কালিগঞ্জের ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ ও জলিল হত্যার ঘটনায় পুরুষ শূণ্য আট গ্রাম


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮ ||

পত্রদূত ডেস্ক: কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির নেতা কেএম মোশাররফ হোসেন ও শ্রমিকলীগ নেতা ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল হত্যার ঘটনায় ১৯ জনের নাম উল্লে¬খসহ অজ্ঞাতনামা সাত হাজার ২০ জনের নামে মামলা হওয়ায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে আট গ্রাম পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে সোমবার দিনভর কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর, হোসেনপুর, বেনাদোনা, সোতা, সাহাপুর, নেঙ্গী, শংকরপুর ও বামনহাট গ্রামে যেয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ বাড়ির বৃদ্ধ ছাড়া পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে নেই। কলেজ ছাত্র থেকে কর্মজীবী অধিকাংশই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। বাড়িতে থাকা নারী ও শিশুদের মুখে আতঙ্কের ছাপ। পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে না থাকায় অনেকের বাড়িতে তিন বেলা হাড়িও জ্বলছে না। ক্ষেতের সবজি তুলতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। বাইরে থেকে ব্যাপারি ডেকে এনে পানির দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে চাপা আতঙ্ক। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ব্যক্তিগত জমি ও কৃষ্ণনগর বাজারের মন্দিরের জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে মন্টু ঘোষ, রণজিৎ ম-ল ও নন্দ দর্জিকে গ্রেপ্তার করে তাদের দু’জনকে রিমান্ডে নেওয়ায় রাতে কেউ আর বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না। এছাড়া এলাকার একটি দালাল চক্র বাড়ি বাড়ি যেয়ে পুলিশের হাত থেকে বাঁচানোর নাম করে তালিকা দেখিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছেন বলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তারকৃত মন্টু ঘোষের স্বজনরা জানান, গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের বাড়ি থেকে সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়েছে চেয়ারম্যান বাহিনীর সদস্যরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষ্ণনগর বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ি জানান, চেয়ারম্যান বেঁচে থাকাকালীন ডিবি পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা রাত নয়টার আগেই দোকান বন্ধ করেছেন। আবার তিনি মারা যাওয়ার পর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই দোকান খুলে সন্ধার আগেই সার্টার বন্ধ করে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র রাত কাটাচ্ছেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে অনেকেই দাবিকৃত চাঁদার টাকার কিছু অংশ দিলেও বাকী টাকা দিতে প্রতিনিয়ত তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। অনেকে টাকা দিতে না পারায় রাতে কবরস্থানে রাত কাটাচ্ছেন বলে জানান।
কৃষ্ণনগর বাজারের কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতন মানুষ জানান, ২০১২ সালের ২৭ মার্চ ফতেপুর হাইস্কুল মাঠে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মঞ্চস্থ নাটকে চেয়ারম্যান মোশরারফ হোসেন, মেম্বর আব্দুল জলিলও জুলফিকার সাফুই সাধারণ মানুষকে মিসগাইড করে যৌথভাবে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটে নেতৃত্বে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ব্যক্তি স্বার্থে ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিদ্বন্দিতায় নেমে সাপমারা খাল নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। গোপালগঞ্জের ওবায়দুর রহমান ভুইয়ার পক্ষ নিয়ে জলিল মেম্বর সম্প্রতি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চেয়ারম্যান প্রতিরোধে মেতে ওঠেন। নেপথ্যে প্রশাসনের সহায়তায় ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে ফিল্মি স্টাইলে চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে মেম্বর জলিল পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা রেখে আত্মগোপানে থাকার একপর্যায়ে হাত ও পায়ের নখ তোলার পর পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়া জলিলকে মাথায় গুলি করে মৃত অবস্থায় কৃষ্ণনগর বাজারে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে ফেলে দিয়ে কৌশলে গনপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে মর্মে প্রমান করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে মহৎপুর সরকারি গোরস্থানে নেওয়ার আগে ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে গোসলে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি এ প্রতিবেদককে জানান, জলিলের হাতে ও পায়ের নখ তুলে নেওয়া ছাড়াও তার পুরুষাঙ্গ কাটা ছিল। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে।
এদিকে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা কালিগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক রাজীব হোসেন বলেন, পুলিশের কথা বলে এলাকায় চাঁদাবাজির ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে এলাকা পুরুষ শূণ্য হওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। আব্দুল জলিলকে গণপিটুনির আগে পুলিশের জিম্মায় থেকে নখ ও পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়াটা অবাস্তব।
প্রসঙ্গত, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে জাপা নেতা কৃষ্ণনগর ইউপি চেয়ারম্যান কেএম মোশাররফ হোসেনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় তার বড় মেয়ে সাদিয়া পারভিন ১৯ জনসহ অজ্ঞাতনামা ২০ জনের নামে থানায় মামলা দায়ের করেন। এ পর্যন্ত এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ১০জনের মধ্যে তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে প্রধান আসামী আব্দুল জলিলকে জনগণ পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা সাত হাজার ব্যক্তির নামে মামলা করেছে।