একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি


প্রকাশিত : আগস্ট ২৯, ২০১৮ ||

সুভাষ চৌধুরী
তার মৃত্যু দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। জন্ম দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এ কথা অনেকেই বলবেন, যেমনটি বলছি আমিও। কারণ শিশু ভূমিষ্ঠ হলে সাড়া পড়ে যায়, আনন্দের ফোয়ারা বয়। ফোটে আতশ বাজি। বেজে ওঠে শাঁখের ধ্বনি। জানান দেয় এ পৃথিবীতে আমি এসেছি। ধূলা আর মাটির পৃথিবীতে আমিও তোমাদের সঙ্গী। কিন্তু যখন মানুষটি চলে যায় তখন ওঠে কান্নার রোল। আকাশে বাতাসে ওঠে আহাজারি। ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’। এই জন্ম আর মৃত্যুর সীমানা প্রাচীর সবার জন্য এভাবেই নির্ধারিত।
এমনি এক সময়ে কৃষকের ঘরে জন্ম হয়েছিল তার। কিন্তু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তার জীবন। জীবন ব্যাপ্ত হয়েছে দূরে বহুদূরে। ঠেকেছে প্রান্ত সীমায়। কখনও পেরিয়েছে দেশের সীমানা, নদীর ঠিকানা। আবার কখনও নিজভূমের পরিম-লে মুক্ত বিচরণ ঘটেছে তার। সমাজে রাজনীতিতে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরেই আমার কানে উঠলো কাল বুধবার ২৯ আগস্ট শহীদ স. ম আলাউদ্দীনের জন্ম বার্ষিক। তাগিদ এলো একটি লেখা দেওয়ার। না বলতে পারিনি। কারণ আলাউদ্দিন তো অতি প্রিয়জন। তাকে নিয়ে দুই কথা লিখতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার।
যদি পরিচয়ের সূত্র খুঁজি তাহলে বলবো ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পরের ঘটনা। জিয়াউর রহমান তখন ক্ষমতায়। ১৯৭৬ সালে স. ম আলাউদ্দিন যখন খুলনা জেলখানায় বন্দী তখনকার কথা বলতে হবে। খুলনা কারাগারের বাসিন্দা তখন জিয়া ক্যাবিনেটের সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত এড. এম. মনসুর আলি (মন্ত্রী হবার আগে), বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ স্বজন শেখ ফরিদ, শ্যামনগরের সাবেক এমসিএ (মেম্বার অব কন্সটিটিউশনাল অ্যাসেম্বিলি) একে ফজলুল হক, তালা আসনের সাবেক এমসিএ স. ম আলাউদ্দিন, খুলনার এড. খায়বর হোসেন, শ্রমিক নেতা হাফিজুর রহমান ভুঁইয়া প্রমূখ। এতসব গুণি মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমিও একজন। একদিন একজন পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন ‘চেনেন ? ইনি হলেন আলাউদ্দীন সাহেব। পাটকেলঘাটার এমসিএ’। এই টুকুই মাত্র। দেখলাম কৃষ্ণাঙ্গ দেহে কুচকুচে কালো বাবরি দোলানো ঝাকড়া চুল। গম্ভীর কন্ঠ। নির্মল স্ফীত হাসিতে আলোকিত। তারুণ্যের এক মূর্ত প্রতীক। চোখেমুখে বিদ্রোহের ডাক। তারপর তো একদিন গা ঘেঁষে পরিচিত হলাম তার সাথে। অনেক কথা শুনলাম, জানলামও অনেক কিছু তার কাছ থেকে। এরপর বেশ কয়েকদিন জেলখানায় কাটলোও। জেলখানায় তখন নানা অব্যবস্থাপনা ছিল। একবার তো খাবার নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু হয়ে গেল গণঅনশন। দিন দেড়েকের এই অনশন ভাঙাতে জেলখানায় পড়লো পাগলা ঘন্টা। আমরা যে যার মতো মাথায় খাবার থালা বাটি আর কম্বল চেপে ধরে শুয়ে পড়লাম। পরে জেল পুলিশ ও সাজাপ্রাপ্তদের গরাণ কাঠের লাঠিপেটা খেয়ে অনশন ভঙ্গ হলো। সেদিন আলাউদ্দীন সাহেবের মুখ থেকে একটি বাক্য উচ্চারিত হয়েছিল ‘আগে বাইরে যাই। তারপর দেখবো। দেশের কারাগারের উন্নয়ন করেই অন্য কথা। কারাগারে এই অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করার নয়। এত অত্যাচার, এত নির্যাতন’। দেখলাম অন্য সব নেতারা তাতে সায় দিলেন। কিন্তু জেলের গোয়েন্দা পুলিশের তোয়াক্কা না করেই আলাউদ্দীন সাহেব কড়া ভাষায় কথাগুলি বলতে এতটুকু টললেন না। প্রথম পরিচয়েই মনে হলো লোকটি খুব সাহসী এবং স্পষ্টবাদী।
এরপর জেল থেকে বেরিয়ে আলাউদ্দীন সাহেবের সাথে বারবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তিনি আবারও পুলিশের ক্ষিপ্র নজরে পড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। বারবার বলেছি ‘আপনি জেলখানায় বলেছিলেন বাইরে গেলে কারাগারের উন্নয়ন করবেন। কতদুর করলেন’। তিনি শুধু হাসতেন। বলতেন অপেক্ষা করেন। সত্যিকার অর্থে বলতে হয় দিনের বদল হয়েছে। বারবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। স্বীকার করতেই হবে ধাপে ধাপে কারাগারের উন্নতিও হয়েছে। এখন কারাগারে আগের মতো অনশন করতে হয় না। আমি বলবো আলাউদ্দীন সাহেব ও তার দলের সরকারের হাত দিয়েই শুরু হয়েছিল এই উন্নয়ন। যার ধারাবাহিকতা আজও বহমান।
তালার মিঠাবাড়ি গ্রাম কৃষিতে আলোকিত। মিঠাবাড়ির তরকারির আলাদা সুনাম রয়েছে। সাতক্ষীরার বাজারে মিঠাবাড়ির কাঁচা সবজির বেশ কদর রয়েছে। সবজি বেপারিদের মুখ থেকেই জানতে পারবেন এটা মিঠাবাড়ির ওল কিংবা অন্য সবজি। এই মিঠাবাড়ির আলাউদ্দীন সাহেব নিজেও একজন কৃষক ছিলেন। তার বাবার প্রসঙ্গ টেনে তিনিই বলতেন আমার বাবা একজন খাঁটি কৃষক ছিলেন। এ কথা বলতে তিনি গর্ব বোধ করতেন। কারণ কৃষিই বাঙালির আঁতুড় ঘর। কৃষিই তো আমাদের প্রধান সম্পদ। সূতরাং কৃষিতে নিজেকে সমর্পন করা দেশ গড়ার সামিল। কৃষিতে প্রতারণা নেই, প্রেরণা আছে। কৃষিতে প্রাণ আছে, প্রকৃতি আছে। কৃষিতে আছে প্রাণস্পন্দন। কৃষিতে আছে অর্থনীতি। সুতরাং কৃষিকে আপন করে নেওয়া একটি অতি উত্তম পেশা। তবে আলাউদ্দীন কৃষকের ঘরের সন্তান হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন রাজনীতিতে, শিক্ষায়, শিল্পে, সমাজকর্মে, গণমাধ্যমে, ব্যবসা বাণিজ্যে এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে। তিনি নিজেকে ব্যাপৃত করেছেন চারদিকে। উদার হস্তে গড়েছেন শিল্প, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা। সে সবের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছেন। কর্মসংস্থান করেছেন বহু মানুষের।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯১৪ তে শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। শেষ হয় ১৯১৮ তে। আর ১৯৩৯ এর ১ সেপ্টেম্বর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, শেষ হয় ১৯৪৫ এর ২ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে ১৯৪৫ এর ৬ আগস্ট হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল পৃথিবী।
আলাউদ্দীন সাহেবের জন্ম ১৯৪৫ এর ২৯ আগস্ট। তার জন্মের কয়েকদিনের মাথায় সমাপন ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। আমরা তাই বলতে পাির যুদ্ধের দামামার মধ্যেই তার জন্ম। অপঘাতে তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে দেশের এক স্থিতিশীল সময়ের মধ্যে ১৯৯৬ এর ১৯ জুন। এর মধ্যে তিনি অংশ নিয়েছেন সত্তরের নির্বাচনে। হয়েছেন এমপিএ (মেম্বর অব প্রভিনসিয়াল অ্যাসেম্বলি)। সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। হাতে তুলে নিয়েছেন শত্রু নিধনের অস্ত্র। যুদ্ধ ক্ষেত্রেই তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখে হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’। একটি ফুল হলো বাংলাদেশ, আর একটি মুখ অর্থাৎ বাঙালি জাতি। সম্ভবত তার জীবনের প্রথম সূর্যোদয় দেখে তিনি সেই কথাটিই বলেছিলেন। কারণ তার প্রমাণ মিলেছে তার জীবনযুদ্ধে। তিনি মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন করার চেষ্টা করেছেন। সমাজের অনাচার অবিচার অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কারাভোগ করেছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অবশেষে ঘাতকের বুলেটে নিজের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। আজ ২৯ আগস্ট। প্রয়াত নেতা শহীদ স. ম আলাউদ্দীনের ৭৩তম জন্ম বার্ষিকে তাকে গভীর শ্রদ্ধা। সুভাষ চৌধুরী , দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি, সাতক্ষীরা