ঈদের ছুটির পরে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভীড়


প্রকাশিত : জুন ৩০, ২০১৮ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: ঈদ উল ফিতরের ছুটি শেষ হয়েছে। তারপরও পশ্চিম সুন্দরবন সংলগ্ন বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নানা বয়সী দর্শণার্থীদের উপচেপড়া ভীড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বৈরী পরিবেশ আর তীব্র গরমও তাদেরকে কোনভাবে রুখতে পারছে না। এ সুযোগে বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আশপাশে গড়ে ওঠা মৌসুমী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো মওকা লুফে নিচ্ছে বলে খোদ দর্শণার্থীদের অভিযোগ।
কলাগাছিয়া, অকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম পার্ক ও সুন্দরবন পিকনিক কর্নারে ঈদের দিন থেকে শুরু করে গত তিন দিনে দিনের বিশেষ বিশেষ সময়গুলোতে ন্যুনতম তিল ধরনের ঠাঁই পর্যন্ত মেলেনি।
স্থানীয়দের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য পর্যটকের পদচারণায় বিনোদন কেন্দ্রগুলো সারাদিন ধরে মুখরিত থেকেছে। তবে ঈদের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মস্থল থেকে নাড়ির টানে ছুটে আসা দর্শণার্থীদের আনাগোনা ছিল সবচেয়ে বেশি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে শ্যামনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোপালপুর দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গোপালপুর পিকনিকি কর্নারে কিশোর কিশোরী এবং তরুণ তরুণীদের ভীড় সবচেয়ে বেশি। বারো কিলোমিটার দুরবর্তী নওয়াবেঁকী এলাকা থেকে আসা নবম শ্রেণির ছাত্র ইলিয়াস হোসেন জানায়, পাঁচ বন্ধু মিলে সুন্দরবন পিকনিক কর্নার ঘুরতে এসেছে। আগেও অনেকবার আসার তথ্য দিয়ে ঐ ছাত্র জানায় প্রতিবেশি আর বন্ধুদের বাড়ি সব সময় যাওয়ার সুযোগ মেলে। তাই ঈদ উপলক্ষে ভিন্ন স্বাদ নিতে তারা একত্রে এবার এ বিনোদন কেন্দ্রে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
কালিগঞ্জ উপজেলার দুদলী গ্রাম থেকে আসা ছাত্র ইমরান, মিলন ও অমল জানায় তারা ছয় জন এসেছে বিনোদন কেন্দ্রটিতে। এখানকার পানির উপর ইট পাথরের গোল চত্ত্বরটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করেছে দাবি করে জানায় আগত দর্শণার্থীদের ঘোরাফেরা করার মত যথেষ্ট জায়গা না থাকায় কিছুটা সমস্যা হয়েছে।
নকিপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমি আক্তার জানায়, ভাই বোন ও বন্ধু মিলে তারা পাঁচ জন এসেছে। জন প্রতি বিশ টাকায় টিকিটি নিয়ে সুবজ শ্যামল ছায়ায় ঘেরা এ বিনোদন কেন্দ্র ঘুরতে অনেক ভাল লাগছে। কিন্তু দর্শনার্থীদের মধ্যে কিছু বখাটের আনাগোনা তাদের বিনোদন কেন্দ্রে নির্বিঘেœ ঘোরার বিষয়টিকে কমবেশি নিরনাপত্তাহীন করে তুলেছে।
ঐ স্কুল ছাত্রীর মত ঢাকা থেকে আসা রেবেকা সুলতানা ও আফরোজা আক্তার নামের দুই অভিভাবিকার অভিযোগ শুধু বিনোদন কেন্দ্রে গড়ে তুললে হবে না। বরং এখানে আসা প্রতিটি দর্শণার্থীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।

 


