মহান মে দিবস


প্রকাশিত : এপ্রিল ৩০, ২০১৮ ||

 

সুদয় কুমার মন্ডল

মে দিবস বিশ্ব শ্রমিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অতীব তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক সার্বজনীন শ্রদ্ধা প্রকাশের দিন। বঞ্চনা নির্যাতন বৈষম্যের বিরুদ্ধে বীরোচিত সংগ্রাম শ্রমজীবি মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত স্মৃতি বিজড়িত গৌরবময় দিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। এদিন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সভা সমাবেশ এবং র‌্যালির মাধ্যমে শ্রম অধিকার দিবসের সচেতনা বৃদ্ধির চেষ্টা করে। স্লোগানে মুখরিত রাজপথ।

তাৎকালে বুর্জোয়াদের নির্দেশ মত বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত শ্রমিকদের (নারী শিশুসহ) কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। শিল্প কলকারখানায় প্রতিদিন তাদের ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত সময় কাজ করতে হতো। শ্রমিকদের শারিরীক সুবিধা অসুবিধার প্রতি কোন লক্ষ্য না রেখে বরং জোর পূর্বক কাজ আদায় করে নেওয়া হতো। শ্রমিকরা কাজ করতে করতে মারা গেলে বুর্জোয়ারা দায়ী থাকে না। শিল্পপতি বা কল কারখানার মালিকগণ কোন ক্ষতিপূরণ এমনকি সমবেদনা জ্ঞাপন করতো না। শ্রমিকদের বিনোদনের কোন  সুযোগ ছিলো না। তাদের মজুরি এত কম দেওয়া  হতো যে তাদের দিন আনা দিন খাওয়া ছিলো। তাদের দৈহিক নির্যাতন করা হতো। বুর্জোয়াদের অমানবিক নিষ্ঠুরতা বর্বরতা রোধ করার জন্য এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে শ্রমিকরা আন্দোলন মুখর হয়ে উঠে। জীবন বিপন্ন করে তারা  তাদের আন্দোলন তীব্র গতিতে অব্যাহত রাখে। বুর্জোয়ারাদের শোষণ দু:শাসন থেকে মুক্তির মানসে শ্রমিকদের বিবেক সচেতনতা উদ্বেলিত করেছিল। নিয়েছিল তারা প্রতিজ্ঞাপরায়ন মনে শক্ত অবস্থান।

উদ্দেশ্যে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক নেতা স্পীজএর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হয়ে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বীরোচিত আন্দোলনের ডাক দেয়। তাদের মৌলিক দাবি ছিলো যথা :-

মিল, কলকারখানাগুলোতে শ্রমিকদের দৈনিক ১৬ ঘন্টার স্থলে ঘন্টা শ্রম নির্ধারণ।

চাকরি শেষে এককালীন আর্থিক অনুদান প্রদান। জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য নূন্যতম মজুরী প্রদান।

শ্রমিকদের আইনগত নিরাপত্তা স্বাস্থ রক্ষা সংক্রান্ত।

শিশু শ্রম বিলোপ। শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ। সপ্তাহিক এক কর্মদিবস পরিপূর্ণ ছুটি নির্ধারণ।শ্রমিক সংগঠন অনুমোদন। কালেকটিভ বারগেইনিংসহ বিভিন্ন যৌক্তিক আইনগত অধিকারের দাবি ক্রমে ক্রমে শ্রমিক আন্দোলনের গতি অধিকতর তীব্র বেগবান করে তুলেছিলো। এক পর্যায়ে ১৮৮৬ সালে মে সন্ধ্যয় শিকাগোর হে মার্কেটে হঠাৎ আন্দোলনরত বিক্ষুব্ধ জনতার উপর অতর্কিত বোমা বিস্ফোরিত হয়। ফলে আন্দোলনকারীরা অনেকে হতাহত হয়। পুলিশও আন্দোলনকারীদের মধ্যো সংঘর্ষ বাধে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে আন্দোলনরত শ্রমিক জনতার উপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। ফলে ১১ জন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলে মারা যায় এবং অসংখ্য লোক হতাহত হয়। শ্রমিক পুলিশ ভীষণ সংঘর্য হয়। শ্রমিকরা কিছু পুলিশ হত্যা করে। চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। সংগ্রামী অকুতোভয় জনতা পিছু হটেনি। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন শাসক কর্তৃক পুলিশ হত্যার অভিযোগে শ্রমিক নেতা স্পীজসহ জন অভিযুক্ত হয় এবং জনের প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অবস্থা যদিও বেগতিক তবুও বিভিন্ন রাজনেতিক সংগঠন শ্রমিক আন্দোলনে শরীক হয়ে তাদের সহযোগিতা করেছিলো। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ১৪ জুলাই প্যারিসে অবস্থিত সমাজতন্ত্রীদের ঐকান্তি প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় আর্ন্তজাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে পহেলা মে আর্ন্তজাতিক শ্রম দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতি ক্রমে গৃহিত হয়।

১৮৯০ খ্রি: প্রথম মে দিবস বা আর্ন্তজাতিক শ্রম দিবস পালন (ওখঙ) আই এল কর্তৃক দৈনিক ঘন্টা কাজের দাবিকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। অন্যান্য দাবিগুলোও পর্যায়ক্রমে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ফলে বিশ্বে শ্রমিকদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়।

১৮৯৩ সালের ২৬ জুন ইলিনয়ের গর্ভনর কর্তৃক জনকে নিরাপরাধ বলে স্বীকার শ্রমিকদের উপর হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং তাদের যাবতজীবন নির্বাসন দেওয়া হয়।

অত:পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মে দিবস পালন করতে শুরু করে। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় ৮০টির মতো দেশে পহেলা মে জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে পালন করে। বঙ্গ দেশে ১৯৩৮ সালে নারায়নগঞ্জে মে দিবস পালিত হয়। পহেলা মে উপলক্ষে তৎকালিন পাকিস্থান আমলেও মে দিবস পালিত হয়। ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণায় মে দিবস পালিত বা উদ্যাপিত হয়।

ভারতে মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে মাদ্রাজে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডা মে দিবস পালন না করে শ্রম দিবস পালন করে সেপ্টেম্বরের ১ম সোমবার।  হয়তো এর ভিতরে কোন অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিরাজমান।

সর্বোপরি পহেলা মে আর্ন্তজাতিক শ্রম দিবস হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশে মে দিবস পালন উপলক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সমূহ স্ব উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং শ্রদ্ধাভরে দিনটি উদযাপন করে। শহীদ শ্রমিকদের উদ্দেশ্য যাবতীয় কর্মবিরতি পালন করে। প্রাণ উৎসর্গকৃত জীবনের স্মরণে প্রতিবছর ১মে সারাবিশ্বের শ্রমিকরা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়ে দিনটি উৎযাপন করে।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আর্ন্তজাতিক স্বৃকৃতির ফলশ্রুতি স্বরুপ বিশ্ব শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে পায়। তাই মহান মে দিবস নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়। সমগ্র বিশ্বের শ্রমিকদের নিকট দিনটির তাৎপর্য অপরিসীম।

ওখঙ আর্ন্তজাতিক সংগঠন এমন একটি সংস্থা যা যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রমিকদের ন্যয্য দাবি দাওয়া সংক্রান্ত বিষয় আন্তর্জাতিক  পর্যায় আলোচনা, পর্যালোচনা সিদ্ধান্ত প্রদান এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো। ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৮৭ সদস্য বিশিষ্ট আর্ন্তজাতিক শ্রমসংগঠন কমিটি গঠিত হয়। এই সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিলো শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করা এবং তাদের ভাগ্য উন্নয়ন করা। পরিচালনা কমিটির কর্ম পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা ছিলো। প্রোক্ত কমিটির ডাইরেক্টর বা পরিচালক নির্ধারিত সদস্যের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। তিনি অন্যন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দিতেন।

এই কমিটি ২৮ জন সরকারী প্রতিনিধি ১৪ জন প্রতিনিধিত্বমূলক কর্মচারী, ১৪ জন শ্রমিক প্রতিনিধি আরো চার জন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলন জেনেভা শহরে অনুষ্ঠিত হয়। এই সংস্থাটি ১৯৬৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কৃত হয়। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে শ্রম আইন প্রাধান্য পায়। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। বিশ্ব শ্রমিকরা তাদের দূর্দশার দিনগুলির অবসান ঘটিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে উন্নত জীবন যাপনের পথ প্রশস্থ হয়।

পরিশেষে ১৮৮৬ সালের ১মে শ্রমিকদের দাবির বিনিময় প্রাণোৎসর্গীকৃত সে সব শ্রমিকদের মহান স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা অভিনন্দন। লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত সাতক্ষীরা।