১ লাখ পাখি ও ১৫০০ মানুষের গ্রাম


প্রকাশিত : জুলাই ২৩, ২০১৮ ||

পাভেল পার্থ
উচ্চ বরেন্দ্রভূমির এক ছোট্ট গ্রাম বরেন্দা। চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ৪নং নিজামপুর ইউয়িনের এ গ্রাম তেভাগা আন্দোলনের টগবগ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ২৫ কি. মি. দূরে এই গ্রামের ধারে কাছে কোনো নদী ও বিল নেই। গ্রামে আছে এক বিশাল দীঘি আর চারধারের জমিনের নালা, গর্ত আর খাঁড়ি। এগুলোই বরেন্দ্র এলাকার জলের আধার। বৃষ্টি মৌসুমের জল এরাই ধরে রাখে রুক্ষ বরেন্দ্রর মাটিতে। স্থানীয় ভাষ্যমতে, বরিন্দ্র মানে হলো রুক্ষ ও শুষ্ক এলাকা। বৃষ্টি হলেও যে এলাকা ডুবে যায় না, ভারতের অনেক অঞ্চলে এরকম এলাকা নাকি খেয়ার ও রাঢ় নামে পরিচিত। তবে অনেকে বলে থাকেন বরেন্দ্র আদি বসতিস্থাপনকারীরাই বরিন্দা। পরে যারা মহানন্দা-পদ্মার দিয়াড় অঞ্চল থেকে এসেছে তারা ‘দিয়াড়া’, দেশভাগের সময় যারা এসেছেন তারা ‘রিফ্যুজি’। বরিন্দাদের এলাকা বলেই এই গ্রামের নাম বরেন্দা হয়েছে। অনেকে বলেছেন বড় বড় নুন্দা থেকেই গ্রামের নাম বরেন্দা হয়েছে। নুন্দা মানে গোবরের ঘুঁটে, যা এই এলাকার প্রধান জ্বালানি ছিল এককালে। গ্রামের নারীরা বড় বড় আকারের নুন্দা বানিয়ে রাখতো বলে এই গ্রামের নাম বড় নুন্দার গ্রাম বা বরেন্দা হয়েছে। ৬৫ পরিবার আদিবাসী ওঁরাও ও মুন্ডা পরিবার বাদে গ্রামে বাঙালি মুসলিমদেরই প্রাধান্য। স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষ্য, ভারতের বিহার, রাঁচী, নাগপুর থেকে বনজংগল কেটে রেললাইন বসানোর জন্য এদের আনা হয়। বাবলা ও কাঁটা জাতীয় ঝোপ বেশী ছিল এখানে। বরেন্দা গ্রামে প্রায় পাঁচ স্তরের ঢেউ খেলানো জমি আছে। একদম নিচু জমিকে বলে জাওয়াই, তার চাইতে উঁচু কান্দর, তারপর কান্দিরি, তারপর চাড়া এবং সবচে উঁচু জমিকে পাহাড় চাড়া বা অনেকে ডাইন বলে। কেবলমাত্র চাষবাস নয়, গ্রামের আশেপাশের ঝোপজংগল থেকে গেঠি আলু, শুয়র থুথু, জংলী ওল, কান্দা, ঠুরহো, পানপতই সংগ্রহ করে নারীরা সংসারের খাদ্য চাহিদা মেটাতেন। বর্তমানে এসব লুপ্ত হয়েছে।
এককালে আম ও আউশই ছিল এলাকার প্রধান ধানমৌসুম। আমন মৌসুমের ধান সোনাশাইল, বাতরাজ, ঝিঙ্গাশাইল, মালশারা, সুবনদড়ি, হাঁসরাজ, হরমা, বিয়ানুফুল, রঘুশাইল, মাগুরশাইল, দাউদখানি, চিনিআতব, বাশফুল, রান্ধুনীপাগল, চিনিস্বাক্ষর, ভাষামানিক, পারিজাতি, কদমশাইল। আউশ মৌসুমের ধান ছিল কালোশনি, আউশ, ষাইটা আউশ ও ধলগইড়া। ঝিঙ্গাশাইল ছিল শুঙ্গাঅলা ধান। স্থানীয়দের মতে, ঝিঙ্গাশাইল, রঘুশাইল ও মাগুরশাইলের ভাত খেতে সুস্বাদু। মুড়ির জন্য ভাল কদমশাইল ও ঝিঙ্গাশাইল। চিনিস্বাক্ষর ধানের মুড়ি নরম। পিঠা ভাল হত দাউদখানি ও চিনিআতবের। স্থানীয়দের ভাষ্য, চিনিআতব ধানটি এখনো কিছু কিছু চাষ হয়। তবে এই ধানের যে দাম গরীব কিষাণ কিনতে পারে