বঙ্গবন্ধু-১ নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য


প্রকাশিত : এপ্রিল ১৯, ২০১৮ ||

 

শরিফুল ইসলাম

স্পুটনিক উপগ্রহ রাশিয়া কক্ষপথে রাখে ১৯৫৭ সালের অক্টোবর। মহাকাশ উৎসবের সূচনা সেই দিনই। ৮৩ কেজি ওজনের কৃত্রিম উপগ্রহটি পৃথিবীর ২৫০ কিলোমিটার উপরে পাক খেয়েছিল। তার ২০ আর ৪০ মেগাহাৎজের দুটি ট্রান্সমিটারের পাঠানো বেতার তরঙ্গ পৃথিবীর সব রেডিওতেই শোনা গিয়েছিল। আয়নোস্ফিয়ারের অনেক তথ্যও মিলেছিল। তাকে ওপরে তুলেছিল আর রকেট। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি সেটিকে ধ্বংস করে ফেলার এক মাস পর স্পুটনিক মহাকাশে নিয়ে যায় রুশ সারমেয়লাইকাকে। তার বেঁচে থাকাতেই বিশ্বাস হয় মানুষও থাকতে পারবে মহাকাশে। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন পৃথিবীর কক্ষপথ পরিক্রমা করেন। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় ভারতীয় উপগ্রহ আর্যভট্ট মহাকাশে যায়।

বাংলাদেশের বয়স তখন মাত্র চার বছর। পাকিস্তানের আগ্রাসনে ব্যতিব্যস্ত বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান আততায়ীর হাতে নিহত। মৃত্যুতেই তাঁর পুনর্জন্ম। পিতার আদর্শে সঞ্জীবীত কর্মযুদ্ধে অক্লান্ত, তাঁর কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাবার নামে বঙ্গবন্ধু কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে তৈরি। দেশের যোগাযোগ আর সম্প্রচারে যার ভূমিকা হবে অসীম। এটি আমাদের দেশে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করবে, আবহাওয়ার গতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে, ঝড়ের গতিবেগ পথ নির্ণয় করে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে। অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট ব্যবহারের জন্য যে পরিমাণ খরচ হয়, তা কমিয়ে আনা যাবে, অর্থাৎ ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় কমবে। টিভি এবং রেডিও ব্রডকাস্ট আরও দ্রুত এবং মসৃণ হবে। ঐউ কোয়ালিটি বাড়ানো যাবে। নিজস্ব স্যাটেলাইটের জন্য ইন্টারনেটের গতি আরো বাড়বে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত ডাটা পাঠানো যাবে, যোগাযোগ ব্যবস্থাও হবে দ্রুততর। ভূমি সমুদ্রে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে সহায়তা করবে।

২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সম্প্রচার টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ প্রকল্প। এটি ডাক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরির পুরো কর্মযজ্ঞটি চলেছে বিটিআরসির তত্ত্বাবধানে। তিনটি ধাপে নির্মাণকাজ চলছে। এগুলো হলো স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রাশিয়ার ইন্টার স্পুটনিক থেকে ১১৯. ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের আর বি টাল স্লট কিনেছে বাংলাদেশ। যার উৎক্ষেপনের খরচ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা নিজেদের তহবিল থেকে এবং বাকি হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্র, এইচএসবিসি ফ্রান্স, জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল, সিডব্লিউজি গালফ ইন্টারন্যাশনাল অব ইউকে এবং চায়না গ্রেটওয়াল ইন্ড্রাস্ট্রি করপোরেশন প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে। আশা করা যায়, মাত্র তিন থেকে ছয় বছরেই এই স্যাটেলাইট পাঠানোর সকল খরচ উঠে আসবে।

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া যাবে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার; যার ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের ১৪টি সি ব্যান্ডের। এসব ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে অব্যবহৃত ২০ টি ট্রান্সপন্ডার নেপাল, ভুটান মিয়াানমারের মতো দেশে ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ আয় করা যাবে। যা আমাদের দেশের টাকা এবং কষ্টার্জিত মুল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধুএর মূল অবকাঠামো তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস নামের একটি মহাকাশ সংস্থা অবকাঠামো তৈরির এই কাজটি করেছে। কিন্তু মহাকাশে যায়নি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। ঠিক ছিল, গত বছর বাংলাদেশের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর এটি উৎক্ষেপন করার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজি নন। তিনি চান আরও আগে। এমনিতে তাঁর অভিধানেকালবলে কোনও কথা নেই। সবই আজ। মহাকাশ জয়ের সূচনা তিনি আগেই করতে চান। বিজয় উৎসবের দিন তিনি ব্যস্ত থাকবেন অন্য আনুষ্ঠানিকতায়। সেটা মেনেই টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম চারটে দিন ঠিক করেছিলেন। তার থেকেই শেখ হাসিনা উৎক্ষেপনের দিন বেছে নেবেন। কিন্তু তাসম্ভব হয়নি। তখনও বঙ্গবন্ধু এর অবকাঠামো তৈরির কাজ শেষ হয়নি। পরে সেটি জানুয়ারি হয়ে ৩০ মার্চ করা হয়। সেটিও পিছিয়ে ২৪ এপ্রিল। এস্পেসএক্সের ওয়েবসাইটে সেটিই বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ সময় মে ভোরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দিনই সন্ধ্যায় দেশজুড়ে উৎসব আয়োজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

সূত্রে জানা যাচ্ছে মে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সেরফ্যালকনরকেটে করে ২২ জনের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হবে। স্যাটেলাইট ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) তৈরি করা হয়েছে।

বিটিআরসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিআরএনবির সদস্যদের উপস্থিতিতে টিআরএনবি সভাপতি রাশেদ মেহেদী সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তব্যে জানানবাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। গত ২৮ মার্চ সেটি ফ্রান্স থেকে ফ্লোরিডায় নেওয়া হয়। তার পরেই শুরু হয়েছে পরীক্ষা। স্যাটেলাইটটির পরীক্ষানিরীক্ষা বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে বলে খবর পেয়েছেন। উৎক্ষেপণের দিন থেকে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের জন্য বরাদ্দ করা ১১৯ দশমিক ডিগ্রি পূর্ব গ্রাঘিমায় পৌঁছাতে আট দিন সময় লাগবে। তারপর তিন মাসের পরীক্ষা শেষে বাণিজ্যিকভাবে স্যাটেলাইটটি ব্যবহারের উপযোগী হবে।

বঙ্গবন্ধু এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ : সংস্থা: মহাকাশ গবেষণা দূর অনুধাবন কেন্দ্র (স্পারসো) বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, প্রধান কনট্রাক্টর: স্পারসো, বাংলাদেশ, স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (পরামর্শক), বাস: স্পেসবাস ৪০০০, মিশনের ধরণ: যোগাযোগ, উৎক্ষেপণ স্থান: জিচ্যাং স্যাটেলাইট লঞ্চ সেন্টার, অভিযানের ব্যাপ্তিকাল : ১৫ বছর, ভর: ,৩০০ কেজি (,৯০০ পাউন্ড), ক্ষমতা: ,৬০০ ওয়াট, উৎক্ষেপণের তারিখ: মে ২০১৮ (সূত্র: এস্পেসএক্সের ওয়েবসাইট)

আমরা ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ সরকারকে দেশবাসির জন্য এমন যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর মাধ্যমে আমরা জানাতে পারবো বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তিতে কতটা অগ্রগামী হয়েছে। তথ্য সংগ্রহে: শরিফুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী