবসায়িরা নববর্ষের দিন হালখাতা করে। পুরানো দিনের হিসাব নিকাশ মিলায়। সর্বস্তরের মানুষ শুচিতা নিয়ে সকাল থেকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ও সকল ভেদাভেদ ভুলে প্রীতি শুভেচ্ছা জানায়। ধর্মীয় গান, দেশাত্ববোধক গান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নামকীর্ত্তনসহ বিভিন্ন সংগীত, খোল, চাকি, হারমোনিয়াম, ঢোল তবলা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পরিবেশন করে থাকে। সমগ্র অঞ্চল সুরের মাধুর্যে ও নতুনত্বের পল্লবে মুখোরিত হয়ে ওঠে। মিস্টি মিষ্টান্ন ও অতিথি ভোজনে নববর্ষে বাঙালিরা মুক্তহস্ত। পান্তাভাত আর ইলিশ মাছ ঐদিন বাঙালিদের চিরাচরিত প্রথাগত খাদ্য। আম, শৈল মাছ খাওয়ায় বৈশাখ মাসে বাঙালির রেওয়াজ। অনেক শুভ কাজ নতুন বর্ষে বাঙালিরা করে। নৌকাপত্তন, বাসগৃহ নির্মাণ, বিবাহ, ক্রয় বিক্রয় বাণিজ্য ইত্যাদি শুভ কাজ নববর্ষে বাঙালিরা প্রথামাফিক করে থাকে। যা আজো চালু আছে বাঙালির স্বতন্ত্র সীমানায়। বাঙলা নববর্ষ বাঙালির এক প্রীতির দিশা। বাঙালি ঐহিত্যে লালিত বাঙলা নববর্ষ যেন বাঙালিদের অতিথি পরায়নতা, স্বজনপ্রীতি সন্তান বাৎসল্য, পিতা-মাতা, বিপদের দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো ও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল জাতির প্রতি অভিন্ন অকৃত্রিম প্রেম এবং নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ গুণাবলী উপহার দিয়েছে যা বাঙালিদের পৃথিবীর অন্যান্য জাতির তুলনায় স্বতন্ত্র ও পৃথক করে মহান করে তুলেছে। বাঙালিদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জাতি আছেÑএবং প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ধর্মীয় উপাসনালয় ও স্বতন্ত্র ধর্ম আছে। যা তারা স্বতন্ত্র আঙ্গিকে স্বাচ্ছন্দে নিরাপদে ও নির্বিঘেœ পালন করে সুস্থ্য স্বতন্ত্র ধর্মীয় অনুভূতিতে আসক্ত থাকে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতীয় স্বত্ত্বার সেই সুমহান জাতি ধর্ম নির্বিশেষে উপাসনার একক উপাসনালয় বাঙালি কৃষ্টির অন্যতম সাধনার ফসল বাঙলার নববর্ষ বা বর্ষবরণ। আর এই নববর্ষে অর্থাৎ বৈশাখ মাসে কালবৈশাখীর ঝড় হয়। আর এই প্রচ- তান্ডব ঝড়ে মানুষের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয় তবুও বাঙালির নিকট আদরের দুলালী যেন বৈশাখ। সব মিলিয়ে বৈশাখ যে তাৎপর্য বয়ে আনে তাতে ক্ষতির তুলনায় মানুষের অনেক কল্যাণ হয়। তাই বৈশাখ বাঙালির কাছে এতো প্রিয় ও বরণীয়। আর এই প্রিয় ও বরণীয় অনুষ্ঠানকে বিভিন্ন উৎসবমুখর পরিবেশে যথার্থভাবে লালনের উদ্দেশ্যে চৈত্রের তুখোড় রৌদ্রের প্রচ- ক্ষরার মধ্যে থেকেও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন বাঙলা নববর্ষ উদ্যাপনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। যা অনুষ্ঠান বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনকে আরো সার্থক সফল ও মহিমান্বিত করে তোলে। লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ, ঘোড় দৌড়, হাডুডু ইত্যাদি খেলা ধুলা ও সংগীত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালিত হয়। আর এই উৎসবকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি জাতি নানা অলংকারে বিভূষিত করে সকলে একত্রে পালন করে। যা ধর্মীয় বা ধর্মান্ধ অনুভূতিকে হার মানিয়ে দেয়। এই যে হৃদ্রতা ও ভ্রাতৃত্বের আলিঙ্গন যেন ¯্রষ্ঠাকেও হার মানিয়ে দেয় এবং