না। আগের দিনের ধানসমূহ বেশি আঠালো, নরম এবং সেসবের শক্তি বেশি ছিল। খাওয়ার পর পেটে অনেকক্ষণ থাকতো বলে জানান প্রবীণ নারীরা। আগে বরেন্দ্রঅঞ্চলে ধানের খড়ই ছিল ঘর ছাওয়ার প্রধান কাঁচামাল। ঝিঙ্গাশাইল ও মাগুরশাইলের লম্বা, টেকসই, চিকন ও শক্ত খড় ব্যবহৃত হতো বেশী। বর্তমানের উফশী ধানের খড় পচনশীল, খাটো বলে কেউ তা ঘরের কাজে ব্যবহার করে না। গরুর খাদ্য হিসেবেও এই খড় গুলো ভাল ছিল।
আদিবাসীরা আশেপাশের বনজংলা থেকে গেঠি বা বনআলু কুড়িয়ে মেটাতেন পরিবারের খাদ্যের একটি প্রধান চাহিদা। শুয়রথুথু, জংলী ওল, কান্দা বা পদ্মের নাইল, ঠুরহো (শামুক), পানপতই শাক, পাতিকেশর পাওয়া যেত। সকালে পান্তা ভাত খেয়ে পাতিকেশর আনতে পুকুর ও নিচু জমিনে যেত কিশোর-কিশোরীরা, এক ডালি পাতিকেশর আনলে একটি পরিবারের একদিনের খাবার হয়ে যেত। প্রায় বিশ বছর আগেও এক সের পাতিকেশরের দাম ছিল ৪-৫ টাকা। এখন একদম নেই। বরেন্দ্রর মাল আদিবাসীরা খাদ্য উপযোগী বনজ মাশরুমকে পুয়ালি বলেন। ধানজমিনের আশেপাশে আগে পাওয়া যেত লইটে, ধুসরি, সানচি, নুইন্যা, বনকচু, হেলেঞ্চা, ঘরকচু, কাঁটালইটে, কলমু, তেলাকুচা, ছুটি শাক। স্থানীয় ওরাঁও আদিবাসীদের পৌষমাসে আয়োজিত পুষনা পরবের প্রধান উপকরণ তিল-কুষলি ও আখমুন্দুয়া পিঠা। দাউদখানি বা চিনিআতব ধান ও তিল দিয়ে পিঠা গুলি বানানো হত। বর্তমানে পিঠার পুরের জন্য ব্যবহৃত হয় নারিকেল ও চিনি এবং উফশী ধান। চিনিস্বাক্ষরের ভাত দিয়ে তৈরী হত ঐতিহ্যবাহী ওঁরাও পানীয় বড়িয়া ও চুয়ানি। তালের রস থেকে তৈরি তাড়ি গ্রীষ্মকালের বহুল ব্যবহৃত পানীয়, যা শরীরের ক্লান্তি দূর করে গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাজের শক্তি জোগাত।
কিন্তু দুম করেই বরেন্দা গ্রামটি ওল্টেপাল্টে যেতে থাকে। বলা উচিত চাপিয়ে দেয়া উন্নয়নের বাহাদুরিতে গ্রামটিকে ফালি ফালি করে কেটে ছিঁড়ে দুমড়েমুচড়ে দেয়া হয়। প্রথম ধাক্কাটি আসে ‘সবুজ বিপ্লবের’ তকমা ওড়িয়ে। মাটির তলার পানি টেনে তুলে সেচ, রাসায়নিক সার, বিষ ও তথাকথিত উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহার করে ‘ধান চাষ’ কর্মসূচির মাধ্যমে। শুরু হয় প্রশ্নহীন ‘বোরো মওসুম’। পরের ধাক্কাটির নাম ‘বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প’। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন বিএডিসির কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা/কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘বারিন্দ ইন্টিগ্রেটেড এরিয়া ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট/বিআইএডিপি’ প্রকল্প। পরবর্তীতে তা ১৯৯২ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামের একটি সংস্থায় রূপান্তরিত হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প মাটির তলার শেষ পানিবিন্দুটিও টেনে তোলার চেষ্টা করছে। কারণ এই প্রকল্প তৃষ্ণার্ত মাটি ও মানুষের কলিজায় পানি তুলে দিতে চায়। যদিও এই পানি-প্রকল্পের পেছনের কারণ একেবারেই রাজনৈতিক এবং করপোরেট বাণিজ্যের সাথে সরাসরি জড়িত। এই পানি প্রকল্প মূলত: বহুজাতিক কোম্পানির তেল, বীজ, সার ও বিষ ব্যববসাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য বরেন্দ্রর মাটির তলার পানিকে পুঁজি করেছে। আর জিম্মি করেছে বরেন্দ্রর পানিহীনতার আহাজারিকে। গ্রামের পর গ্রাম মানুষ কল ছাড়লেই ঝরঝর পানি পাচ্ছে, স্মরণ রাখতে হবে এই পানি মূলত বোরো মওসুমের ধান জমিনেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বোরো মওসুম পুরোটিই নিয়ন্ত্রণ করছে মনস্যান্টো, সিনজেনটা, বায়ার, কারগিল নামের বহুজাতিক কৃষি-বিষ কোম্পানিগুলো।
বর্তমানে বরেন্দা গ্রামে আমন মৌসুমে বর্তমানে এই গ্রামে সাদা স্বর্ণা ও লাল স্বর্ণা চাষ হয়। আউশে পারিজা ও ব্রিধান ২৮ এবং বোরো মওসুমে ব্রিধান ২৮ বেশী চাষ হয়। এখনও বহুলভাবে হাইব্রিড ধানের চাষ শুরু হয়নি। বরেন্দ্র জনপদে এক ফজলী আমেরই আছে হরেকরকম জাত। ভোটকা ফজলী, তোতা ফজলী, সুরস ফজলী ও কলম ফজলী। তোতা ফজলী জাতটি দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে। বেগুনেরও আছে হরেকরকম জাত। ঘিঐনা বেগুন, কাঁটাবেগুন, পাইরা বেগুন, ঝুমকা বেগুন, গোল বেগুন। ঘিঐনা আর কাঁটাবেগুনের জাতগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কাঠুয়া দারে নামের এক ডাঁটা প্রজাতিটিও আজ বিপন্ন। নির্বংশ হচ্ছে কোয়াই, মাগুর, শোল, ঘটি, পুটি, পাঠি, দাইড়কা, ময়া, গুচি, টেংরা, কাটাবাতাসী, জাল, চিমরীর মতো দেশি মাছবৈচিত্র্য। বরেন্দার কৃষকের ভাষ্য, ধানের ভুইয়ে বিষ দেয়াতে দেশি মাছ সবই নিবর্ংশ হয়ে যাচ্ছে। ময়া ও দাইড়কা মাছ একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে শকুন, গিধিনি, ঘুঘু, ুটিয়া, বাউই, ছলি, পানিকামলির মতো বরেন্দ্রভূমির পাখিসমূহ। শতমূলীর মতো ঔষধিগুল্ম আগে অনেক থাকলেও বর্তমানে এটি নিশ্চিহ্ন । জমিনে জাওনা, কাইস্যা, ওলা, বনধনে, বনমরিচ, তিতভিটে ঘাস গুলো গবাদিপশুপাখির খাদ্য ছিল। কিন্তু ধান জমিনে ‘ঘাসমারার বিষ (হার্বিসাইড)’ দেয়াতে এসব গ্রামীণ গোখাদ্য নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এখন একটি গ্রামীণ পরিবারকে মানুষের খাদ্য থেকেই গবাদিপশুকে খাবারের ভাগ দিতে হচ্ছে। এতে একইসাথে মানুষ ও গবাদিপশু উভয়েই খাদ্যসংকটে পড়েছে।