তবে চতুর্দিকে সবুজ গাছের ছায়া আর মধ্যভাগে সুবিশাল পানি রাশির সাথে বোটিং আরও কৃত্রিম নানা প্রজাতির জীবজন্তুর উপস্থিতি ছোট্ট সোনামনিদের দারুণ আনন্দ দিয়েছে বলেও জানান এসব অভিভাবক।
ঈদের দ্বিতীয় দিন বেলা সাড়ে এগারটা নাগাদ সুন্দরবনের কোলে গড়ে ওঠা আকাশলীনা ইকো ট্রুরিজম পার্কে পৌছে দেখা যায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই সেখানে। গোটা এলাকা লোকে লোকারণ্য। কেউ কেওড়া গাছকে ঘিরে গড়ে তোলা ‘গোল ঘরে’ বসে আছে তো আবার অনেকে সুন্দরবনকে বিভক্তকারী মালঞ্চ নদী থেকে উঠে আসা ট্রেইল এর উপর বসে প্রকৃতির অপার দৃশ্য উপভোগ করছে।
নির্মাণাধীন ওয়াচ টাওয়ারের উপর ওঠার চেষ্টায় কেউ কেউ অগ্রসর হলেও কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ব্যর্থ মনোরথে ‘ফিস মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত নানা প্রজাতির মাছ আর সুবিশাল কাঁকড়া দেখে সময় কাটাচ্ছে।
তবে জায়গা সংকুলান না হওয়ার কারণে বেশিরভাগ দর্শণার্থীকে মুলত এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পায়চারী করতে দেখা গছে।
চাকরি সূত্রে কুষ্টিয়া থাকলেও ঈদে বাড়িতে আসা আশরাফ হোসেন ও তার স্ত্রী মোহসেনা বেগম জানায় এক বছর আগেও আকাশলীনায় এসেছিলাম। কিন্তু গত এক বছরে নুতনত্ব কিছু চোখে না পড়ায় মনে অনেকটা হতাশ হয়েছি। সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে আসা এ দম্পতি আরও বলেন, আকাশলীনার ভিতরে তৈয়ারকৃত ট্রেইলসমুহ আরও একটু বিস্তৃত করা হলে দর্শণার্থীদের চলাচল আরও সাবলীল হতে পারতো।
তৈমুর হোসেন আর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী আলিয়া হোসেন এসেছেন ঢাকা থেকে। স্বামী স্ত্রী দুই জনই বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তারা জানান অনেক দিনের ইচ্ছা সুন্দরবন ঘুরে দেখা। এবারে ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারের নয়নাভিরাম এই ইকো ট্যুরিজম পার্ক সত্যিই হৃদয় হরণ করেছে। সুন্দরবনকে ভাগ করে রাখা নদীর এপারের এ পার্কের ভিতরে থাকা সুব্যবস্থায় তারা রীতিমত বিস্মিত হয়েছেন। তবে আগত দর্শণার্থীদের অবকাশযাপনসহ চলাচলের রাস্তাসমুহ আরও কিছুটা প্রশস্ত করার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানান তারা।
অকাশনীলা ইকো ট্যুরিজম পার্কের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা প্রমথ মহালদার, সাইফুল ইসলাম এবং টুটুল হোসেন জানান ঈদের দিন সারা দিনে প্রায় আট হাজার দর্শণার্থী তাদের এ ইকো ট্যুরিজম পার্কে ঘুরতে আসেন। নামমাত্র দশ টাকার টিকিটের বিনিময়ে দর্শণার্থীরা এখান থেকে সুন্দরবনের নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করে মুগ্ধ হন বলেও তারা দাবি করেন। তারা জানান, ঈদের ছুটির ফাঁকে পর্যটকদের ভীড় তুলনামলুক কমছে।
তবে চলাচলের রাস্তাসহ দর্শণার্থীদের অবকাশ যাপনের জন্য আরও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে দর্শণার্থীদের দাবির বিষয়টি কতৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত জানিয়ে তারা কোন মন্তব্য করতে বিরত থাকেন।
সুন্দরবনের গাছ-গাছালী আর জোয়ার ভাটার খেলা চলতে থাকা পাশের ¯্রােতস্বিনী মালঞ্চ নদীর উপর গড়ে উঠা আকাশনীলা ইকো ট্যুরিজম পার্ক পরিদর্শনে সুন্দরবনের প্রতিবিম্ব দেখার সুযোগ মেলে বলে দাবি করেন ঢাকা থেকে স্বস্ত্রীক বেড়াতে আসা মামুনুর রহমান। তবে হাজার হাজার দর্শণার্থীর একসাথে ঘুরে দেখার জন্য অপরূপ ও মনোমুগ্ধকর এ বিনোদন কেন্দ্রটির বিস্তৃতি বৃদ্ধিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি জানান তিনি।
তবে শুধু সুন্দরবন পিকনিক কর্নার বা আকাশলীনা ট্যুরিজম পার্ক নয়। বরং আকাশলীনার অপর দৃশ্য অবলোকনের পর অনেকে দর্শণার্থী সুন্দরবনের কলাগাছিয়া স্টেশনে যেয়ে সুন্দরবন ভ্রমণের স্বাদ নিতে ভুল করছে না ঈদের এই ছুটিতে। ঈদের দিন থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি পর্যটক সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে জানিয়ে বনবিভাগ সূত্র জানায় তীব্র গরমের কারণে এবার সুন্দরবনের ভিতরে প্রবেশকালীন সংখ্যা তুলনামুলক কম হলেও তাদের অধিকাংশ আকাশলীনায় যেয়ে সুন্দরবনের স্বাদ নিচ্ছে যারপর নেই খুশি হচ্ছে।