স্মরণে বারবার এই জুন-সেই জুন


প্রকাশিত : জুন ১৯, ২০১৮ ||

সুভাষ চৌধুরী
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইবো না, বাইবো না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে গো…।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এই কালজয়ী গান সর্বকালেই মানুষের হৃদয়ে স্পন্দন সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথ সচরাচর নিশ্চল মূর্তিতে নিজের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালবাসতেন। সাহচর্যের ভেতর নি:সঙ্গতা, কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ অন্তরতম জীবনের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ কবিকে ধ্যান গম্ভীর মর্মর মূর্তিতে পরিণত করে তুলতো। আবার কৌতুকে হাসিঠাট্টায় শিশুসুলভ সরলতায় সবাইকে মাতিয়ে তুলবার ক্ষমতা ছিল তার মধ্যে। যে শক্তি রবীন্দ্রনাথকে মহত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল সেই শক্তির বৈপরীত্যও আমাদের কখনও কখনও শক্তিমান করে তোলে। বিপরীত এই শক্তিগুলোও মানব হৃদয়কে স্পন্দিত করেছে। ধ্যান গম্ভীরতা নয়, কর্ম চাঞ্চল্যে জীবনকে আন্দোলিত করেছে। কারও কারও জীবন রাজনৈতিক গন্ডিতে বাধা পড়েছে। কেউ সামাজিক পরিমন্ডলে নিজেকে শাণিত করেছেন। প্রচারে প্রসারে নিজ অবয়বকে প্রস্ফূটিত করেছেন। মানবসন্তানের মধ্যে এই বৈপরীত্য জীবনকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
প্রতিবছর জুন মাস এলেই কথাগুলি আমার মনে আসে। মনে আসে রবীন্দ্রনাথ কেমন নির্লীপ্তভাবে নিজের মধ্যে ডুবে থেকে একজন ভাস্কর হিসাবে কাব্যিক শিল্প রচনা করেছেন। আর কোনো কোনো মানব সন্তান জনারণ্যে ডুবে থেকে মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। মানুষকে নিয়ে কথা বলতেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন। মানুষের সেবা করতেন। এই জুন মাস এলেই সাতক্ষীরার মানুষের মনে জাগরুক হয়ে ওঠে পেছনে ফেলে আসা কয়েকটি দিন কয়েকটি ক্ষণ। হিসাবের খাতায় এমন পাঁচ গুণি সন্তানের ইতিকথা আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দেয়। ১৯৯৬ এর ১৯ জুন। তারপর ২০০২ এর ২ জুন। তারপর ২০০৪ সালের ২৭ জুন। ২০১৭ সালের ৩০ জুন। সবার আগে ১৯৮৪ এর ২৬ জুন।
৯৬ এর ১৯ জুন। সেদিন ছিল সপ্তম সংসদ নির্বাচনে হাঙ্গামার কারণে কয়েকটি কেন্দ্রে পুনঃভোট গ্রহণের দিন। রাতে বিটিভির খবরে নিজের নজর নিবদ্ধ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিন। নিজ সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা দৈনিক পত্রদূত অফিসে বসে ভোটের ফলাফল দেখছিলেন তিনি। ঠিক এমনই সময়ে ঘাতকের ছোড়া বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল তার দেহে। মুহূর্তেই লাল রক্তে ভিজে ওঠা পত্রদূত ভবনেই তার তার জীবনস্পন্দন থেমে গেলো। সাথে সাথে অবসান ঘটলো একটি ইতিহাসের। একটি অনুচ্ছেদের। স. ম. আলাউদ্দিন ছিলেন একজন জনমানুষের নেতা। আদর্শবান এক পুরুষের নাম আলাউদ্দিন। রাজনীতি, জনপ্রতিনিধিত্ব, ব্যবসা বাণিজ্য এমনকি পত্রিকা সম্পাদনার মতো কাজে তিনি হয়ে ওঠেন পারদর্শী। জীবনের প্রথম সোপানে টগবগে যুবক স. ম. আলাউদ্দিন অস্ত্রহাতে দেশের শত্রু নিধনে নেমেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন। সেই আলাউদ্দিনই ছিলেন গণপরিষদ সদস্য। স্কুলের প্রধান শিক্ষক। শিল্প ও বণিক সমিতির নেতা, ভোমরা স্থল বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা। সফল শিল্পপতি। তিনিই ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, দৈনিক পত্রদূতের সম্পাদক। এতো সব গুণ নিয়ে যে মানুষটি জনারণ্যে বিচরণ করেছেন তিনি তার শৈল্পিক ভঙ্গিমায় সমাজের জন্য এঁকেছেন নতুন নতুন ভাস্কর্য। তার মৃত্যু তার কর্মকে মলিন করতে পারেনি। তার প্রয়াণ তার সমাজচেতনাকে বিনষ্ট করতে পারেনি। সমাজ থেকে মুছে যায়নি তার অবয়ব। কারণ তিনি মানুষকে ভালবেসেছিলেন। নিজের জীবনকে মানুষের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলেন। আততায়ীর বুলেটে হৃদস্পন্দন হারানো শহীদ স. ম. আলাউদ্দিন হত্যার বিচার হয়নি এখনও। এ বিচার কবে হবে কে জানে।
