শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে


প্রকাশিত : আগস্ট ২, ২০১৮ ||

মো. আব্দুর রহমান
মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সতর্কতা ও ব্যতিক্রম ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। প্রভাবশালী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সাময়িকীতে উল্লেখ আছে, যেসব শিশু বেশি বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খায়, পরে তাদের দাঁত মজবুত থাকে। তারা তুলনামূলকভাবে বেশি বুদ্ধিদীপ্ত হয়। এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা আবশ্যক। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে জানা যায়, দেহপসারিণীর (ব্যভিচারী নারীর) দুধ পানে ‘হেপাটাইটিস বি’ ও ‘এইডস’ এর মতো ভয়াবহ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে শিশু। সেক্ষেত্র বিশেষ শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে ইসলামে। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বাংলাদেশে এখন পত্রিকার পাতায় দেখা যায় ‘পিতা তার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে’। এটা নেত্রকোনার একটি ঘটনা। সংবাদটি বিভিন্ন শিরোনামে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল। যেমন, ‘সৎ পিতার অসৎ কাজ’, ‘এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে তার পিতা’। সংবাদটি পড়ে অনেকেই ধিক্কার করেছিল কিন্তু সমাজ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে তা জনগণের জানার অধিকার আছে। তার মানে এই নয় যে, জনগণকে সবকিছু জানতে হবে।
শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ অপরিহার্য। কারণ মায়ের বুকের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ ও উপাদানযুক্ত আল্লাহ প্রদত্ত এমন তৈরি খাবার, যা শিশু সহজেই হজম করতে পারে এবং সহজেই শিশুর দেহ বৃদ্ধিতে সহায়ক। আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ:)’র জন্মের পর তাঁর মাকে নির্দেশ দেন, ‘আমি মুসার মায়ের অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলাম, তাকে দুধ পান করাও।’ (সুরা কাসাস: আয়াত ৭) এসব শিশুদের রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি আর মৃত্যুহারও অনেক কম। আমরা যখন কথা বলি তখন অনেক কিছু বলতে পারি। কিন্তু আমরা নিজেরাই তা পালন করিনা। সংবর্ধনা পাওয়ার যোগ্য একজন মন্ত্রীকে আমরা সম্মান দিতে পারিনা। আমরা পারি সমালোচনা করতে। যাহোক, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো সর্বজনীন করা সম্ভব হলে বছরে বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ৮ লাখ ৩২ হাজার শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে। একই সঙ্গে স্তন ক্যানসারে ২০ হাজার মায়ের মৃত্যু কমানো সম্ভব। এ ছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের ডায়াবেটিস ও জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি কমবে। দুটি সন্তান জন্ম দেওয়ার মাঝের সময় (বার্থ স্পেসিং) দীর্ঘতর হয়। মায়ের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে গনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাপী ৪৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য বিক্রি হয়। অথচ মায়ের দুধ খাওয়ানোর চর্চা স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে শিশু, মা ও সমাজকে স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা দেয়। মায়ের দুধ খাওয়ানো সর্বজনীন না হওয়ায় বছরে ৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
মায়ের দুধের উপকারিতা নিয়ে বিশ্লেষন করা আবশ্যক। আমাদের জানা উচিত মায়ের দুধ খাওয়ালে দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার যে কথা এতকাল বলা হতো, নতুন তথ্য থেকে সেই কুসংস্কার দূর হবে। সরকারি তথ্য বলছে, দেশে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ খায়। ২০ থেকে ২৩ মাস বয়সী ৮৭ শতাংশ এবং এক বছরের নিচে প্রায় ১০০ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ খায়। মায়ের দুধ থেকে ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মা ও শিশু সমান উপকার পায়।
তবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর তুলনায় ধনী দেশগুলোতে দুধ খাওয়ানোর হার কম। যেসব মা শিশুকে দুধ খাওয়াতে চান, তাঁদের অনেকেই সহায়তা ও অনুকূল পরিবেশ পান না। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব শুধু মায়ের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বিকল্প শিশু খাদ্যগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।
মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য আইন সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে মা ও শিশুকে সুরক্ষা দিতে হবে। মায়ের দুধ খাওয়ানোর চর্চা বৃদ্ধির কর্মসূচিকে আরও বড় করতে হবে। প্রত্যেক মা যেন নি:সংকোচে শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারেন, তার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সহায়তা করতে হবে।
শিশুর জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধই তার জন্য যথেষ্ট। আর কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। দুধ ঠিকমতো না এলে বা শিশু দুধ না পেলে অনেক মা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ রকমটি মনে হলে কী করবেন? তার আগে আসুন জেনে নিই কী কী কারণে বুকের দুধ কমে যেতে পারে। মায়ের বুকে দুধ তৈরি হওয়া একটা ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই সিস্টেম’ অনুসরণ করে। বুকের দুধ তৈরির একমাত্র উদ্দীপক বা স্টিমুলাস হলো শিশুর দুধ টানা। তাই যে মায়েরা একেবারে শুরু থেকেই বারবার দুধ দেননি, তাদের এই উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। বুকের দুধ খাওয়ানোর ভুল পদ্ধতিও দুধ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। বিশেষ করে নতুন মায়েরা এই সমস্যায় ভোগেন। দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর মাথা ও কাঁধ সমান্তরালে থাকবে। বাঁকা হবে না, দুধের বোঁটার চারপাশে এক ইঞ্চি পর্যন্ত পুরোটা শিশুর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হবে। দরকার হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, চিকিৎসক বা মিডওয়াইফারী নার্সের সাহায্য নিন।
বাচ্চার দুধের ঘাটতি কমাতে মাকে প্রচুর পানি, তরল, দুধসহ আমিষসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এ সময় মায়ের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ক্যালরি দরকার হয়। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের সাহায্য নিন। শিশুর যথেষ্ট পরিমাণে দুধ পেতে হলে জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুধ দিতে হবে, এটি মায়ের সচেতনতা আরও দুধ তৈরির উদ্দীপনা জাগাবে। সময় বেঁধে নয়, বারবার এবং যতবার শিশু চায়, ততবারই দুধ দিতে হবে। ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে, আগেই সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। দুধ পাচ্ছে না বলে ফমুর্লা বা কৃত্রিম দুধ কিছুতেই দেবেন না, এতে মায়ের দুধ আরও কমে যাবে এবং শিশুর বুকের দুধ টানার অভ্যাসটাও চলে যাবে। শিশুর কান্না থামাতে মুখে পেসিফায়ার দেবেন না, এতে নিপল কনফিউশন হয়। কখনো কখনো পাম্প ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায়, এতে বেস্ট স্টিমুলেশন হওয়ার পাশাপাশি পাম্প করা দুধ প্রয়োজনে বাটি-চামচ দিয়ে শিশুকে দেওয়া যায়। চিকিৎসকেরা দুধ উৎপাদন বাড়াতে ডমপেরিডন বা মেটাক্লোপ্রামাইড জাতীয় কিছু ওষুধ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সাধারণত একজন সুস্থ মায়ের বুকে দুধ না আসার তেমন কোনো কারণ নেই। এ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা না করে ধৈর্য ধরে চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের আর কোনোই বিকল্প নেই। আজ বিশ্ব মাতৃদৃগ্ধ দিবসের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। দিবসটি যাতে দায়সারাভাবে পালন করা না হয় সেদিকে প্রশাসনকে সচেতন হতে হবে। ‘মায়ের দুধ পান সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ’ প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে বিশ্ব মাতৃদৃগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২আগস্ট) সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি র‌্যালি বের হবে। র‌্যালিটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে সিভিল সার্জন অফিসের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন। আমাদের সকলের উচিত সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা। মুসলিম উম্মাহর সব শিশুর মায়ের উচিত কুরআনের হুকুম অনুযায়ী তাঁর সন্তানকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করানো। পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করানোর পর প্রয়োজনে অতিরিক্ত আরো ছয় মাস শিশুকে দুধ পান করানো যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা সব মাকে কুরআন ও হাদিসের বিধান অনুযায়ী শিশুদেরকে নিজেদের বুকের দুধ পান করিয়ে আল্লাহর হুকুম পালন করার ও শিশুর যথাযথ যতœ নেয়ার তাওফিক দান করুন। সর্বোপরি শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করালে শিশু ও মায়ের মধ্যে এমন একটি মানসিক বন্ধন তৈরি হয়, যা চিরস্থায়ী। লেখক: নিজস্ব প্রতিনিধি, দৈনিক পত্রদূত।