মানব ধর্মই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। মিলনের মহামন্ত্রে দিক্ষিত বাঙালি জাতিকে নববর্ষ উদ্যাপনে এই সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্যকোন জাতির মধ্যে দেখা যায় না। নববর্ষের দিন বাঙালিরা জাতীয় স্বত্ত্বার ভিতকে সুদৃঢ় করার জন্য নতুন করে শপথ গ্রহণ করে। পরম পবিত্রতা সূচী ও শুভ্রতার সঙ্গে দিনটি পালন পূর্বক কার্টুন ফেস্টুন ও রংবেরংয়ের রকমারিতে সেজে গুজে সমস্ত অনুষ্ঠান মুখোরিত করে তোলে। মেয়েরা ও বউয়েরা হরেক রকম সাজে সজ্জিত হয়ে নৃত্য ও গানে অনুষ্ঠান মাতিয়ে তোলে। বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও মিলন মিছিল বের করে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি এ দিনে বহু সমাজসেবা সংস্থা, সাহিত্য ও সাংষ্কৃতিক প্রতিষ্ঠান স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী নানা ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই উৎসবমুখর পরিবেশে যেন সমগ্র বাঙলার আকাশ বাতাস মুখোরিত হয়। প্রাণি ও উদ্ভিদকূলে সাড়া জাগে। উৎসবের ব্যঞ্জনায় হয়ে ওঠে অধীর ও আনন্দিত। নাটক, যাত্রাগান, জারিগান, সার্কাস, পুতুল নাচ ও বিভিন্ন ধরণের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলায় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যা বাঙালির চিত্তবিনোদনের এক অন্যতম উপায়। সব ধরণের মানুষ নববর্ষকে স্বাগতম জানায় ও বৈশাখী মেলায় উপস্থিত হয়ে আনন্দ অনাবিল ও সুখ-শান্তি অনুভব করে চিত্তকে বিকোশিত করে। বাঙলার গ্রামগঞ্জে রামযাত্রা, রামায়ণ ও নামকীর্ত্তনের আসরসহ বইমেলা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবারের সকলেই প্রায় শুচিতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করে থাকে। কেউ কেউ সারাদিন নামকীর্ত্তন গেয়ে বেড়ায়। সারাদিন নামকীর্ত্তন গেয়ে যে চাল ও পয়সা হয় তা দিয়ে সন্ধ্যায় প্রীতিভোজের আয়োজন করে। গাছতলায় অথবা অন্য কোন সাধারণ জায়গায় সকলে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ও আনন্দ ফুর্তি করে। এর ভিতর দিয়ে গড়ে ওঠে আপনত্বের এক সুদৃঢ় বন্ধন। যা বাঙালির কৃষ্টিতে ঐহিত্যমন্ডিত। এই যে মিলন মেলা শুধু মানুষকে প্রজ্ঞাবহ করে তোলে না। মহামিলনের এক সেতু বন্ধন সৃষ্টি করে। নববর্ষের তাৎপর্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্ত ও মজবুত করে মিলনের মহামন্ত্রে দীক্ষিত করে। নববর্ষ যেন দীক্ষাগুরুর ন্যায় মানুষের আচার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। মহৎ আচরণ পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধানে সহায়ক বলে মানুষকে আনন্দ দান করে। পক্ষান্তরে মন্দ আচরণ পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের পরিপন্থী বলে তা মানুষের মনে বেদনা ও দু:খ কষ্টের উদ্রেক করে। নববর্ষের চিরায়িত প্রথার ফলশ্রুতি আমাদের বিশেষত বাঙালি মনে আত্মসংরক্ষনের খোরাক জোগায়। আত্মসংরক্ষণ ও জাতীয় সংরক্ষণ একই জৈবিক অভিব্যক্তির স্বাভাবিক ফল। মানুষ সুখী ও সুদীর্ঘ জীবন লাভে সক্ষম হলে বলা চলে যে সে জৈবিক বিবতর্নের কল্যাণে আত্ম সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে। বস্তুত: সৎ আচরণ মানুষকে আত্ম সংরক্ষনে সহায়তা করে এবং অসৎ আচরণ আত্মসংরক্ষণে বাঁধা দান করে। সাধারণত বাঙালিরা কোন আচরণ, প্রথা বা হিতকর কোন সত্ত্বায় বিমোহিত বা মুগ্ধ হলে মন্ত্রপূত সত্ত্বার ন্যায় অবনত চিত্তে শীরধার্য অভিলাসে গ্রহণ করে। তবে মানব আচার আচরণ, ভবিষ্যত বংশধর ও জনসাধারণের মঙ্গল সাধনে সমর্থ হলে বলা যেতে পারে যে, তার অভিব্যক্তি চরম স্বার্থকতা লাভ করেছে। আর তখন তা বাঙালিরা সানন্দে গ্রহণ করে। নববর্ষ উদ্যাপন তার বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক সত্ত্বায় এমন একটি অধ্যায় সংযোগ করেছেÑযার দার্শনিক তাৎপর্য বহুলাংশে সুদূর প্রসারী। ধর্মীয়, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক এই ত্রিবিধ বৈষয়্যিক প্রযুক্তি সমুন্নতভাবে প্রমাণ করেছে। দার্শনিক স্পেন্সার বৈজ্ঞানিক ডারউইন এবং মনুসংহিতার ঋষিগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের সাদৃশ্যমূলক মতামত ব্যক্ত করেছেন। বাঙলার নববর্ষ বাঙালির জীবনের সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। জীবন নিয়ন্ত্রক এবং বাঙালির চলার পথের পথ প্রদর্শক। একতা ও ঐক্যের শক্তিশালী সংগঠক। বলা বাহুল্য বাঙালির কৃষ্টি ও সভ্যতা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভীত প্রস্তুত করে। আর সেই কৃষ্টি প্রদীপের আলোয় সুদীপ্ত মনোবল নিয়ে বাঙালি পদচারণা শুরু করে। হাটি হাটি পা পা করে চলতে চলতে একদিন এই দু:সাহসিক জাতি শেকড় থেকে শিখরে অবস্থান করে। সংযমী মনোবল ও একতাবদ্ধ প্রচেষ্টায় বাঙালির হৃত স্বাধীনতাকে পরাশক্তির হাত থেকে বা বাঙালির কৃষ্টিমূলে আঘাত হানার কালো হাত ভেঙে দিয়ে ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েÑ অনেক ত্যাগ তীতিক্ষা, মা-বোনদের সম্ভ্রম, ইজ্জত ও একনদী রক্তের বিনিময়ে প্রতিজ্ঞা পরায়ণ নিষ্ঠাবান বাঙালি জাতি সার্বিক প্রচেষ্টায় অশুভ শক্তির ভয়ার্ত রণতরী ডুবিয়ে দিয়ে স্বীয় স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। আবহমানকাল বাঙালিদের এই দু:সাহসিকতা ও বিজয়ের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কল্পনায় উপনীত হওয়া যায় যে, নববর্ষ অর্থাৎ কালবৈশাখী বায়ূর প্রবল উত্তেজনা বাঙালিচিত্তে মহাপ্রলংকারী ও সংগ্রামী চেতনার দানা বাঁধে। নিজেদের স্বাতন্ত্র স্বত্তাকে চির সমুন্নত ও টিকিয়ে রাখতে বদ্ধ পরিকর। প্রবল দুর্যোগের হুমকি দিয়েও হঠাৎ ঝড়ের হানাদারিতে নেমে আসে কালবৈশাখী। যেনো নতুন শ্বাসনদন্ড হাতে বাঙলার নৈসর্গিক মঞ্চে নবনির্বাচিত শাসকের প্রবেশ। ধারণা করা যায়, বাঙালি ঐতিহ্যের নববর্ষের মিলন মন্ত্রই বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্ত বুনিয়াদ প্রস্তুত করেছেÑ যা তাদের সর্বদা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আর তার ফলশ্রুতি স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালির স্বতন্ত্র সংস্কৃতি চর্চার অভয়াস্থল। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙলার নববর্ষ বাঙালির উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া প্রাণের উৎসব। এই উৎসবে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বাঙালিরা অংশগ্রহণ ও উদ্যাপন করে। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও বাঙলার নববর্ষ ১৪২৩ ১লা বৈশাখ উদ্যাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সর্বত্র জনগণ বিভিন্ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। সাতক্ষীরার পুলিশ লাইনেও ১ থেকে ৩ বৈশাখ পর্যন্ত মনোজ্ঞ বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রস্তুতি পর্বের তথ্য বিভিন্ন লোকাল ও সরকারি পত্রিকায় প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের আয়োজনে ও বেসরকারিভাবে অনেক এলাকায় এই প্রস্তুতি পর্ব শেষ হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমী, চলচ্চিত্র, বেতার কেন্দ্র, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এ সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার ও সম্প্রসারণ করে থাকে। নববর্ষ উৎসবে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এ মেলায় পুতুল নাচ, লাঠি খেলা, সাপ খেলা, জাদু প্রদর্শনী, সার্কাস, ঘোড় দৌড়, ঘুড়ি উৎসব, নাচগান, যাত্রাপালা ইত্যাদি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিবছর বাংলাদেশের অনেক জায়গায় সাড়ম্বরে ও উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদ্যাপন হয়। ঢাকার রমনা বটমূলে প্রতিবছর আকর্ষণীয় এই উৎসব অতিসায়িক সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা সর্বস্তরের জনগণ এতে অংশগ্রহণ করে। এই ধরণের আড়ম্বরপূর্ণ নববর্ষ বা বৈশাখী মেলার অনুষ্ঠান দেশের আরো অনেক স্থানে উদ্যাপিত হয়ে থাকে। পর্যটক ও বিদেশীরা বাঙালির এই নববর্ষ অনুষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বাঙালির সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। দীর্ঘ সময় ব্যাপী এই অনুষ্ঠান তথা দেশের সর্বত্র পালিত অত্যাবশ্যকীয় এই উৎসব বাঙালির মনন ও চেতনাকে সচেতন, জাগ্রত করে সংস্কৃতির দার উন্মোচন করে। অনেক কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও শিল্পী তাদের মননশীল সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটায়। ফলে বাঙালির সংস্কৃতির অঙ্গনে সম্ভাবনার নতুন ফসল ফলে এবং সংস্কৃতিকে আরো অধিকতর যুগোপযোগী ও ফলপ্রসূ করে তোলে। সংস্কৃতির নন্দন কাননে প্রস্ফুটিত হয় হরেক রকম সুগন্ধী ফুল। আর সেই ফুলের সৌরভে বাঙলার প্রকৃতি, বাঙলার বায়ূ মুখোরিত হয়, বাঙলার দিগন্ত মেতে ওঠে নববর্ষের উদ্বোধনী সংগীতে। শিহরন জাগে নবপল্লবে। বিকোশিত অন্তর।

নববর্ষের আবির্ভাবে প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রান্তর সবুজের সমারোহে ভরে ওঠে পাখির কলকাকলিতে তরুরাজি, বনাঞ্চল মুখোরিত উল্লাসিত। যেনো পক্ষীকূল নববর্ষকে সাদর সম্ভাষণ জানায়। ¯্রষ্ঠার কাছে যেনো নববর্ষের আগমনি বার্তা সানন্দে পৌঁছে দেয়। সমগ্র বাঙলা জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালির আশা আকাঙ্খাকে লালন করে বৈষায়িক সুখ, শান্তি ও প্রগতির পথকে সুগম করে। গড়ে তোলে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও সম্পর্কের শক্ত সেতু বন্ধন। বাঙালির কৃষ্টি সভ্যতা ও সংষ্কৃতির অন্যতম উৎসব বাঙলার নববর্ষ উদ্যাপন। এর ফলে প্রত্যক্ষণ ভিত্তিক বধিবাদের জন্ম হয়। প্রত্যক্ষ বোধশক্তির কল্যাণে মানুষ তার আচার আচরণ বা তার উৎস্য বা ভাবাবেগের নৈতিক মূল্য উপলব্ধি করতে পারে। নববর্ষ উদ্যাপন ও তার সুফল যেনো বাঙালি জাতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়ে জাতিসত্ত্বার মিলন অর্ঘ্য বিশ্ববাসীকে দান করলো। কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ জাতি যেনো সেই অর্ঘ্যরে অমৃত স্বাদ গ্রহণ করলোÑবাঙালি জাতি বিশ্ব সভ্যতায় পরিচিতি লাভ করে হয়ে উঠলো গৌরবান্বিত। নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালি কৃষ্টি সভ্যতাকে অনুপ্রাণিত করে ও গৌরবান্বিত বাঙালি জাতিকে প্রগতির, সমৃদ্ধির পথ ত্বরান্বিত করে। নববর্ষ বাঙালি জাতীয় সত্ত্বার আশির্বাদ স্বরুপ।

নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালির নৈতিক চেতনাকে সজাগ ও জাগ্রত করে। নৈতিক চেতনা মানুষকে তার মুক্ত কাজের সংকল্প সম্পর্কে সচেতন করে। নৈতিক চেতনার কল্যাণে মানুষ তার সবরকম সম্ভাব্য কাজের নৈতিক মূল্য বিবেচনা করে বিশেষ একটি কর্মধারা নির্বাচনে সক্ষম হয়। নৈতিক চেতনা মানুষকে তার শ্রেষ্ঠ কর্মপন্থা নির্বাচনের মাধ্যমে আকাঙ্খিত আদর্শলাভে সহায়তা করে। সংকল্প মানুষের আকাঙ্খাকে নিয়ন্ত্রণ করে আদর্শ বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ করে।

বাঙালিরা নববর্ষ পালনের উপাসক। সারাবছর ব্যাপী উপাসনা করে অবশেষে ফিরে পায় নতুন বছরের একটি দিন পহেলা বৈশাখ। আর এই দিনটিকে সকল বাঙালি প্রাণের অর্ঘ্য দিয়ে উপাসনা করে। উপাসনা মানুষের মনের জঞ্জাল ও আবিলতার দহন করে তার কুপ্রবৃত্তি সমূহকে রূহানিয়াতের পরশে পুত ও পবিত্র করে। আরবি ভাষায় উপাসনাকে সালাত বলা হয়। উপাসনা বা সালাত মানুষকে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভে সহায়তা করে। মানব মনে অসীমের প্রতি যে সহজজাত আকর্ষণ আছে, সত্য সুন্দর কল্যাণের উৎস্য ঈশ্বরের প্রতি যে স্বত:স্ফুর্ত সান্নিধ্য লাভের স্পৃহা বর্তমান উপাসনা তারই বহি:প্রকাশ। সকল অশুভ শক্তির কবল হতে মুক্তিলাভের মানসে এক পরম প্রিয় মহান স্রষ্টার আশ্রয় লাভের আকুতি তার অনন্ত কৃপার (রহমতের) পূর্ণ সলিলে ¯œাত হয়ে জীবনের মহতী উদ্দেশ্যকে ফলবতী করার ব্যকুলতা, জীবনের সকল অপূর্ণতা নিরসন করে পূর্ণতার পথে বলিষ্ঠ পদসঞ্চারণের আকুল বাসনা।

বিশ্ব জগতের মধ্যে ¯্রষ্টার মহিমা কীর্ত্তনের যে ঐক্যতান চলছে তার সাথে নিজেকে একীভূত করতে হলেও উপাসনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। উপাসনাপ্রিয় বাঙালির মননসত্ত্বার অন্যতম আকর্ষণ নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যে দিয়ে যেনো স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছানোর পথ সুগম হচ্ছেÑকারণ পৃথিবীর সবকিছু গুণগান তারই ইচ্ছায় এবং তার প্রতি। পক্ষীর কুজনে, সাগরের কলতানে, তটিনীর কুল কুল ধ্বনিতে, বনের পত্র মরমরে, পুষ্পের সৌরভে, বায়ূর হিল্লোলেÑএক কথায় জড় চেতনের সর্বত্র ¯্রষ্টার গুণগান পরিকীর্তিত হচ্ছে। আর এই গুণগানে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং ¯্রষ্টা যেনো তার সৃষ্টিকে রক্ষা করে চলেছে। নববর্ষ উদ্যাপন সেই ইঙ্গিত ধর্মী শুভ নির্দেশনা।

উপসংহারে বলা যায়, নববর্ষ নতুন আয়োজনে সবকিছু যেনো সাজিয়ে গুছিয়ে বাঙলার প্রকৃতিকে ‘রূপের রাণীতে’ পরিণত করে। বাঙালি মানসে সৃষ্টিকর্তার অসীম মহিমার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাঙালির ভাগ্যাকাশে নতুন সূর্য উদয় হয়। আর সেই নব সূর্যের রক্তিম আভায় জাতীয় জীবনে সুখ সমৃদ্ধি ও কল্যাণমুখী পথের দিশা পায়। নববর্ষ বাঙালির মানস চেতনায় কামনার ফল। তাই নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালির চেতনায় সার্থক ও সফল। বাঙলার নববর্ষ বাঙালির উপাসনালয়, অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদের উন্মুক্ত মঞ্চ। নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালির দেশপ্রেম ও অকুণ্ঠ ভালোবাসার নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে।  লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত, সাতক্ষীরা