বরেন্দা গ্রামের কাছে বটতলা ও ফুলকুড়ি বাজার আছে। ফুলকুড়ি মূলত: একটি কৃষিপণ্যের বাজার, স্থানীয় এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া হাইব্রিড শাকসব্জি এ বাজার থেকে রাজশাহী ও ঢাকাসহ দেশের শহর গুলোতে চালান হয়। গ্রামের কৃষকের দেশি ধান, যবের ছাতু, খই-মুড়ি, তালের রস, কোদা-জনরা, গম, মুরগির ডিম, কবুতর কোনোকিছুই এসব হাটবাজারে দেখা যায় না। বরং কোক-পেপসিসহ শহর থেকে আসা প্যাকেটবন্দি খাবার আর বহুজাতিক কোম্পানির বীজ আর বিষ সমানে বিক্রি হচ্ছে। গড়ে ওঠেছে অনেক ফ্লেক্সিলোডের দোকান। এভাবেই গ্রাম থেকে হাট বাজার, গাছের শেকড় থেকে শস্যদানা সবকিছুই আজ বরেন্দা গ্রামের মানুষের অধিকারে নেই। বরিন্দাদের অধিকারে নেই। সবখানেতেই বহিরাগত উন্নয়নের হাতছানি আর অব্যর্থ নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এই চলমান উন্নয়নের তান্ডবে কী হয়েছে, মাটির তলার জল সমানে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতির বহুমাত্রিক সম্পর্ক। বেড়েছে আশংকা আর যন্ত্রণা। উন্নয়ন মানে তো মুক্তি, রূপান্তর বিকাশ আর কাংখিত পরিবর্তন। কিন্তু এক বরেন্দা গ্রামের অভিজ্ঞতা বলে দেয় দেশজুড়ে কি দুনিয়াময় কী ধরণের অন্যায় আর খুনখারাবি ঘটে চলেছে।
কিন্তু তারপরও মানুষ থেমে নেই। বরেন্দা গ্রামের মানুষেরা প্রাণ ও প্রকৃতির বিজ্ঞানকে আগলে বরেন্দ্রভূমির জটিল সংসারকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার কিয়দংশসহ প্রায় ৭,৭৭০.০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এলাকাটির নাম বরেন্দ্রভূমি। ১৮৪৯ সালের ভূমি জরিপ থেকে দেখা যায়, বরেন্দ্র ভূমির ৫৫ শতাংশ এলাকা বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। বিস্ময়করভাবে নওগাঁর আলতাদীঘি ছাড়া বর্তমানে আর কোনো শালবন বরেন্দ্র জনপদে নেই। ১৯৪৬-১৯৪৭ সালের দিকে ভূমিমালিক এবং ভাগচাষীদের মধ্যে উৎপাদিত শস্য সমান দুই ভাগ করার পদ্ধতিরে বিরুদ্ধে বর্গাদার কৃষক প্রজারা গড়ে তুলে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। ভূমি ও প্রকৃতির সাথে জবরদস্তিমূলক নয়, সম্পর্কটি জীবনযাপনের। আর এটিই তেভাগার অন্যতম দর্শন। যে দর্শন আজো বিরাজিত আছে বরেন্দা গ্রামে। এখনও এখানে আদিবাসী ও বাঙালি মিলে রক্ষা করে চলেছেন এক ঐতিহাসিক দীঘি, বরেন্দ্র জনপদের টিকে থাকবার স্বাক্ষী হিসেবে। গ্রামের ১৫০০ মানুষ সংসার পেতেছেন লাখো পাখিদের সাথে। গ্রামের বাঁশঝাড়, তেঁতুল গাছে বাস করছে তিন জাতের বক, কক, সলি, পানিকাউড়া, ঘুঘু পাখিরা। বরেন্দা গ্রামের ভাষ্য, গ্রাম শুধু মানুষের নয়। পাখি, গাছ, মাছ, জীবজন্তু সকলেরই হক আছে একসাথে বেঁচে থাকবার। বরেন্দা গ্রামের মানুষের এই সংসার-দর্শন মুমূর্ষু মাতৃদুনিয়ার টিকে থাকবার এক অনন্য সঞ্জিবনী হয়ে ওঠুক। মাতৃদুনিয়ার রক্তাক্ত লাশের উপর দাঁড়িয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস এবার ঘোষণা করেছে ‘শতকোটি জনের অপার স্বপ্ন, একটি বিশ্ব করি না নি:স্ব’। একটিমাত্র দুনিয়াকে যদি বাঁচাতেই হয় তবে তা বরেন্দার মতো স্থানীয় জনগণের টিকে থাকবার লড়াই আর দর্শনকে আগলে নিয়েই দাঁড়াতে হবে। অন্য কোনোভাবেই নয়। লেখক: গবেষক