সিয়াম সাধনা: অপচয় ও অপব্যয় দুটোই নিষিদ্ধ


প্রকাশিত : জুন ২, ২০১৮ ||

সাখাওয়াত উল্যাহ: আজ ১৬ রমজান শনিবার। মহান আল্লাহর কাছে লাখ শুকরিয়া আমরা মাগফিরাতের দশকে অবস্থান করছি এবং কঠোর তাকওয়ার অনুশীলন করে মহান প্রভুর সন্তুুষ্টির জন্য সিয়াম সাধনা করছি। এ বরকতপূর্ণ মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে অর্থাৎ তারাবীহ, সাহারী, ইফতার, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা, রোজাদারের আচার-আচরণসহ অসংখ্য বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা এবং তার প্রিয় হাবীব আমাদেরকে শিখিয়েছেন।
ইফতারের আদব: খেজুর দ্বারা ইফতার করা মোস্তাহাব। যদি খেজুর না থাকে তাহলে ঘরে যা আছে বা তৈরি হয়েছে পানি, চিড়া, ভাত, বিস্কুট, শরবত ইত্যাদি দিয়ে ইফতারে বাঁধা নেই। মাগরিবের পূর্বে ইফতার সাজিয়ে সামনে বসে অপেক্ষা করা মোস্তাহাব। বান্দার এই অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। বান্দা আল্লাহর এতই অনুগত যে, তার হুকুম ছাড়া একফোটা পানিও নিচ্ছে না। ইফতারের এই পূর্ব মুহূর্তে বান্দা তাকওয়ার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করে। প্রভুর মিলনের অপেক্ষায় যেন তার এই অপেক্ষা। এজন্য রোযাদার ব্যক্তির পুরস্কার অতুলনীয়। ইফতারের এই মুহূর্তটি হচ্ছে দোয়া কবুল হওয়ার মুহূর্ত। এ মুহূর্তে বান্দা যা চাইবে আল্লাহ তাকে তাই দিবেন।
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) মাগরিবের নামাজের পূর্বে কয়েকটি তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না থাকতো শুকনা খেজুর দ্বারা করতেন। যদি শুকনা খেজুর না থাকতো তবে কয়েক কোশ পানি পান করতেন। (আবু দাউদ ও তিরমিযী)
ইফতারের খাবার: আমরা ইফতারের বহু জিনিষ খাই। আমাদের দেশে সাধারণত ছোলা, মুড়ি, পেয়াজু, বেগুনী, চপ, হালিম, জিলাপী, কাবাব, খিচুড়ীসহ ভাজা পোড়া জাতীয় খাবার দ্বারা ইফতারী করা হয়। মনে হয় যতো বেশি খাওয়া যায় ততোই ভাল। ডাক্তারী মতে এসব ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার রোজাদারের জন্য মোটেই উপযোগী নয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ইফতারের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, অর্থাৎ ‘তোমরা খেজুর দিয়ে ইফতার করো, কেননা তাতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না থাকে তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করো। পানি পাক পবিত্র।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দুইটি খাবারের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য কোন খাবারের কথা উল্লেখ করেননি। কেননা এতে অনেক উপকার ও স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। রোজাদারের শরীরে রোজার কারণে খাদ্য ও পানীয়ের অভাব দেখা দেয়। সুগার জাতীয় খাবার শরীরে অপেক্ষোকৃত দ্রুত মিশে যায় এবং শরীর পাকস্থলী কিংবা অন্ত্রনালী থেকে তা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে। গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যে, খেজুরের এই বৈশিষ্ট্য সর্বাধিক। তা রক্তে সুগারের পরিমাণকে দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌছাতে পারে। ফলে, শরীরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর হয়। খেজুরে রয়েছে প্রচুর সুগার। শরীরের উপর খেজুরের পাশর্^ প্রতিক্রিয়া খুবই কম। তাছাড়াও তাতে প্রচুর ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান রয়েছে। হাদীস অনুযায়ী খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম। তবে পানি যদি ফলের রস কিংবা শরবত আকারে হয় সেটাও ভাল। যাতে করে শরীর প্রয়োজনীয় সুগার গ্রহণ করতে পারে।
অথচ আমরা দেখছি, আমাদের চারপাশে ইফতারে আইটেম বৃদ্ধি করার জন্য প্রতিযোগিতা চলছে। সারাদিন রোজা পালন করার পর ইফতারিতে রোজাদারের সামনে ২০ থেকে ২৫টি আইটেমের ইফতারি দেওয়া হয়। যার মধ্যে থাকে ছোলা, বেগুনী, চপ, খেজুর, ডিম, আম, জাম, জামরুল, আঙুর, আপেল, কমলা, কলা, কাঠল, তরমুজ, জিলাপি, খেরাই, খেজুর, লিচু, মুড়ি, ফিরনি, কাবাব, তিহারী, বোরহানী ও শরবত আরো কত কি। যা রোজাদারের জন্য গ্রহণ করা দারুণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। যে, কারণে রোজদার সামান্য আহার গ্রহণ করে রেখে দেয়। যা অপচয়ের শামিল। রোজাদারের খাবারটি অন্য কোন রোজাদার খেতে পারছেনা বা অভুক্ত কোন ব্যক্তিকেও দেওয়া যাচ্ছে না ফলে তা ফেলে দেওয়া হয়। যা অপচয় ও গুনাহের শামিল।
অপচয় ও অপব্যয়: ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপনতা যেমনভাবে দূষণীয়, অনুরুপভাবে অপব্যয় এবং অপচয় দূষণীয়। আরবিতে অপচয়কে বলে ইসরাফ আর অপব্যয়কে বলে তাবযীর। শরীয়তের পরিভাষায় বৈধ কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করাকে ইসরাফ বা অপচয় বলে। আর অবৈধ কাজে ব্যয় করাকে তাবযীর বা অপব্যয় বলে। ইসলামে এ দুটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক সুরা বনী ইসরাইলে বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দান করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালন কর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার এবং তার নিয়ামত যথাযথ ভাবে ব্যয় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।