২০০২ এর ২ জুন। এরই মাঝে পার হয়ে গেছে ১৬টি বছর। সাতক্ষীরার আহমাদিয়া প্রেস ছিল দক্ষিণ বাংলার এক অতি পরিচিত আড্ডাখানা। এখানেই বসতেন আবদুল মোতালেব। সমাজ বিনির্মান, দু:স্থ মানুষের সেবা, নারী শিক্ষায় জাগরণ, গ্রামে গ্রামে স্কুল কলেজ গড়ে তোলা এসব ছিল তার জীবন সংগ্রামের এজেন্ডা। ষাটের দশক থেকে সাংবাদিকতায় নাম লেখানো আবদুল মোতালেব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক কাফেলা সম্পাদনা করেছেন। সমসাময়িককালে তিনি ছিলেন অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ অবজারভারের সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট। নিজ হাতে গড়েছেন বহু সাংবাদিক। তাদের পথ দেখিয়েছেন। আর চাকুরি দিয়েছেন অগণিত শিক্ষিতের। রেড ক্রিসেন্টের জীবন সদস্য আবদুল মোতালেব ছিলেন একজন সমাজ দরদী মানুষ। তিনি সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সমাজকে গড়েছেন। নিজেকে জনারণ্যে বিলিয়ে দেওয়া আবদুল মোতালেব ছিলেন সকল মানুষের প্রিয়। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০০২ এর ২ জুন আবদুল মোতালেব আমাদের ছেড়ে চলে যান। তার মৃত্যু সমাজে গভীর ক্ষতর সৃষ্টি করেছে। তিনি তার কর্ম, শিক্ষাঙ্গন ও সমাজের প্রতি তার অবদানের মধ্যেই চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।
২০০৪ সাল। দেশে তখন ভয়ংকর দানবীয় তান্ডব চলছে। খুন খারাবি রক্তপাত সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদের কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের মানুষ। সে বছরের ২৭ জুন আততায়ীদের ছোড়া বোমায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেলো সংবাদজগতের আরেক দিকপাল দৈনিক জন্মভূমি সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালুর দেহ। মুহূর্তেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন তার মায়ের বাড়ির আঙ্গিনায়। হুমায়ুন কবির বালু এ সময় তার মাকে স্বজনের পরীক্ষার ফলাফলের মিষ্টিমুখ করাতে গিয়েছিলেন। সবার প্রিয় বালু ভাই এক সময় স্লোগানে কাঁপিয়েছেন রাজপথ। ৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৬ এর ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণআন্দোলন, ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১ এ মহান মক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে হুমায়ুন কবির বালু নিজেকে জনগনের কাতারে এনে সিক্ত হয়েছিলেন ভালবাসায়। ভালবাসার রঙ্গীন ফুল থেকে তিনি সৌরভ গ্রহণ করতেন। জনগনের সাথী হয়ে সমসাময়িক রাজনীতিতে তিনি উত্তাল ঢেউ তুলেছিলেন। প্রস্ফূটিত গোলাপের মতো তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন জনকল্যাণে। নিজ সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা দৈনিক জন্মভূমিকে তিনি নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের আশা আকাংখায় পরিণত করেছিলেন। বালু ভাই সমাজকে যা দিয়েছেন তুলনা তার নেই। তিনি তার কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন। সাংবাদিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু হত্যার বিচার হয়নি আজও।
