দুর্যোগেও সাংবাদিক আবদুল মোতালেব

সুভাষ চৌধুরী
বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে সংবাদের বহুমুখিতা। আকাশচুম্বী প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে। সাংবাদিকতায় বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এসেছে। প্রচার বেড়েছে। কিন্তু তার মর্যাদা কতোটা বেড়েছে তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে অনেক চৌকস মেধাবী ও সাহসী সাংবাদিক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও অনেকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। আজকাল পত্রিকা সম্পাদনার সাথে যুক্ত হয়েছে পত্রিকার ব্যবস্থাপনারও দায়িত্ব। ক্ষেত্র বিশেষে কলমের শক্তি থাকুক না থাকুক ব্যবস্থাপনায় কৃতিত্ব দেখাতে পারলে তিনি একজন বড় সম্পাদক এবং সেরা সম্পাদক বলে মনে করে আজকের সমাজ। আগে পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বে এতোসব ছিল না। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ছিল না চোখ ধাধালো চাকচিক্য।
সাতক্ষীরার প্রয়াত সম্পাদক আবদুল মোতালেবের মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি লেখা লিখতে বসে এই অভিভাবক সম্পাদকদের কথা মনে আসছিল বারবার। স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই জাগরন সত্ত্বেও প্রয়াত সম্পাদকদের মতো কোনো সম্পাদক যেনো একটি ইন্সটিটিউট হয়ে উঠতে পারছেন না। তারা বিত্ত বৈভবের মধ্যে কাটাচ্ছেন বেশ। যোগ্যতার মাপ কাঠি এখানে মূল্যহীন।
পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের তিন ক্ষণজন্মা সম্পাদক কেবল মাত্র আমাদের সাংবাদিকতাকে সুউচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন নি, তারা প্রগতিশীল চেতনা ও সমাজ সংস্কৃতিকে পুন:নির্মাণ করে গেছেন। এরা হলেন দৈনিক ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, দৈনিক সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরী ও লুপ্ত ইংরাজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজার্ভারের আবদুস সালাম। তাদের সমসাময়িক সম্পাদক তোয়াব খান এখনও সংবাদপত্রে নিবেদিত বৃদ্ধ প্রাণ হিসেবে দৈনিক জনকন্ঠে কাজ করে যাচ্ছেন। আর তাদেরই পথ অনুসরণ করেছেন সমকালের গোলাম সারওয়ার, লুপ্ত দৈনিক বাংলার প্রয়াত আহমেদ হুমায়ুন, দৈনিক জাগরণের আবেদ খান, প্রথম আলোর মতিউর রহমান ও বিলুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রয়াত সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী।
এসব প্রসঙ্গ আসছে এ কারণে যে প্রয়াত সাংবাদিক সম্পাদক সাতক্ষীরার ক্ষণজন্মা পুরুষ আবদুল মোতালেব ছিলেন বিত্ত বৈভবের উর্ধে। তার মুক্ত বিচরণ ছিল সাধারণ জনারণ্যে। ভাবনা চিন্তা ছিল তাদের নিয়ে। তাদের লেখাপড়া, চাকুরি, পারিবারিক সংকট এসবের পাশাপাশি যা তিনি ভাবতেন তা হলো একটি শিক্ষিত আলোকিত সমাজ গড়ে তোলা। এর সাথে সর্বোতভাবে জড়িত নারী জাগরণ সৃষ্টি, নারী শিক্ষার উত্তরণ। সুতরাং তিনি ভাবেননি বিত্ত বৈভবের মধ্যে কাটানোর কথা। বরং ভেবেছেন দুর্যোগ পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা। তাদের হাতে ত্রাণ সম্পদ তুলে দেওয়ার মধ্যে নিজেকে জড়িত রাখতে খুবই আগ্রহী ছিলেন তিনি। অবনত মস্তকে বলতে চাই পঞ্চাশের দশকের সেই তিন ক্ষণজন্মা সম্পাদকের কাতারে তুলনীয় আবদুল মোতালেবও, যিনি নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলনে।
পত্রিকায় প্রকাশিত একজন বিদেশী সাংবাদিকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলতে চাই ‘বাংলাদেশের সংবাদপত্রের একটি বিশেষ ভূমিকার প্রশংসা করতে হয়। কারণ স্বাধীনতার পরও দেশটির পার্লামেন্ট সঠিক অর্থে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আর সেই অভাবটি পূরণ করেছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র’। বিদেশী সাংবাদিকের এই মন্তব্য আমাদের সাংবাদিকতাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত করেছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায় বাংলাদেশে অনেক সম্পাদক সাংবাদিক রয়েছেন যারা সাংবাদিকতার পেশার আড়ালে লুকিয়ে থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুবিধা আদায় করতে চান। যারা ইচ্ছা অনিচ্ছায় আপত্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ করে ক্ষমা চান। ওই তিন সম্পাদকের সাথে সাতক্ষীরার আবদুল মোতালেবকে জড়িয়ে বলতে চাই তারা কেউই ক্ষমাপ্রার্থনাকারী সম্পাদক বা সাংবাদিক ছিলেন না। আর এ কারনেই তারা সংবাদ জগতে চির উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
সাংবাদিক সম্পাদক আবদুল মোতালেবের পদচারণায় এদেশের সাংবাদিকতা, সাংবাদিক সংগঠন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ অনেকটাই পেয়েছে পরশ পাথরের ছোঁয়া। তাঁর দ্যুতির উচ্ছ্বলতায় মানুষ জয় করেছে তার হৃদয়ের ভালবাসা। তিনি স্থান করে নিয়েছেন মানবের হৃদয়ে।
আজ সেই ২ জুন। এখন থেকে ১৬ বছর আগে এমনই এক প্রত্যুষে নিভে গিয়েছিল আবদুল মোতালেবের দ্যুতি। মৃত্যুর হিম ক্রেড়ে তার সেদিনের আত্মসমর্পন সাতক্ষীরার মাটিকে বিরান করে অভিভাবকহীন করে দিয়েছিল। কিন্তু দ্যুতির আলোক যে ম্লান হয় না কোনোদিন। শুধুমাত্র দৃশ্যমান হয় না অবয়ব। প্রজ্জ্বলিত হয়ে থাকে দীপ, ভাস্বর হয়ে থাকে তার সব কর্মযজ্ঞ। যেমনটি রয়েছে এখনও আবদুল মোতালেবের আশীর্বাদ নিয়ে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সংবাদ জগতে, সাংবাদিক সংগঠনে, দুর্যোগ পীড়িত গ্রামে।
শুধু সাতক্ষীরা নয় কেবলমাত্র এই অঞ্চলই নয়, আবদুল মোতালেবের দীপ শিখা আলোক রশ্মি ফেলেছিল সারা দেশে। একজন সফল সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসাবে তার অবাধ বিচরন এদেশের মানুষকে নতুন আলোর পথ দেখিয়েছিল। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার আদায়ে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই এই অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যে সব সাংবাদিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি। আর এই সমিতির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। সাংবাদিক সমাজের পেশাগত দাবি যেমন ওয়েজ বোর্ডসহ অন্যান্য দাবি আদায়ে সমসাময়িক আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন আবদুল মোতালেব। নেতৃত্ব দানে পারদর্শী, সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানোয় বিচক্ষন আবদুল মোতালেব তার কর্মনিষ্ঠার বলে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রয়াত এই সাংবাদিক নেতার কাছ থেকে বার বার শুনেছি যেহেতু সাংবাদিকতা একটি জনকল্যান ও সেবামুলক দায়িত্বশীল পেশা সেহেতু এর সাথে জড়িতদের জন্য একটি প্রটেকশন অ্যাক্ট প্রণয়ন জরুরি। কারণ কেবল বাংলাদেশে নয় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছে অনৈক্য, ঈর্ষাপরায়নতা, রাজনৈতিক মতবিরোধ ও শত্রুতা। এ অবস্থা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে অবিভক্ত সাংবাদিক সংগঠন ও প্রস্তাবিত প্রটেকশন অ্যাক্ট দরকার এই ধারনা থেকে তিনি সাংবাদিক সংগঠনগুলি মজবুত করে তোলার ব্রত গ্রহন করেন। তার সেই ব্রত থেকে গোটা বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ ও সংগঠন এখন বহুধা বিভক্ত। আর এ কারণেই বিচার বঞ্চিত হন নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর রুনি, যশোরের শামসুর রহমান কেবল, সাইফুল ইসলাম মুকুল, সাতক্ষীরার স. ম আলাউদ্দিন, খুলনার হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা, হারুনার রশীদ, বগুড়ার দীপংকর চক্রবতীর মতো প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সম্পাদক ।
তার জীবদ্দশায় আবদুল মোতালেব সাংবাদিকদের ঐক্য ও নিরাপত্তার ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। নিরলসভাবে কাজ করেছেন আর নবীন প্রবীন সব বয়সের মানুষকে সাংবাদিকতার পেশায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিপন্ন হলে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাও থমকে যায়। এই সত্যকে ধারন করে আবদুল মোতালেব সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন পেশাগত কাজে।
তার নিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক কাফেলাকে চার পৃষ্ঠার আয়তনের মধ্যেও মর্যাদার আসনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য তার চেষ্টায় এতোটুকু ত্রুটিও ছিল না। কিন্তু অকালে অসময়ে তার অপ্রত্যাশিত প্রস্থান দৈনিক কাফেলাকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে। মাথা তুলে আর এগিয়ে যেতে পারছে না কাফেলা। এ কারণে জনগণের নজরের বাইরেও পড়ে থাকছে পত্রিকাটি। আজ তার মৃত্যু দিবসে এ কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে তার রক্তঘামে প্রতিষ্ঠিত এক সময়ের জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত দৈনিক কাফেলাকে মর্যাদার আসনে ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার নীতিগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
শুধু সাংবাদিকতা নয় নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত এলাকায় তৃণমুল পর্যায়ে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ। সাতক্ষীরায় একটি পলিটেকনিক ইন্সিটিটিউট, সরকারি বিএড কলেজ, কৃষি কলেজ, ল’ কলেজ, এমনকি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। তার সেই দীর্ঘ লালিত স্বপ্নের অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে। অনেকটাই এখন বাস্তবায়নের দ্বার প্রান্তে। আবার আলোর মুখ দেখেনি অনেকগুলি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পুরোধাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে তার জাদুস্পর্শে জন্ম নিয়েছে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজ, নৈশ বিদ্যালয়, ছফুরেন্নসা কলেজ। এভাবে অগনিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে সেখানে চাকুরি দিয়ে তিনি বেকারত্ব দুরীকরণের পাশাপাশি শিক্ষিত ও আলোকিত সমাজ গঠনে ব্রতী হয়ে চিরস্মরনীয় হয়ে রয়েছেন। একজন রেডক্রিসেন্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই সংস্থার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শীর্ষ প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্বিপাকে ত্রাণ সহায়তার বহর নিয়ে সশরীরে হাজির হয়েছেন তিনি। মানুষকে অভয় দিয়েছেন। বলেছেন দু:সময়েও সাথে আছি। এভাবেই মাতৃভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানব সেবা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় নিরলস কাজ করেছেন আবদুল মোতালেব। শিক্ষিত করা, প্রভাবিত করা, অবহিত করা ও বিনোদন দেওয়া এই চার দায়িত্বের সব ক’টিই তিনি পুংখানুপুংখভাবে পালন করে একজন ক্ষনজন্মা মানুষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন নিজেকে।
সাংবাদিকতা স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সমাজ রাষ্ট্র ও দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো বিষয় পত্রিকার পাতায় তুলে না ধরার মধ্যে নিহিত রয়েছে দায়িত্বশীলতা। আর তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন প্রয়াত সাংবাদিক সম্পাদক আবদুল মোতালেব। কারণ এই পেশায় নাম লেখাচ্ছেন যারা তারা কেউ আসছেন নামের মোহে মোহাবিষ্ট হতে, কেউ সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে। আবার কেউ আসছেন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে। কেউ আসছেন সেবার লক্ষ্য নিয়ে, কেউ আসছেন কালো টাকা আড়াল করতে। আবার কারও কারও উদ্দেশ্য নিজের চরিত্রকে লুকিয়ে রেখে সব ধরনের সুবিধা আদায় করা। প্রয়াত সাংবাদিক আবদুল মোতালেব দুটি লক্ষ্যের অনুসারী ছিলেন। এক. সমাজ সেবা ও কল্যান। দুই. সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি। এই দুইই হওয়া উচিত সাংবাদিকতায় যারা আসতে চান তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
মানবাধিকার রক্ষায় তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা মানুষ। মানুষ যেখানে অসহায়, দুর্বল যেখানে বিপদাপন্ন, দারিদ্র্য যেখানে ডেকে আনে মানবিক বিপর্যয় সেখানেই ছুটেছেন আবদুল মোতালেব। এই মানবাধিকার চেতনা তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
এখনও স্কুল কলেজগুলিতে রয়েছে তার পদচিহ্ন। দুর্যোগ কবলিত এলাকায় রয়েছে হাতের পরশ। সংবাদ জগতে রয়েছে তার সাহসিকতার ঝান্ডা। প্রাত:স্মরনীয় এই মানুষটি তাই মরেও চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন তার কর্মযজ্ঞে, জনারন্যে, মাটি ও মানুষের হৃদয়ে। লেখক: জেলা প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি