আশাশুনির পল্লীতে গৃহবধুর আত্মহত্যা না পিটিয়ে হত্যা, জট খলতে শুরু করেছে


প্রকাশিত : জুন ১০, ২০১৮ ||

আশাশুনি ব্যুরো: আশাশুনির রাজাপুরে গৃহবধু মোসলেমাকে পিটিয়ে হত্যা না আত্মহত্যা এ নিয়ে জট খুলতে শুরু করেছে। শ্বশুর-শ্বাশুড়িসহ স্বামীর নির্মম নির্যাতনের পর মুমূর্ষ অবস্থায় তার মুখে বিষ ঢেলে হত্যা করা হয় বলে মোসলেমার পিতাকুল ও পাড়ার প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ। সরজমিনে ঘুরে জানাগেছে, উপজেলার আনুলিয়া রাজাপুর গ্রামের মইনুল খাঁর কন্যা মোসলেমা প্রেমজ সম্পর্কের টানে পিতা-মাতার অমতে একই গ্রামের আইয়ুব গাইনের পুত্র সোহাগ গাইনের সাথে বিগত পাঁচ বছর পূর্বে নিজেরাই বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিয়ের পর থেকে গৃহবধু হিসেবে মোসলেমা স্বামী গৃহে থাকলেও শ^শুর-শ^াশুড়ি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। গায়ের মেহেদি মুছতে না মুছতেই বিয়ের ৩ মাস পর থেকে শুরু হয় স্বামী সহ শ্বশুর-শ^াশুড়ির নির্যাতনের খড়োগ। একে একে যৌতুকের দাবীতে স্বামী, শ^শুর-শ^াশুড়ী ছোট-খাট অজুহাতে মোসলেমার উপর নির্যাতন চালাতে থাকেন। মোসলেমার পিতৃকূল বিষয়টি জানতে পেরে তার কোন রকমে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও তাদের বিয়েকে মেনে নিয়ে নির্যাতনের বিষয়টি স্থানীয় জন প্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে অনেকবার শালিশ বৈঠকে বসেছেন কিন্তু কিছু সময় শান্ত থাকলেও পুরো পুরি সুরাহা করতে পারেননি। বিভিন্ন সময় স্বামীর যৌতুকের চাপের কথা মেয়ের মুঠো ফোনে জেনে গত ২ রমজান তার মা জামাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। জামাই সোহাগ শ্বাশুড়ির নিকট মটরসাইকেল ও মোবাইলের দাবী করে বসে। সর্বশেষ গত ১৫ রমজান বেলা ১১টার দিকে বাড়ীর সামনে প্রকাশ্যে শ^াশুড়ি বউমাকে মারপিট করতে থাকে। তার ডাকচিৎকারে পরবর্তীতে সোহাগ, শ্বশুর ঘটনাস্থলে পৌছে ঠেকানো তো দূরে থাক উল্টো পাশের বেড়া থেকে গাছের ডাল ভেঙ্গে ও ঝাটা দিয়ে নির্মমভাবে মারপিট করতে থাকে। এক পর্যায়ে তার বুকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। মারপিট এতটা ব্যাপক ছিল যে, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মুমূর্ষ অবস্থায় তার মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয় বলে মোসলেমার পিতা মইনুল, মা ও ভাইরা এ প্রতিবেদকে জানান। তার ৩/৪ ঘন্টা পর বেলা ৩টার দিকে তারা মোসলেমার পিত্রালয়ে খবর পাঠায়। ৪টার দিকে স্থানীয় চিকিৎসক ডাঃ অরুনকে ডাকা হলে তিনি চেম্বারে নিয়ে বিকাল ৫ টার দিকে রোগী দেখেন। রাত্র ১২টার দিকে অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে রোগিকে সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গৃহবধু মোসলেমা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। মৃত্যের দেহ বেলা ২টার দিকে বাড়িতে পৌছানোর সাথে সাথে স্বামী সোহাগ পালাতে চেষ্টা চালালে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে শহিদুল, মন্তেজ, ইদ্রিস, কুদ্দুছ ও আব্দুস ছাত্তারের সহায়তায় কৌশলে সোহাগ পালাতে সক্ষম হয়। বেলা ৪ টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থানে পৌছে ছুরোতহাল রিপোর্ট শেষে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরন করেন। এসময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন, হাতে ও পিঠে ঝাটার কাঠি ফুটে থাকতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী স্কুল ছাত্র সোহেল ঢালীর পুত্র জীবন জানান, তাদের সামনে মোসলেমাকে ঝাটা, গাছে ডাল দিয়ে মারপিট, চুলের মুঠো ধরে মারপিট ও বুকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয়। চরম পিটানোর এক পর্যায়ে তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। একই গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদ কারিগরের পুত্র শাহাদাৎ হোসেন, মৃত বাবর আলী সানার পুত্র সিরাজুল ওরফে গাম্বুরসহ বহু লোক জানান, তাকে আগেও নির্যাতন করা হতো, ঘটনার দিন ব্যাপক মারপিট করা হয়েছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্য শওকত হোসেন বলেন, সমাজে এমন অমানবিক নির্যাতন, হত্যা কান্ড কিংবা নির্যাতনের পর বিষপানে আত্মহত্যায় বাধ্য করার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান। নির্মম নির্যাতন ও নিহতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেকে এ প্রতিবেদকের সামনে অঝোরে কেঁদে ফেলেন। ঘটনার পরপরই সোহাগ ও তার পিতা-মাতা মোসলেমার শিশু কন্যা সোহানাকে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। মোসলেমার পিতৃকূল সহ এলাকাবাসী হত্যা কিংবা বিষপানে আত্মহত্যায় বাধ্যকারীদের অবিলম্বে আটক করে আইনে সোপর্দ করার দাবী জানান। থানা অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাথমিক ভাবে ইউডি মামলা হয়েছে, লাশ ময়না তদন্ত করার জন্য মর্গে প্রেরন করা হয়েছিল। রিপোর্ট হাতে পৌছানোর পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।