সাতক্ষীরায় ৬০ এর দশকে যার দরাজকন্ঠে উৎসারিত হতো ‘বল বীর, বল চির উন্নত মম শির, শির নিহারি শিখর হিমাদ্রীর বল বীর বল চির উন্নত মম শির’। শুধু আবৃত্তি নয় কবিতা লেখা, শিল্প সাহিত্য রচনা করায় যার একাগ্রতা নতুন প্রজন্মকে স্পন্দিত করতো তিনি মুফতি আবদুর রহিম কচি। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে যিনি দমিত হননি সেই মুফতি আবদুর রহিম কচি নানা টানাপড়েনের মধ্যেও প্রকাশ করেছেন সাপ্তাহিক দখিনায়ন। তিনিই এ পত্রিকার সম্পাদক। একটি পত্রিকার যতগুলি দিক রয়েছে তার সবক’টিতেই পারদর্শী ছিলেন তিনি। ক্লান্ত ঘর্মাক্ত দেহে পায়ে হেঁটে তিনি চলাচল করেছেন। ক্ষিধেয় খাবার কেনার টাকা নেই। অসুখ বিসুখে ওষুধ কিনবার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও নানা টানাপড়েনে সাপ্তাহিক দখিনায়ন প্রকাশ করে জন মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। নিজ হাতে বহু সাংবাদিক গড়ে তুলেছেন। এখনকার সাংবাদিকরা যেমন কাছে একটি ল্যাপটপ নিয়ে দুনিয়ার খবর নিমেষেই তৈরি করে ফেলছেন, মুফতি আবদুর রহিম কচি নিজ হাতে রিপোর্ট লিখে তা কম্পোজ করে পত্রিকায় প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হতেন না, সে পত্রিকা পাঠকের হাতে তুলে দিয়ে প্রশান্তি লাভ করতেন। একজন কবি একজন সাহিত্যিক, একজন সাংবাদিক একজন সম্পাদক হিসেবে তার জুড়ি মেলা ভার ছিল। সেই আবদুর রহিম কচি যিনি এতোটুকু আয়েশ পাননি তিনি শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে নানা ব্যাধি নিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ২০১৭ এর ৩০ জুন।
এই জুন সেই জুন। ১৯৮৪ এর ২৬ জুন। সাতক্ষীরার বিদগ্ধ পন্ডিত আপাদমস্তক শিক্ষক অধ্যাপক তবিবুর রহমান শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। সেই কিশোর বয়স থেকে আমৃত্যু যিনি লেখালেখি করে কাটিয়েছেন তাকে নিয়ে লেখা হয়নি কখনও। সংবাদপত্রের পাতায় সাময়িকী সংকলনে বইপুস্তকে যে মানুষটির নাম ফলিত হত যার ‘আহত মরালির স্বর’ কাব্যগ্রন্থ আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই কবিকে নিয়ে তেমন কোন প্রকাশনা চোখে পড়ে না। উপেক্ষিত অথচ আলোকিত কবি সাংবাদিক তবিবুর রহমানের সাহিত্য জগতে পদচারণা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। তিনি দৈনিক আজাদ এর মুকুল মাহফিল পাতার সদস্য হন। ঢাকার কিশোর মাসিক সবুজ মিশনে তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। স্কুলে পড়াকালে কলকাতার ‘মৌচাক’ এর শারদীয় সংখ্যায় তবিবুর রহমানের আঁকা প্রথম ছবি ‘পানকৌড়ি’ ছাপা হয়। ঢাকার ইয়ং পাকিস্তানে তার ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হয়। নাট্যব্যাক্তিত্ব তবিবুর রহমান তারাশংকরের ‘দুই পুরুষ’ এ অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমীর সদস্য। প্রয়াত সাংবাদিক কবি তবিবুর রহমান সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। কবির কাব্যগ্রন্থ আহত মরালির স্বর, মনন কথন নির্বাচন, মুজাহিদ সহায়িকা, ধানশালিকের দেশসহ বহু প্রকাশনা বচনা করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ ভলিবল খেলোয়াড়। স্কাউটিংয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন তিনি। ১৯৮০ সালে সাতক্ষীরা কলেজ সরকারি হওয়ায় তবিবুর রহমানকে সাংবাদিকতা ছাড়তে হয়। এর আগ পর্যন্ত তিনি দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক বাংলা, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। সাংবাদিকতা থেকে বিদায় নেয়ার পর থেকে পর থেকে তিনি অদম্য নেশা নিয়ে লেখালেখি করেছেন। ১৯৮৪ এর ২৬ জুন পবিত্র শব ই কদরের রাতে তার জীবনাবসান ঘটে। ইংরাজী ও বাংলা সাহিত্যে পান্ডিত্যের অধিকারী এই গুণি সাংবাদিক তার সাহিত্য কর্মের মাঝেই চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
প্রতি বছর জুন এলেই আমরা ডুবে যাই তাদের মধ্যে। যারা নিজেদের বিলিয়েছেন জনকল্যাণে, তাদের সৌরভ পেতে বারবার স্মরণে আনি ২ জুন, ১৯ জুন, ২৬ জুন, ২৭ জুন এবং ৩০ জুন। লেখক: জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি