জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্মরণে


প্রকাশিত : জুলাই ৩১, ২০১৮ ||

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
শিশু চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রবাদ পুরুষ, শিশুবন্ধু, সমাজ হিতৈষী, শিক্ষাবিদ, দক্ষ চিকিৎসা প্রশাসক ও সফল শিল্প উদ্যোক্তা, সদালাপী, সদা সংস্কার মনস্ক এবং সমাজসেবায় একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফি খান, যিনি এম আর খান হিসেবে ছিলেন অতি পরিচিত, আজ তার ৯০তম জন্মদিন। চিকিৎসা ও সমাজসেবায় তিনি ছিলেন একজন অনুকরণীয় ও প্রাত:স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ঋধঃযবৎ ড়ভ চবফরধঃৎরপং হিসেবে বাংলাদেশে যিনি ছিলেন পরম সম্মানীয়। এই নির্লোভ, প্রচারবিমুখ সদাহাস্য মানুষটি তাঁর বিভিন্ন জনহিতকর কাজের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন যাবত সমাজে অসংখ্য মানুষকে সেবা দিয়ে গেছেন।
ডা. এম আর খান সাতক্ষীরা জেলার রসুলপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালের ১লা আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা (পীরালী বংশখ্যাত ) জনাব আবদুল বারী খান এবং মাতা জায়েরা খানম (সংবাদপত্র জগতের পথিকৃত মাওলানা মো. আকরাম খান সাহেবের নিকটাত্মীয়) সমাজ হিতৈষী সৃজনশীল পরিবার, ছিলেন সুখ্যাত সাতক্ষীরায়। সাতক্ষীরা ধন-ধান্যে মৎস্যে মাতোয়ারা সেই সনাতন কাল থেকেই। এম আর খান প্রায়ই আউড়াতেন যে ছড়াটি –
’দেশের সীমানা, নদীর ঠিকানা যেথায় গিয়েছে হারিয়ে,
সেথা সাতক্ষীরা, রূপময় ঘেরা বনানীর কোলে দাঁড়িয়ে।’
তাঁর সহধর্মিনী মরহুম আনোয়ারা খান (কলকাতা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্রী)। তিনি নিজেও ছিলেন একজন স্বনামধন্য সমাজসেবী।
এম আর খানের প্রাথমিক জীবন শুরু হয় সাতক্ষীরার রসুলপুর প্রাইমারী স্কুলে। এরপর পিএন হাইস্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করার পর কলকাতায় প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। কলেজে তিনি ড. কুদরত-ই-খুদার ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে তিনি সেখান থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। তিনি বৃটেনের এডিনবার্গ স্কুল অব মেডিসিন থেকে ১৯৫৭ সালে উঞগ্ঐ এবং লন্ডন স্কুল অব মেডিসিন থেকে উঈঐ ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া তিনি এডিনবার্গ থেকে ১৯৬২ সালে গজঈচ, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ঋঈচঝ এবং ১৯৭৮ সালে ঋজঈচ ডিগ্রি অর্জন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে ডা. এম আর খান দেশে-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট এবং এডিনবার্গ গ্রুপ হাসপাতালে যথাক্রমে সহকারী রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর দেশে ফিরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে শিশু বিভাগে এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে যোগদানের পর তিনি সেখানে শিশু বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৬৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন এবং সেখানকার হাসপাতালে তিনি শিশু বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৭০ সালে চৎড়ভ. ড়ভ চবফরধঃৎরপং পদে উন্নীত হন। ১৯৭১ সালে আইপিজিএমআর-এ অধ্যাপক পেডিয়াট্রিকস হিসেবে বদলী হয়ে আসেন এবং সেখানে উঈঐ এবং ঋঈচঝ ঈড়ঁৎংব চালু করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি যুগ্ম পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং স্বল্প সময়ে সেখানে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। ১৯৭৯ সালে আবার আইপিজিএমআর-এ ঐবধফ, উবঢ়ঃ ড়ভ চবফরধঃৎরপং পদে যোগদান করেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।
শিশুবন্ধু এম আর খান এর জীবন দর্শন হল-কর্মচাঞ্চল্য আর মহৎ ভাবনার সরোবরে সাঁতার দিয়ে মানব কল্যাণে নিবেদিত চিত্ততা। নিবেদিতা মেডিকেল ইনস্টিটিউট আর অগণিত শিশু চিকিৎসা সদন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার সেই স্বপ্নেরা ডানা মেলে ফিরেছে সাফল্যের আকাশে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু, নারী ও অসহায়জনের নতশীর, মূক ও ম্লান মুখে হাসি ফুটিয়ে সাফল্যের তারকারা ঝিলিমিলি করে ফিরত তাঁর ললাটে, তাঁর মুখে-তাঁর সানন্দ তৃপ্তির নিলয়ে। জোনাকীর আলো যেমন অমানিশার আধারে মিটি মিটি জ্বলে এক অভূতপূর্ব পেলব শান্তি ও সোহাগের পরিবেশ রচনা করে তেমনি তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায়, পৃষ্ঠপোষকতায়, নৈপুণ্যে, নিবেদনে অর্থবহ অবয়ব রচনা করে চলতেন নিত্যনিয়ত। এ সবের মাঝে চির ভাস্বর হয়ে রইবে তাঁর স্মৃতি। ‘উপকার কর এবং উপকৃত হও’ এই মহাজন বাক্য তাঁর জীবন ও কর্মে, মনন ও মেধায় পথ চলা ও জীবন সাধনায় স্বত:সিদ্ধের মত অর্থবহ হয়েছে এবং কার্যকর ছিল। আর এ সবের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় শিশুদের মত সারল্যে, সহজিয়া কড়চায়, বন্ধু বাৎসল্যে, স্নেহাস্পদনায়, মুরুব্বীয়ানার মাধুর্যে ছিল তাঁর ব্যক্তি ও চরিত্র উদ্ভাসিত।
জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান মনে করতেন রোগীও একজন মানুষ। আর এ রোগীটি সামাজে আমাদেরই কারো না কারো আত্মীয়-স্বজন, এমন কি আপনজন। রোগী যখন ডাক্তারের কাছে আসেন; তখন সাহায্য প্রার্থী, কখনও কখনও অসহায় বটে। আর রোগীটি যদি শিশু হয় তা হলে তো কথাই নেই। ডাক্তারের কর্তব্য হবে রোগীর কষ্ট গভীর মনোযোগের সাথে ধৈর্য সহকারে শোনা, রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা যেমন প্রয়োজন; তেমনি রোগীর অভিভাবকদের প্রতি ডাক্তারের সহমর্মিতা প্রদর্শন ও আশ্ব¯ত করাও প্রয়োজন। সব রোগীই তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে এমনটিও ঠিক নয়। কারো কারো সুস্থ হতে সময় লাগতে পারে। মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রেখে তিনি বলতেন , হায়াত ও মউতের মালিক যেমন আল্লাহতায়ালা; তেমনি রোগ হতে মুক্তি দাতাও তিনি। তবে রোগীর আপনজনরা এমন যেন বলতে না পারেন যে- ডাক্তার আšতরিক ছিলেন না, ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
শিশুদের সেবার মানসে তিনি ১৯৮৩ সালে শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঢাকার মিরপুরে ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ ও শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং যশোরে শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। মানুষের সৃজনশীল সম্ভাবনার সত্ত্বা তাকে পুষ্টি দিয়ে মননশীল করে সুচিকিৎসা দিয়ে সুস্থভাবে বড় হবার সুযোগ দিতে হবে- এ সুযোগলাভ তার অধিকার। ডা. এম আর খান শিশু চিকিৎসার ওপর বিদেশে বড় ডিগ্রি অর্জন করে সেখানে উচুঁ মাপের চাকুরীর সুযোগ ও সুবিধা পরিত্যাগ করে চলে এসেছিলেন নিজ দেশে। দেশে শিশু চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন পথিকৃতের ভূমিকায়।
শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন ছাড়াও স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় তিনি তাঁর পেনশনের টাকা, পৈত্রিক জমিজমা এবং স্ত্রীর সঞ্চয়ের অর্থে ১৯৮৫ সালে সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই হাসপাতাল বছরে প্রায় ১৮০০০ শিশুকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। ডা. খান ১৯৮৮ সালে তাঁর নিজ গ্রাম রসুলপুরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এ স্কুলে প্রায় ৬০০ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত আছে। এছাড়াও তাঁর প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে- (১) ডা. এমআর খান এন্ড আনোয়ারা ট্রাস্ট (২) উত্তরা মহিলা মেডিকেল কলেজ (৩) নিবেদিতা চিল্ড্রেন হাসপাতাল এন্ড রিসার্স সেন্টার (৪) সেন্ট্রাল হাসপাতাল প্রা. লি. ইত্যাদি। সাতক্ষীরায় নিজের গ্রাম রসুলপুরকে আদর্শ গ্রাম তথা দারিদ্রমুক্ত গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর স্বপ্ন উদ্যোগ দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূয়োদর্শন হিসেবে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। ‘নিজের গ্রামকে আগে দারিদ্রমুক্ত করি’ এই প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ে দীপ্ত বাংলাদেশের সকল সচেতন মানুষ তাঁর মত কর্মবীরের অনুসরণে একযোগে কাজ করতে পারলে, সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সুদূর পরাহত থাকে না আর। ‘রসুলপুর আদর্শ গ্রাম’ এই মডেলে তার প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ছিল গড়ে উঠুক বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রাম ও জনপদ। পল্লী উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মযজ্ঞে রসুলপুর ছিল পল্লী উন্নয়নে সমৃদ্ধ চেতনার নাম।
মহৎপ্রাণ মানুষেরা নিজের জন্য নয় অন্যের কল্যাণে নিবেদন করেন নিজের সব ধন ও ধ্যান ধারণাকে। উৎসর্গ করেন নিজের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ ভাবনাকে। এম আর খান এন্ড আনোয়ারা বেগম ট্রাস্ট ফান্ড এমন এক মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত, শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তিনি উৎসর্গ করেছিলেন নিজের সঞ্চয়, সম্পদ ও সামর্থ। নিজের একমাত্র কন্যা সšতান ডা: ম্যান্ডি করিম কানাডায় প্রবাসী এবং ২০১১ সালে স্ত্রী আনোয়ারা খানের মৃত্যুর পর নিজের জন্য পরিবারের জন্য যেন ছিল না তার আর কোন পিছটান। তাই একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর একান্ত প্রত্যাশা ছিল স্থায়িত্ব লাভ করুক জনদরদী এ ফান্ড ও প্রতিষ্ঠান। সাতক্ষীরা তথা দেশের মানুষ পাক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ জীবন যাপনের দিশা। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি দেখেছেন, শিখেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন মানুষের অসহায়ত্বকে সহায় হয়ে দাঁড়াবার অনিবার্যতা। সুদুর পার্বত্য বান্দরবন জেলার লামাতে বোধিছড়া গ্রামে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ কোয়ান্টমম তেও তিনি রেখেছেন শিশুবিকাশে তার সৃজনশীল হাতের স্পর্শ। ‘দুর্বল মানুষ যদি পার হয় জীবনের অথৈ নদী’ তাতে নিজের কোন ক্ষতি নেই বরং বিপদমুক্ত মানুষের কলরবে সাফল্যে ভরবে দেশ ও জাতি। কেন তাই এ পথে পিছিয়ে যাব? রেখেছিলেন এ প্রশ্ন নিজের কাছে, দেশের কাছে।
মৃত্যুর আগে বেশ কয়েকমাস তিনি তার প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হাসপাতালে পরিচর্যাধীন ছিলেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে ৯ সেপ্টেম্বর (২০১৬) ‘দুটি কথা’ শীর্ষক শেষ লেখায় তিনি বলেন –
‘মানুষ বাঁচে আশায়, দেশ বাঁচে ভালোবাসায়। আপনি আশা করেন এটা-ওটা করবেন। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে, কিন্তু আল¬াহ জানেন আপনি কত দিন এ দুনিয়ায় আছেন। সুতরাং আপনি যেটা ভাল মনে করেন এখুনি বা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করবেন। এসুযোগ আর নাও আসতে পারে।
‘শুভষ্য শীঘ্রম’- রাম রাবনের একটা গল্প শুনাতে চাই। রাবন বললেন, আমি স্বর্গের সিঁড়ি বানাতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার সময় শেষ। সেজন্য আমি তোমাকে একটা উপদেশ দিব, যদি তুমি কোন ভাল কাজ করতে চাও ‘ঝঃধৎঃ হড়ি ফড়হ’ঃ ধিরঃ ভড়ৎ ঃড়সড়ৎৎড়।ি’
এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর জীবনের দুটি ঘটনা তুলে ধরেন-
‘প্রথমত: শিশুদের জন্য পথকলি নামে এক সংস্থায় কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হত বর্তমান শেরাটন হোটেলের উত্তর দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাড়ীতে। আমি তৎকালীন সরকার প্রধানের কাছে তাঁদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য একটা জায়গাটা চেয়েছিলাম। সেটা হলো মিরপুরের এশিয়া সিনেমা হলের উল্টো দিকে। একবিঘা জমিতে একটা টিনের ঘর করে সেখানে আউট ডোর শুরু করা যেত। তখন পথকলি ট্রাস্ট গঠনের লক্ষে অনেক টাকাও উঠেছে সেই টাকা দিয়ে ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে একটা প্রতিষ্ঠান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া যেত। হাসপাতাল ও মসজিদ সবাই চান কেউ এর বিনাশ চান না। সরকার প্রধান বললেন পরে হবে। এ বাড়ীটা তো কেউ নিচ্ছে না, এখানেই কাজ চলতে থাকুক। আমি স্থায়ী জায়গার জন্য আবেদন জানাই। তিনি বললেন দেখা যাক পরে হবে। কিছু দিনের মধ্যে পট পরিবর্তন হলো। পথকলি ট্রাস্ট বন্ধ হয়ে গেল। সব শেষ। অসচ্ছল শিশুদের সেবা সুযোগ মিলেয়ে গেল।
দ্বিতীয়ত: তৎকালীন আইপিজি এমআর বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পার্শ্বে একটা জায়গা ছিল। আমি ও প্রফেসর নূরুল ইসলাম সাহেব এ হাসপাতাল বর্ধিত করার লক্ষ্যে ঐ জায়গাটি হাসপাতালের নামে বরাদ্দের জন্য ভূমি মন্ত্রী জনাব আব্দুল হক সাহেবের সাথে দেখা করি। কয়েকদিন যাতায়াতের পর সেখানে দেখলাম খুবই হৈ চৈ। আমি মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ জানালাম, স্যার কাজটা ভাল মনে করলে আজকে করে দেন। আপনার এখানে যে অবস্থা না জানি আপনি কয়দিন এ দায়িত্বে থাকবেন? মন্ত্রী মহোদয় বললেন আজ তো অফিস প্রায় শেষ কালকে আসেন। আমি বললাম কালকে আপনি এ পদে ন্ওা থাকতে পারেন। সবাই আমার কথায় অবাক। বললাম আজকে সম্ভব হলে করে দেন। সন্ধ্যায় আমাদের পি.এ-কে টাইপ মেশিন সহ তাঁর কাছে পাঠালাম, রাতের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেল। ভাগ্যের পরিহাস পরের দিন তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেল। সুতরাং শুভষ্য শীঘ্রম কত উপকারী। আমার এই দুটি ঘটনা বলার উদ্দেশ্য – প্রথমটি পরে করবেন বলে রেখে দিলেন কিন্তু আর করতে পারলেন না। আর দ্বিতীয়টি তিনি যদি ঐদিন রাত্রে না করতেন তাহলে হয়ত এটি ও হতো না।
‘দেশ বাঁচে ভালোবাসায় ’শিরোনামে তিনি আরো লিখেছেন-
সপ্তাহে ২দিন ২.১৫ মি., ২.১৫ মি. ঘন্টা সময় দিতে পারেন। এতে অনেক ভাল ভাল কাজ করতে পারবেন। আপনারা সবাই ব্যস্ত আপনাদের সময় অনেক মূল্যবান। তবুও সবার জন্য ২৪ ঘন্টা সমান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামারও ২৪ ঘন্টা, আপনাদেরও ২৪ ঘন্টা, আমারও ২৪ ঘন্টা। ব্যাপার হলো এই ২৪ ঘন্টা আমরা কে কিভাবে ব্যবহার করি। সেটাই ভবিষ্যতের সফলতা। যদি আপনি আপনার গ্রামের বা ইউনিয়নের বা উপজেলার বা জেলার একজন লোককে যদি ভাল কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন তাহলে তিনি তাঁর পরিবারের, তাঁর গ্রামের একজন আদর্শ মানুষ হতে পারেন। যার দ্বারা সমাজ ও দেশ উপকৃত হবে। তবে এর ঘবমধঃরাব ধংঢ়বপঃ আছে, তিনি যদি লাঞ্ছিত, বাঁধাপ্রাপ্ত বা নির্যাতিত হন তবে একাজ আর করবেন না। এমনকি তাঁর আত্মীয়রা তাকে অন্যভাবে নিবৃত রাখার চেষ্টা করবেন। এখানে আমি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যয়ের ‘কপাল কুন্ডলা’ হতে একটি ঘটনা তুলে ধরবো। নবকুমার ও তাঁর সঙ্গীরা নৌকাতে করে যাচ্ছিলেন পথিমধ্যে রান্নার জন্য কাঠের প্রয়োজন হলো। তখন নবকুমারকে কাঠ সংগ্রহের জন্য একটা দ্বীপে নামিয়ে দেওয়া হল। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো, নদীতে জোয়ার এল, কিন্তু নবকুমার আর ফিরে এল না। তখন তাঁর সঙ্গীরা মনস্থির করলেন, কতক্ষণ আর অপেক্ষা করবো? তখন নবকুমারকে রেখে তাঁর সঙ্গীরা চলে গেলেন। নবকুমারের ভাগ্যে আসলে কি ঘটেছিল আমরা কিন্তু জানিনা। তাই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যয় বলেছেন ‘নবকুমারের কাষ্ঠ হরণের বিপর্যয় দেখিয়া যদি কেহ পর উপকারে ব্রতী না হন তাহলে তিনি মহা ভুল করবেন’।
অর্থাৎ ভাল কাজে প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে কিন্তু আপনার যদি নিয়ত ঠিক থাকে, ধৈর্য্য, সাহস ও নিষ্ঠা থাকে তবে সফলতা আসতে বাধ্য।
চিকিৎসা ও সমাজসেবায় একজন লেখক ও গবেষক হিসেবেও তাঁর ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর প্রকাশনার তালিকায় রয়েছে-(১) আপনার শিশুর জন্য জেনে নিন (২) মা ও শিশু (৩) ঊংংবহপব ড়ভ চবফরধঃৎরপং (৪) প্রাথমিক চিকিৎসা (৫) আপনার শিশুকে সুস্থ রাখুন (৬) ঊংংবহপব ড়ভ ঊহফড়ংপড়ঢ়ু (৭) উৎঁম ঞযবৎধঢ়ু রহ ঈযরষফৎবহ; এছাড়া তার অন্যূন ৩৭টি রিসার্চ পেপার দেশ বিদেশে স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।
অধ্যাপক ডা. এম আর খান শিশুরোগ চিকিৎসা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে তাঁর কর্মের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, হয়েছিলেন ঈর্ষণীয় সম্মানে ভূষিত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে মনোনীত করে তাঁর প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করেন। তাঁর প্রাপ্ত অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কারগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য হচ্ছে- (১)শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে অসামান্য অবদানের জন্য স্বর্ণপদক, ১৯৮৬ (২) ম্যানিলা ভিত্তিক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের এসোসিয়েশন অব পেডিয়েট্রিকস পদক, ১৯৯১, (৩) ওয়ার্ল্ড এসট্রোলজিক্যাল সোসাইটি সংবর্ধনা ও পদক, ১৯৯২ (৪) শেরেবাংলা জাতীয় স্মৃতি সংসদ স্বর্ণপদক, ১৯৯২ (৫) কবি নজরুল ইসলাম জাতীয় পুরস্কার ও স্বর্ণপদক, ১৯৯৩ (৬) বাংলাদেশ পেডিয়েট্রিক এসোসিয়েশন সংবর্ধনা ও পদক, ১৯৯৪ (৭) খান বাহাদুর আহছানউল্লা স্বর্ণপদক, ১৯৯৮ (৮) ইবনে সিনা স্বর্ণপদক, ১৯৯৮ (৮) বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা স্বর্ণপদক, ১৯৯৯ (৯) সমাজসেবা বিষয়ে অবদানের জন্য একুশে পদক, ২০০৯ (১০) বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক। লেখক: ২০১৬ সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান। বর্তমানে এ কে খান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা